অথ ভূত কথা

ইতিমধ্যে আমার ঘরেও’ ভূত’ ও ‘ভূতি’ এসে গেছে। আমার মা’র মত আমিও আমার পুত্রকে ‘ভূত কোথাকার’ বলে সম্বোধন করি। কন্যাকে কখনও পেত্নী বা ‘ ভূতি’ সম্বোধনে আখ্যায়িত করিনি। তবে তার মা যে আত্মজাকে চুল বাঁধার সময়’পেত্নী’ আখ্যায়িতে ভূষিত করে, সে সংবাদে আমি অবহিত আছি।
ঠাকুর রামকৃষ্ণের দেহাবসানের পর শিষ্যরা জোরকদমে আধ্যাত্মিক পথে এগোচ্ছে। বরানগরের পরিত্যক্ত বাড়িতে তাদের আবাস। একদিন, পথে ওদের মধ্যে দু’জনের চোখে পড়লো, এক ব্যক্তি একজোড়া ইলিশ মাছ ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তখন ঐ অঞ্চলে ভাঙ্গা বাড়ির অভাব নেই। যেই লোকটি একটা ভাঙ্গা বাড়ির কাছ দিয়ে যাচ্ছে, ওনারা বাড়ির আড়াল থেকে বলে উঠলেন, ” এঁই ,এঁকটা দে না, এঁই, এঁকটা দে না”। লোকটি খনা গলার আওয়াজে, মাছ ফেলে দে দৌড়। এই ঁ চন্দ্র বিন্দুর কী মাহাত্ম্য! স্বামীজীর গুরুভাইরা,ইলিশের তেল দিয়ে কতটা ভাত খেয়েছিলেন, তা তাঁরা বলেন নি, তবে ঐ ঁ চন্দ্রবিন্দুর গুণগান যে করেছিলেন, তা জানা যায়। শাঁকচুন্নী বা মেছো ভূতের ক্ষেত্রে এই ঁ চন্দ্রবিন্দু যে অপরিহার্য, তা বলা বাহুল্য।
মেয়েদের যে ভূতে বা শাকচুন্নীতে ধরে তা প্রায়ই শোনা গেলেও, কোন ছেলেকে ভূতে ধরেছে, তা আমার জানা নেই; তবে ছেলেদের যে মাঝে, মাঝে শাকচুন্নীর পাল্লায় পড়তে হয়, সে খবর কানে আসে, বিশেষভাবে বয়ঃসন্ধির কালেই এটা হয়ে থাকে:বয়োজ্যেষ্ঠা, মা, কাকিমাদের খেদোক্তির মাধ্যমেই সেটা কানে আসে; স্ব- জাতীয়াদের প্রতি ঈর্ষা বোধ থেকেই যে এই উক্তি, তা অনেক সময়ই দৃষ্ট হয়।
এবার ভূতোমি ছেড়ে একেবারে জব্বর, আগমার্কা ভূতের কাহিনী তে আসি। এ ভূতের আগমনও
ঘটেছিল ঐ ষাটের দশকের এক নির্জন রাতে, বর্দ্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাপবাগের পদার্থ- বিজ্ঞানের গবেষণা- গারে।
একজন ছাত্র তন্ময় হয়ে গবেষণা রত; রাত সাড়ে সাত টা-আটটা হবে। দারোয়ান চাবিটা ছাত্রের হাতে দিয়ে চলে গেছে। গবেষণা- গারের সামনে চৌকো জলাশয়; তার চারদিক বাঁধানো, দিনের বেলায় ছেলে- মেয়েদের আলাপচারিতা য় সব মুখর হয়ে থাকে। সন্ধায় কেবলই নিস্তব্ধতা করে বিরাজ: সঙ্গী ঝিঁঝি পোকার অবিচ্ছিন্ন ধ্বনি ও অগণিত গাছ- গাছালির ফাঁক দিয়ে বহে যাওয়া নিস্তব্ধতা ভঙ্গ কারী বাতাসের শোঁ, শোঁ আওয়াজ পরিবেশকে বেশ ভয়াবহ করেছে, এই সবই ভূত- নামীদের আগমনী সংকেত বার্তার সূচক। সামনে মোরাম দেওয়া পথের উপর টিমটিমে আলোয় আলো- আঁধারী ভাব, অনতিদূরে নাম না জানা ফকির সাহেবের সমাধি,পরিবেশকে ভয়াবহ করে তুলেছে; মাঝে, মাঝে ছাত্র টি গবেষণা র মেশিনটি চালাচ্ছে, আবার প্রয়োজন মিটে গেলে বন্ধ করে কী সব নোটবুকে লিখছে। হঠাৎ-ই বিভাগীয় প্রধানের ঘরের কলিংবেল বেজে উঠেছে, ছাত্রটি নিজের কাজে তন্ময়, আবার ক্রিং—-। নাঃ! এবার, মনচ্যুতি ঘটেছে। টর্চ নিয়ে সে এবার বারান্দা দিয়ে প্রধানের ঘরমুখী; ভয় যে করছে না তা বলা যাবে না , আবার বিজ্ঞানের ছাত্র, তাই হয়তো একটু অবিশ্বাসী; আবার ভূতেরা ও হয়তো সেই জন্য ইতস্তত করছে। যাই হোক, ছাত্রটি ঘরের কাছে যাওয়া মাত্রই আওয়াজ বন্ধ হয়েছে। সে টর্চ বন্ধ করে চুপ করে প্রধানের ঘরের খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে; আবার যেই বেল বেজেছে অমনি টর্চের আলো ফেলতেই দেখে একটা ইঁদুর কলিং- বেলের উপর উঠে প্রধান- সাহেবের টেবিলের ড্রয়ার খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। প্রধান- সাহেব, ড্রয়ারের মধ্যে টিফিন বাক্স রাখেন, খাবারের গন্ধ পেয়ে ইঁদুর ঐ ড্রয়ার খুলতে আগ্রহী। ছাত্রটি, তার প্রচেষ্টা কে স্বাগত জানিয়ে এসে নিজের কাজে মনোনিবেশ করেছে।
এবার আসি আসল কথায়, ভূত থাক বা না থাক, ওরা যে কতখানি আমাদের সঙ্গে জড়িত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ওরা যে আমাদের সাহিত্যের রসদ- জোগানদার, সে বিষয়ে কোন দ্বি-মত নেই, ওদের অস্তিত্বের কল্পনা যে যুগে যুগে আমাদের কল্প- লোকের বিস্তার ঘটিয়ে, সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে তা কী আর বলতে!

শেষ