ভাল আছি বাবা

আজ প্রদীপের জন্মদিন । সকালে ফোন করে ওকে আশীর্বাদ জানাল শরদিন্দু । তারপর জিজ্ঞেস করল , “ রূপা ভাল তো ?”
উত্তরে প্রদীপ বলল , “ ভালই হবে । বড় স্বাধীনচেতা , কিছুই মুখ ফুটে বলে না । যা মনে হয় তাই করে । আপনি বরং ওকেই জিজ্ঞেস করবেন । ” এই প্রথম প্রদীপের কাছ থেকে এমন উত্তর পেয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ল শরদিন্দু । কিছু হয়েছে কী ? কোনো চিড় ধরেনি তো ওদের সম্পর্কে ?
একমাত্র সন্তান এই রূপা । বড় আদরে বুকে করে বড় করেছে ওকে । পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল । ক্যাম্পাস থেকেই ভাল চাকরি পেয়ে যায় । বিয়ের কথা শুরু হতে ও বলেছিল , “ ওদের কিন্তু বলে দেবে আমি চাকরি করব । এত পড়াশোনা কী শুধু ঘর সামলানোর জন্য করেছি ? ” প্রদীপের সঙ্গে বিয়ের সময় সে কথা বলেছিল শরদিন্দু , ওরা খুশিমনে মেনেও নিয়েছিল । আজও রূপার ব্যাপারে কিছু হলেই বড় বিচলিত হয়ে পড়ে , রান্নাঘরে গিয়ে মায়াকে ফোনের কথাটা বলল । শুনে মায়া বলল , “ এত ভেবো না , মানুষ সবসময় অত ভেবে কথা বলে না । ”
তবুও মন মানে না । কদিন পর মায়ার আপত্তি সত্ত্বেত্ত শরদিন্দু ওদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছল । দরজা খুলে লিপিকা , রূপার শ্বাশুড়ী , একবারে অবাক্ । ওকে দেখে খুশি হননি বেশ বোঝা গেল । ওর হাতে মিষ্টির প্যাকেটটা দিতে গেলে বলল , “ এসব কেন এনেছেন ? আমরা কেউ মিষ্টি খাই না । আপনি এটা ফেরত নিয়ে যান। ” বড়ই অপ্রস্তুত হল কথাটায় । পরে রূপা এসে কাছে বসল , অনেক কথা হল । শরদিন্দু জানতে চেষ্টা করছিল সব ঠিক আছে কী না । বিরাট ধাক্কা খেল যখন শুনল যে রূপা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে । তবে রূপা বলল , “ না আসলে আমিই বাপ্পার কথা ভেবে কাজ ছেড়েছি । ” কথাটা যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না । একসময় লিপিকা আবার এল । বাপ্পার জন্য আনা পোষাক দেখে বলল , “ এসব জামাকাপড় কী বাপ্পা পড়বে ? যাক গে , একবার তোমার শ্বশুরকেও দেখ , ওর খাবার সময় হয়ে গেছে আর তুমি তো দেখছি বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছো । এ ভাবে কী চলে ? ”
ফিরতি পথে শরদিন্দু ভাবছিল , প্রথমে প্রদীপের অমন উত্তর , তারপর রূপার চাকরি ছাড়া , ওর শ্বাশুরির এমন ব্যবহার — নাঃ কোথায় যেন একটা ভাঙ্গন উঁকি দিচ্ছে । রূপা ওদের কথা ভেবে নিশ্চয়ই কিছু লুকোচ্ছে । ও নিজের বুকের ভেতর একটি কষ্ট অনুভব করল । রূপা কী ভাল নেই ? ভগবান ওকে রক্ষা কর , ওর চোখে যেন কোনদিন জল না আসে ।
দুদিন বড়ই অস্বস্তি নিয়ে কাটাল শরদিন্দু । সর্বদাই শুধু রূপার চিন্তা । উদ্দেশ্যহীন এদিক ওদিক হেঁটে এল । পেপার পড়তে গিয়ে কিছুই পড়া হল না । তৃতীয় দিন ও আর নিজেকে রুখতে পারল না , রূপাকে ফোন করল , “ মা , একটা কথা সত্যি করে বল , তুই ভাল আছিস তো ? সব ঠিক আছে তো ? ”
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই । তারপর রূপা বলল , “ আমি ভাল আছি বাবা । ”
শরদিন্দুর মনে হল ওর গলাটা কাঁপছিল ।