- 22
- 0
পরের দিন সকালটার কেমন মুখ-গোমড়া। আকাশ জুড়ে মেঘ। মেঘের ছায়া হাউজিং এস্টেটের গায়ে-গতরে, আনাচে-কানাচে। কোত্থেকে রাজ্যের মেঘ এসে জুটেছে। হয়তো বৃষ্টি নামবে। একটু দূরে কর্পোরেশনের প্রাইমারি স্কুলের সামনে গুটিকয় বাচ্চা দেখা যাচ্ছে। একটু পরে দু'জন শিক্ষককেও দেখা গেল। দড়ি টেনে বাঁশের মাথায় জাতীয় পতাকা তুললেন একজন শিক্ষক। সকলের বন্দেমাতরম-ধ্বনি আর ফিনফিনে বৃষ্টি একসঙ্গে শুরু। বাচ্চাগুলো বন্দেমাতরম থামিয়েছে, কিন্তু ওখান থেকে নড়েনি। কয়েক মিনিট পর ওরা বিস্কুট কিংবা লজেন্স পেল হাতে। হাত মুঠো করে ওরা ছুটল বাড়ির দিকে। যেন ওই লজেন্স কিংবা বিস্কুট বাচ্চাগুলোকে স্বাধীন করে দিলো। নিখিলবাবু ইজিচেয়ারে দেহ এলিয়ে ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা নয়ের ঘর পেরোলো। কিন্তু বৃষ্টি থামার লক্ষণ নেই। নিখিলবাবু বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ঘনত্ব বোঝার চেষ্টা করছেন। বৃষ্টির মধ্যেই একটা কাক এদিক থেকে ওদিকে উড়ে যাচ্ছে। নিখিলবাবুর মনে উড়ে বেড়াচ্ছে কাল চাঁদা নিতে আসা ছেলেগুলোর মুখ। কানে বাজছে, 'ইচ্ছে করে ভুলে যাবেন না কিন্তু!' ওঁর মনে দোলাচল। কখনো ভাবছেন তেড়ে বৃষ্টি এলে ভালো হয়। ওইসব মানববন্ধনের ধাষ্টামো বন্ধ হয়। আবার কখনো ভাবছেন, এখুনি বৃষ্টি ছেড়ে যাওয়াই ভালো। বৃষ্টি বেশিক্ষণ তো হবে না। থেমে গেলেই ওরা মানববন্ধনের তোড়জোড় শুরু করবে। বৃষ্টির দাপট কম থাকলেও ওদের দাপট তো কম নয়! শুধু শুধু বৃষ্টির জন্য দেরি হবে। বেশ কিছুক্ষণ ভাবনা-চিন্তা করার পর নিখিলবাবু ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়লেন। প্রাইমারি স্কুলের চাতালে খুঁটির আগায় জাতীয় পতাকা গুটিসুটি মেরে চুপ। বৃষ্টিতে ভিজে নেতিয়ে পড়েছে। স্বাধীনভাবে ওড়ার ক্ষমতাও তার নেই। স্কুল পেরোতেই গলির মোড়। কাল ছেলেগুলো বলেছিল গলির মোড়টা সুবিধের নয়। মোড়ে পৌঁছতেই কথাটা মনে পড়ে গেল। উনি দু'পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে অসুবিধা বোঝার চেষ্টা করলেন। তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। ঠিক মোড়ের মাথায় দুটো খুঁটিতে আটকানো ক্যানেস্তারার পাতে রাজনৈতিক দলের দৈনিক মুখপত্র সাঁটানো। জলে ভিজে জবজব করছে। কাগজের একপ্রান্ত টিন থেকে খুলে গিয়ে ঝুলছে। খুঁটির পাশে দু' থাক ইটের ওপর একটা কংক্রিট স্ল্যাব। দেখে ছোট বেঞ্চির মত লাগছে। উনি ভাবেন, এ পথ দিয়ে রোজই যান, কিন্তু কোনদিনও এভাবে খুঁটিয়ে দেখেন না। শুধু চোখে পড়ে, কয়েকজন চ্যাংড়া ছেলে ওই বেঞ্চিতে বসে আড্ডা মারে। এমন নিরীহ জায়গাটা রাতে অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে কী করে, ভাবতে ভাবতে উনি বড়রাস্তার দিকে এগোন। ওঁর মনে তখন কাটা ঘুড়ির মতো ভেসে বেড়ায় কলেজে পড়া নিজের মেয়ের মুখ। বড় রাস্তার মোড়ে অসংখ্য ছাতার জমায়েত। কালোর মাঝে লাল, সবুজ, গেরুয়া, ফুল-ফুল রঙের ছাতা। সাদা ছাতা নেই একটাও। হয়তো সাদা ছাতা আজকাল তৈরিই হয় না! কাল চাঁদা তুলতে আসা ছেলেগুলোর একজনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়। নিখিলবাবু হাজিরা নিশ্চিত করতে কাষ্ঠহাসি হাসেন। ছেলেটা সে হাসি দেখতে পায় কিনা বোঝা যায় না। তাই খেজুরে আলাপ করতে গলাখাকারি দিয়ে বলেন — আজ তিনটে হাত থাকলে ভালো হতো, নাকি বলো ভাই! ছেলেটা ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়। সে চোখের ভাষা বোঝা দায়। নিখিলবাবু আমতা আমতা করেন — না, মানে, মানববন্ধনে দু'জনের হাত ধরতে হবে তো দু'হাতে! তাহলে ছাতা ধরব কোন হাতে! অসময়ে বৃষ্টি, আমার আবার নিমোনিয়ার ধাত। ছেলেটা বলে — হ্যাঁ, শ্লা, আজকের দিনেই বৃষ্টি! আবহাওয়া দপ্তরটাও শ্লা ওদের তাঁবেদার হয়ে গেছে। বৃষ্টি হওয়ার আগাম খবর দেয় না। এক কাজ করুন, ডানহাতে ছাতা ধরুন, বাঁ-হাতে ছাতা ধরা কনুইটা ধরুন। মাথায় ছাতাও রইল, আবার মানববন্ধনও হলো। নিন, আর দেরি নয়। ঝটপট বন্ধনের একজন হয়ে যান। ওদিকে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে বিধায়ক হেমেনদা' এসে গেছেন। এক্ষুনি মাইকে তার গলা শুনতে পাবেন। বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে লাইন ক্রমশ বাড়ছে। মাইকে শোনা যাচ্ছে বন্দেমাতরম ধ্বনি। তারপর শুরু হল বিধায়ক হেমেনবাবুর বক্তৃতা — বন্ধুগণ! আজ এই স্বাধীনতা দিবসের দিনে আমাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। আজ আমরা সকলে একসঙ্গে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে চাই। আপনারা সকলে...! এমন সময় লুঙ্গি-পরা, খালি-গা একজন লোক গলি থেকে বেরোয়। লাইনের কাছে আসে। তার বাঁ-হাতটা কনুই থেকে কাটা। ডানহাতে ভিজে লুঙ্গি ধরে আছে। সে হলুদ দাঁত বের করে বলে — আমিও তোমাদের সঙ্গে দাড়িয়াবান্দা খেলব। মানববন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকা একজন বলে — যা ভাগ! পাগল কোথাকার! অন্য একজন বলে — ওরে পাগল! এ খেলা নয়, এ হল স্বাধীনতা দিবস পালন। স্বাধীনতা-টতা বুঝিস কিছু? লোকটা এবার চোখ পাকিয়ে বলে — ওইভাবে হাতে হাত ধরে আমিও স্বাধীনতা পালন খেলব। একজন বলে — তুই কী করে খেলবি! তোর তো একখানা হাত নেই। এবার লোকটা বিরক্তির স্বরে ব'লে ওঠে — আমার একটা হাত নেই তাতে কী হয়েছে! যেমন হাত নেই, তেমনি ছাতাও তো নেই। ব্যস! এই হাতে তোমাদের হাত ধরবো, আর তোমরা আমার এই কাটা কনুইটা ধরবে। আমি খেলব। লোকটা ঠেলেঠুলে লাইনে ঢোকার চেষ্টা করে। বেশ শোরগোল শুরু হয়। তা শুনে সেই নেতা গোছের ছেলেটা আসে — কী হয়েছে? এখানে এত হল্লা কিসের? লুঙ্গি-পরা লোকটা কান্না মেশানো গলায় বলে — দেখো না, ওরা আমাকে খেলায় নিচ্ছে না। আমিও ওরকম লাইনে দাঁড়াবো। নেতা ছেলেটা কয়েক পলক থেমে থাকে। তারপর নেতাসুলভ গলায় বলে — এই যে! আপনারা ওকে বাধা দিচ্ছেন কেন? নিন নিন, লাইনে ঢুকিয়ে নিন। আজ কোন ভেদাভেদ নয়। ও তো আপনাদের মতোই স্বাধীন দেশের নাগরিক। একখানা হাত নেই তাতে কী হয়েছে! ওর মাথায় শুধু ছাতা নেই, বাদবাকি সব আপনাদের মতো। অ্যাই পটকা, টিভির লোকজনদের এদিকে ডেকে নিয়ে আয় তো! নিন, ও বেচারাকেও স্বাধীন হতে দিন। লোকটা লাইনে ঢুকে যায়। মিডিয়ার ক্যামেরা তার কাটা কনুইয়ে ক্লোজ শট নেয়। প্যান হয়, জুম হয়। অনেকেই পস্তায় — ইশ! লোকটাকে পাশে নিলেই ভাল হত! টিভিতে একবার অন্তত মুখ দেখানো যেতো! পেছন থেকে লাইনের সব্বাইকে এক রকম লাগছে। ছাতার তলায় হাত কনুইয়ের বন্ধন বাড়ছে। তবে বন্ধন তেমন দৃঢ় হচ্ছে না। ঠেলাঠেলিতে কনুই থেকে মাঝে মাঝে হাত ফসকে যাচ্ছে। একটা হাত মাথায় ছাতা সামলাতে ব্যস্ত, অন্য হাতে ঠেলাঠেলি সামলে নিজেকে খাড়া রাখার চেষ্টা। যতদূর চোখ যায় ততদূর এই একই ছবি। এমন সময় রাস্তার ওপার থেকে একটা মেয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে লাইনের কাছে আসে। তাকে মেয়ে না ব'লে যুবতী বলাই ঠিক। কেউ সোজাসুজি, কেউ তেরছাভাবে যুবতীর বুকের ওঠানামা দেখে। ত্রস্ত চোখে সে লাইনের মধ্যে কাউকে খুঁজছে। হঠাৎ হাতকাটা লোকটাকে দেখতে পেয়ে হুড়মুড়িয়ে সে কাছে আসে। তর্জন করে — বাবা, বেরিয়ে এসো বলছি! লাইন থেকে শিগগির বেরিয়ে এসো! এখনো তোমার শখ মিটল না! যেই একটু চোখের আড়াল হয়েছি, ব্যাস! অমনি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে! নিজে পাগল হয়েছ, এবার আমাকেও পাগল করবে। লোকটা লাইন থেকে বেরোচ্ছে না দেখে ওই যুবতী এগিয়ে গিয়ে তার আস্ত হাতখানা ধরে টানতে থাকে — তোমার কি একটুও লাজ-লজ্জা নেই! ওই পার্টি-পার্টি করে বাঁ-হাতখানা গেল বোম বাস্ট হয়ে। আবার সেই পার্টির লাইনে ঢুকছো! ওই মেয়েটাকে দেখে নিখিলবাবুর মনে পড়ে নিজের মেয়ের কথা। সকালে মেয়েটা বলছিল, 'বাবা, ও সব পার্টি-পলিটিক্সের ব্যাপার, তোমার না যাওয়াই ভালো।' নিখিলবাবু তখন কিছুতেই মেয়েকে বলতে পারেননি বৃষ্টির মধ্যেও ছাতা নিয়ে মানববন্ধনে যোগ দিতে যাওয়ার আসল কারণ। নিজের অসহায়তা নগ্ন করতে চাননি। ভাবেন, মেয়ে তাকে রুখতে পারেনি। কিন্তু এ মেয়েটা তার বাবাকে বিরত করবেই যেন! মেয়েটার টানাটানিতে হাতকাটা লোকটার ভিজে লুঙ্গির কষি আলগা হয়ে গেছে। জলে-ভেজা ভারী লুঙ্গি আলগা হয়ে কোমর থেকে নেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। ওদিকে বিধায়কের বক্তৃতা শেষে স্লোগান চলছে, স্বাধীনতা দিবস কি জ্যায়...। এদিকে মেয়ের টানাটানিতে একসময় লোকটা পুরোপুরি দিগম্বর হয়ে যায়, নাকি সত্যিকারের স্বাধীন হয়ে যায়, কে জানে!
0 Comments.