Mon 02 February 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় - ৩৪

maro news
সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় - ৩৪

গল্প নেই - ৩৪

কলকাতা ময়দানের বইমেলায় আমি ও গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ ঘুরছিলাম।গৌরাঙ্গদা তখন কিছুদিন ধরেই ব্যস্ত ছিলেন সিনেমা বিষয়ক গবেষণা নিয়ে।লেখার বিষয় ও পরিধি ছিল বাংলা সিনেমার শুরু থেকে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত।
পুরনো খবরের কাগজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবার জন্য তিনি ধর্মতলার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যেতেন। আমাকে একদিন বললেন, ‘কল্যাণ তুমি যদি এই বিষয়ে আমার সঙ্গে থেকে সাহায্য কর তাহলে খুব খুশি হব।’
আমি এক কথায় রাজি হলাম।কাজেই মাঝে মাঝেই ওই লাইব্রেরীতে আমাদের কয়েক ঘন্টা কেটে যেত।আমার খুব ভালো লাগত। কতদিন আগের পুরনো খবরের কাগজ!সেগুলি চোখের সামনে দেখতে দেখতে এক অদ্ভূত অনুভব।
বইমেলা শুরু হতেই আমরা লাইব্রেরী থেকে চলে যেতাম সেখানে।গৌরাঙ্গদা ‘প্রসাদ’ পত্রিকায় ছিলেন,সেই সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নট্টকোম্পানি যাত্রাদলের সঙ্গে।তাঁর লেখা একটি বই তখন খুব জনপ্রিয়।উত্তম কুমারের আত্মজীবনী,’আমার আমি।’
উত্তমকুমারের সঙ্গে কথা হয়েছিল দ্বিতীয় পর্ব লেখার বিষয়ে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল উত্তমকুমারকে কাছ থেকে দেখার। কথাটা তখন গৌরাঙ্গদাকে বলেছিলাম।
বলেছিলেন,‘পরের বইটি লিখবার সময় আমি যখন যাব,তখন তুমি আমার সঙ্গে যাবে।’
সেই সুযোগ উত্তমকুমার দিলেন না।
সিনেমা নিয়ে গবেষণা করে অনেক পরিশ্রমের পর গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষের ‘সোনার দাগ’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর নিজেরই প্রকাশনা সংস্থা যোগমায়া প্রকাশনী থেকে।
তখনও যোগমায়া প্রকাশনী বইমেলায় স্টল নিতে পারেনি,নিয়েছিল কয়েক বছর বাদে।
তখন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হতেন গৌরাঙ্গ দা। অত বড়ো বই বেশি নেওয়া যেত না।তিন চারটি নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন।সঙ্গে থাকতাম আমি।
একদিন বললেন,‘লালাদা দাঁড়িয়ে আছেন চল।’ দেখলাম বুদ্ধদেব গুহকে। দাঁড়িয়ে হালকা শীতে একটা রঙিন চাদর গায়ে।রাজার মতো চেহারা।সামনে থেকে সেই প্রথম আমি দেখলাম তাঁকে। দু’চার কথার পরে গৌরাঙ্গদা বললেন, ‘ওর নাম কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়।’
আমার দিকে তাকিয়ে বুদ্ধদেব গুহ বললেন,‘আপনি গল্প লেখেন? আমি পড়েছি। আপনি আমাকে আপনার একটা বই দেবেন।’
তখন আমার কোনো প্রকাশিত গল্পের বই ছিল না।যখন বেরুল তখন তাঁর কাছে যাওয়া হয়নি। দেওয়াও হয়নি। চিরকালই আমি যেন কেমন একটা হয়ে রইলাম। কত বার বড়ো খ্যাতিমান মানুষেরা যেতে বলেছেন।যাওয়া হয়নি। তাঁদের কাছে।
বহুবছর বাদে আমাকে যেতে হয়েছিল বুদ্ধদেব গুহর কাছে। ‘একুশ শতক ’ পত্রিকায় কিশোর চৌধুরীর একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচটি কিস্তিতে। সেই লেখাগুলি নিয়ে যখন বই প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। তার আগে মারা গেলেন লেখক।
তাঁর স্ত্রী পাপড়ি চৌধুরী ঠিক করলেন ‘বিশ্বায়ন ও হাতি’ বইটি ও লেখক কিশোর চৌধুরীর বিষয়ে কিছু লেখাবেন বুদ্ধদেব গুহকে দিয়ে।
দায়িত্ব দিলেন তথ্যকেন্দ্র পত্রিকা দপ্তরের পুষ্পল রায়কে। নির্ধারিত সময়ে পুষ্পল আমাকে নিয়ে গেল।তখন উনি নিজে লিখতে পারতেন না।মুখে যা বলবেন তা অন্য কাউকে লিখতে হবে। পুষ্পল আমাকে নিয়ে গিয়েছিল এই দায়িত্ব সামলাতে।
উনি বললেন আর আমি লিখে নিলাম।লেখার আগে ও পরে অনেক কথা হল। হঠাৎ বললেন আমি কিন্তু তোমায় গল্পের বই আজও পাইনি।
আমি ভেবেছিলাম ওই সামান্য ঘটনা উনি নিশ্চয়ই ভুলে গেছেন।এত বড়ো মাপের একজন মানুষ এই কথা কি আর মনে রাখবেন?
বই না দিতে পারায় আমি নিজেই বেশ কিছুদিন মন খারাপ করে ছিলাম।একটা ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। সেখানে কত কবি ও লেখকদের লেখার কথা উল্লেখ করেছেন।তখন ভেবেছিলাম আমার বইটি দিলে যদি একটি লাইনও পছন্দ হত তবে তা তিনি নিশ্চয়ই উল্লেখ করতেন।
মনে হল তা না হোক,এত বছর বাদেও যে তিনি আমার বই না দেওয়ার কথাটা মনে রেখেছেন তাও আমার কাছে একটা তুলনাহীন বড়ো পুরস্কার।
Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register