Tue 03 February 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব - ১০)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব - ১০)

দেবমাল্য

আর দ্বিতীয় বার বলতে হয়নি সামশেরের বাবাকে। অনুরোধ-উপরোধও করতে হয়নি। দেবমাল্য সরাসরি সামশেরকে বলে দিয়েছিল পর দিন থেকে আসতে। এভাবে যে এককথায় তাঁর ছেলের চাকরি হয়ে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি সামশেরের বাবা। যাক্, ছেলের একটা হিল্লে হল তা হলে! হাফ ছেড়ে বাঁচলেন সামশেরের মা-ও। এখন ছেলেকে একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হবে হাতের কাজ, এই যা... কিন্তু পর দিন যখন বাবার সঙ্গে সামশের কারখানায় গেল, দেবমাল্য কারখানার অন্য কর্মীদের সামনেই সামশেরের বাবাকে স্পষ্ট করে বলে দিল, ওকে ও সব কাজ করতে হবে না। ও আমার সঙ্গে থাকবে। পুরো ব্যাপারটাই দেখাশোনা করবে। আমাকে তো মাঝেমধ্যেই এখানে সেখানে যেতে হয়, সে সময় ও যা বলবে, সেভাবেই কাজ করবেন। সামশেরের বাবার চোখে জল এসে গিয়েছিল। উনি কোনও দেবদেবী তো নয়ই, নিরাকারেও বিশ্বাস করেন না। তবু তাঁর মনে হয়েছিল, দেবমাল্য কোনও মানুষ নন, পৃথিবীতে যদি দেবতা বলে কিছু থেকে থাকে, ও সেই দেবতা। তাই বাড়ি ফিরে ছেলেকে বলেছিলেন, মনে রাখবি, ছোটবাবু কিন্তু এখন থেকে তোর মনিব। আগের মতো আর তুমি তুমি করে কথা বলবি না। জানবি, উনি আমাদের অন্নদাতা। সম্মান দিয়ে কথা বলবি। এবার থেকে আপনি-আজ্ঞে করে বলিস। পর দিন দেবমাল্যকে ও 'আপনি' বলতেই দেবমাল্যর কানে কথাটা লেগেছিল। ঝট করে তাকিয়েছিল ওর দিকে। বলেছিল, তোর হঠাৎ কী হল? আমাকে আপনি করে বলছিস? কথাটা এমন করে বলেছিল, যেন তাকে আপনি বলাটা ওর মারাত্মক অপরাধ হয়ে গেছে। তার পর থেকে ও আর কোনও দিন দেবমাল্যকে আপনি বলেনি। বাবা বারণ করায় 'তুমি' বলাটাও ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু দরকারে-অদরকারে কথা তো বলতেই হয়, তাই কথা বলার একটা অদ্ভুত ভাষা তৈরি করে নিয়েছিল সে। 'তুমি' বা 'আপনি' না বলেও, ওর যা বলার, ও তা অনায়াসেই বলে ফেলতে পারত। এখনও সেই ভাষাতেই কথা বলে ও। ও বলেছিল, চারটে নাগাদ ট্রেনটা বহরমপুরে পৌঁছবে। তার মানে এখনও প্রায় দেড় ঘণ্টা মতো বাকি। হাতে প্রচুর সময়। স্টেশনে যেতে আর কতক্ষণই বা লাগবে! খুব বেশি হলে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট। হোটেলের ম্যানেজারই কাকে বলে যেন একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তাকে বলা আছে। সে সাড়ে তিনটের আগেই চলে আসবে। যদি ঘুম না ভাঙে! হোটেলের লোককেও বলা আছে, ওরা ঠিক সওয়া তিনটে নাগাদ তাকে ডেকে দেবে। না, ওদের আর ডাকতে হবে না। সে উঠে পড়েছে। এবার হাত-মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নিলেই হয়! কিন্তু ট্রেনটা এখন কত দূরে! তানিয়া কি ঘুমোচ্ছে! না না, ট্রেনের ওইটুকু জায়গায় ও ঘুমোবে কী করে! ওর কি ওইভাবে শোওয়ার অভ্যাস আছে! এমনিই হয়তো ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে। ফোনটা কি ওর হাতের কাছেই আছে! না কি হাত-ব্যাগের ভেতরে। একবার ফোন করে দেখি তো! তানিয়াকে ডায়াল করতেই ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল--- নট রিচেবল। ও এমনিতে সচরাচর কাউকে ফোন করে না। যদি কাউকে ফোন করে আর সে যদি ফোন না ধরে, একটানা রিং হয়ে যায়, ওর মেজাজ বিগড়ে যায়। যদি না-ই ধরস, তা হলে ফোন রেখেছিস কেন? অথচ নিজের ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটলে, যে ফোন করেছিল, 'তোকে ফোন করেছিলাম, তুই তখন ধরিসনি' বলে সে অভিযোগ করলে ও মনে মনে বলে, ফোন করলেই কি ধরতে হবে! আমি তোমার চাকর নাকি! অবশ্য নট রিচেবল হলে কারও কিছুই করার থাকে না। তবু ও ভাবল, নট রিচেবল! এটা তো মেট্রো রেলে থাকলে হয়! এই ট্রেনেও নট রিচেবল! তার মানে ট্রেনটা এখন যে জায়গা দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে টাওয়ার নেই কিংবা সিগনাল পাচ্ছে না। কী যে হয় মোবাইলে কে জানে! সেদিন কার একটা নম্বর মোবাইলে সেভ করে, নম্বরটা ঠিকমতো সেভ হয়েছে কি না পরখ করার জন্য ওই নম্বরে কল করেই, যার নম্বর সেভ করেছে, তাকে বলেছিল, এটা আমার নম্বর সেভ করে নিন। কিন্তু এ কী! ও প্রান্ত থেকে যে বলছে নট রিচেবল! অথচ যার নম্বরে ফোন করেছে, সে তার সামনেই মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেবমাল্য আবার ডায়াল করল তানিয়াকে। তার পর আবার। আবার। আবার। আর প্রতিবারই শুনতে পেল সেই একই কথা--- নট রিচেবল।

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register