- 30
- 0
বাজারে আসলে নিত্যনতুন বায়না আফসানার। কখনো পুতুল,কখনো খেলনাবাটি এসবের অপর্যাপ্ত সম্রাজ্ঞী হয়েও তার আশ মেটে না। হিমসিম খায় নাজিয়া মাঝে মধ্যে। সামনে ঈদ তার জন্য ভালো সিমাই কিনতে নবাবগঞ্জের হাটে আজ আসা। আফসানা সিমাই খেতে ভাল বাসে খুব।ওর বাবা রাজমিস্ত্রীর কাজ করে সুরাটে। ছ'মাসে একবার বাড়ী আসে আব্বাস। বেটী খুবই বাপ সোহাগী। আব্বু বাড়ীতে আসলে তার মজা দেখে কে। নাজিয়াও আব্বাসের নয়নের মণি। তাদের গরীবের সংসারে হাসি আর অভাব আলো হয়ে জ্বলে থাকে মলিনতা উপেক্ষা করেই। ....
এবার একটা ইস্কুল ব্যাগের বায়না তার। ভারী সুন্দর দেখতে অনেক কটা খোপওয়ালা। দামটা বেশী তিনশ টাকা। নাজিয়ার সংসারে তা বড্ড বেশীই সেটা কি আর আফসানাকে বোঝানো যায় ! কোনওমতে সিমাই কিনে ঘরমুখী হয় তারা।এবারে ঈদের দুদিন আগে জন্মদিন পড়েছে আফসানার। এতে সে ডবল খুশী। সিমাই এর সাথে জামাও হবে একটা বেশী,সেটা জন্মদিন বলেই। গোটা রমজান মাসের পর ঈদ আসছে মহল্লায় খুশীর চাঁদের নখের ফালির মতই আনন্দ আর আল্লাহের রহমৎ কে সঙ্গে করেই। .....
আফসানা ইস্কুল চলে গেলে নাজিয়া ঘর থেকে বাজারে যায়। মেয়েকে চমক দিতেই ওই ইস্কুল ব্যাগটা কিনে আনে। শেষ পর্যন্ত আড়াইশতেই হাতে আসে খুশী আর চমকের সমারোহে। ঘুম থেকে উঠে মাথার কাছে রাখা মোড়ক খোলে আফসানা। রেশমী বুটিদার ফ্রকের সাথে সেই সাধের ব্যাগখানা। আব্বুর ফোন আসে সাথেসাথেই। আদরে আর আনন্দে গলে যায় সে। নাজিয়া দোয়া চায় অফুরন্ত আয়ু আর সুস্হতার। খুশীর ঝলক চলকে ওঠে ছোট্ট সংসারের গৃহস্থী জুড়ে। ..... নতুন ব্যাগ নিয়ে ইস্কুলে চলে যায় আফসানা। আজ বন্ধুরা অবাক হয়ে যাবে ওর ব্যাগখানা দেখে !
যথাসময়ে শুরু হয় প্রার্থনাসঙ্গীত। হঠাৎ প্রকৃতি বিরূপ হয়ে ওঠে সহসা। বহুযুগের আলোড়ন উঠে আসে মাটির ভিতর থেকে। বন্দী দৈত্যের ঘুম ভাঙে তীব্র কম্পনে। প্রাইমারী স্কুলের বাড়ী ধ্বসে পড়ে এই তীব্র ভূকম্পনে। বাচ্চাগুলো হদিস মেলা কঠিন হয়ে যায় ধ্বংসস্তুপের ভিতর থেকে। অসংখ্য আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় ইঁটকাঠকংক্রিটের তলায়। উদ্ধারকারীর দল কাজ শুরু করতে করতে অর্ধেক শিশু শান্ত হয়ে গেছে প্রকৃতির রিরংসায়। ....
নাজিয়াদের বাড়ীর একটা দিকও ধ্বসে গেছে এই কম্পনে। কোনও মতে সে যখন ইস্কুলবাড়ীর পথে দৌড়ায় তাকে আটকায় করিমচাচা সঙ্গে মিলিটারী পোশাকের একটা লোক। ওর হাতে ধরিয়ে দেয় আফসানার সেই নতুন ইস্কুল ব্যাগ রক্তলাঞ্ছিত আর শতচ্ছিন্ন সেটি।
ওখানেই পাথর হয়ে যায় নাজিয়া, কথা জোগায় না মুখে। .... আজ ঈদ অবশেষে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাটিয়ে দু এক ঘরে টুনি বাল্ব আর নিশান লেগেছে। রমজানী সাঁঝের ডালের বড়ার গন্ধ ভেসে আসছে ইতিউতি। চাঁদও উঠেছে একফালি নিয়ম মেনেও। তবে এবারে আলোটা রূপোলী নয় যেন, লালচে।
0 Comments.