- 301
- 0
শহরতলির ইতিকথা
তিন পুঙ্গব তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে,কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেমে ক্যান্টিনের খোঁজে যাবার উদ্দেশ্যেই, নিচে সিঁড়ির পাশে দরজা দেখে, এগিয়ে যেতেই দেখে, দরজাটা বা'র থেকে বন্ধ করা রয়েছে;দম্-দমা-দম্ আওয়াজ আসছে,ধুলোর জন্য এ পথ বন্ধ; আসবার সময়, সিনেট হল ভাঙ্গা হচ্ছে, চোখে পড়েছে। এবার ওরা ওপথে না গিয়ে, দেখে একজন ডানদিকের প্যাসেজ দিয়ে আসছে, ওরাও,স্মার্টলি ঐ পথেই এগোলো; কয়েক পা যেতেই, দেখলো আর একটা উপরে ওঠার সিমেন্টের সিঁড়ি, তার চাতালের তলায় চিপ-ষ্টোর; একজন বসে আছে ; ক্যান্টিনেের কথা বলতেই, সে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগের পঠন-পাঠন এখনও শুরু হয়নি বলে, দু'একজন ছাড়া ক্যান্টিনে, কেউ নেই।ক্যাউন্টারে একজন বসে আছে, জিজ্ঞেস করলেন, "ভর্তি হয়েছ?"
"হ্যাঁ", শুনেই বললেন,"আমি,সকলের রাখালদা, আমাকে ঐ নামেই ডাকবে; এই চার্ট দেখে,কুপন নিয়ে, ঐ ওদের কাছে জমা দেবে; কী খাবে বললে, তোমাদের দেবে; অবশ্য এখন চা আর টোস্ট ছাড়া কিছু নেই; সব ডিপার্টমেন্টের ভর্তি শুরু হয়নি, তাই লোকজনদেরও ছুটি দিয়েছি,আর খাবারের স্টকও সীমিত রেখেছি,অবশ্য, অমলেটটা চাইলে, পাবে। তোমাদের, দেখে মনে হচ্ছে, এ শহরের নও তোমরা, ঠিক কি না?
"হ্যাঁ, রাখালদা।"
"চা-টোস্ট খেয়ে, সব ঘুরে দেখ। এ বিল্ডিং'র নাম আশুতোষ বিল্ডিং, এখানেই দিনের বেলা, আর্টসও কমার্সের ক্লাসগুলো হয়, সকালে ল-ক্লাস হয়, রাতে, শুধু কমার্সের ক্লাস হয়।"
টিফিন সেড়ে, তিনজন ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে,ঐ প্যাসেজেরই শেষের দরজা দিয়ে বিল্ডিং'র বাইরে এলো। উন্মুক্ত প্রাঙ্গন; একটু ঘুরে, প্রাঙ্গন শেষে, ওপারে সোস্যাল ওয়েল-ফেয়ারের দিকের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট দিয়ে বেরোলো। ডানদিকে, ঐতিহাসিক সিনেট হল ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে, নতুন বিল্ডি 'র পিলার পোঁতার কাজও জোরকদমে চলছে।
দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিং, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ঘরও প্রশাসনিক ভবন; হেয়ার স্কুল হয়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে, তাদের মন অতীতের পাতায় চলে যায়; টাইম-মেশিনে চেপে মন ইতিহাসের ঘটনার সাক্ষী হতে চাইছে; সাহেব অধ্যাপক গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে; নেতাজীর নির্দেশে, তাঁর সহপাঠী, ভারতীয়দের অপমানের যোগ্য জবাব দিচ্ছে। কলেজের গাড়ি-বারান্দা থেকে হেঁটে, তিনজন গেটের বাইরে; কলেজের পাঁচিলের রেলিংএ ত্রিপল খাটিয়ে ফুটপাথে রয়েছে সাড়ি সাড়ি পুরোনো বই'র স্টল; এ রাস্তার ওপারে দোতলায় রয়েছে,বহু আলোচিত কফি হাউজ; আর একটু এগিয়ে, ডানদিকে রয়েছে সংস্কৃত'কলেজ,জড়িয়ে রহেছে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অমর কীর্তি, রয়েছে হিন্দুস্কুল। রাজীবও তার বন্ধুদের মন আনন্দে ভরপুর।কলেজ জীবনে পেয়েছে ঋষিবঙ্কিমের ছোঁয়া; এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে, তারা পাবে বাংলার বাঘ, নেতাজী,বিদ্যাসাগর, ডেভিড হেয়ারের ছোঁয়া; ইতিহাসের পাতার স্মৃতিচারণ করতে করতে চলে এলো হাওড়া স্টেশন।
আজীমগঞ্জ-গয়া প্যাসেঞ্জার ধরে ব্যাণ্ডেল স্টেশনে এসে, অন্যেরা ধরলো নৈহাটির ট্রেন, আর রাজীব তো ট্রেনেই রইলো বসে; সে তো পরের স্টেশনে নামবে। এবার স্টেশন থেকে বাড়ি। পরের সপ্তাহ থেকে হবে ক্লাস শুরু। না,বাড়ীর লোকের এ বিষয়ে কোনও আগ্রহ নেই,বলা যেতে পারে,তাদের প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ার আশঙ্কায় তারা একটু চিন্তিত, উদ্বিগ্ন।
রাজীবের ট্রেন সকাল আটটায়; ভোর পাঁচটায় ওঠে, সাড়ে পাঁচটায় খামার পাড়া অঞ্চলের এক বাড়িতে ট্যুইশান সেড়ে, সাতটায় বাড়ি এসে চান-টান সেড়ে চোখে-মুখে দু'টো দিয়ে স্টেশনে ছোটা। কাটোয়া রেল-লাইন, সিঙ্গল লাইন, চলে কু-ঝিক-ঝিক, ষ্টিম-ইন্জিন, হাওড়া যেতে সময় লাগে প্রায় দু'ঘণ্টার ওপর। তাদের ক্লাস শুরু হয় বেলা এগারোটা থেকে।
প্রথম দিন সে, হাওড়া থেকে ট্রামে করে কলেজ ষ্ট্রিট যাবে বলে, যেই ট্রামে উঠতে গেছে, একদঙ্গল লোকও কোথা থেকে এসে, প্রবেশ পথের হ্যাণ্ডেল ধরতে আগ্রহী হলো; আর রাজীবের জামার বুক পকেটে থাকা, চটকল থেকে পাওয়া, দু'টো কড়কড়ে একটাকার নোট খড়খড় করে উঠতেই,পকেটে ঢোকানো হাতটা রাজীব মুচরে ধরেছে, না,হাত বার করে, টাকা পাওয়া গেল না, ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। ট্রামের কন্ডাকটার, সব দেখেছে , না দেখার ভানে, টিকিট চাইতে ব্যস্ত। কী আর করা যাবে, বড়বাজার স্টপেজ এলে, নেমে,স্ট্রাণ্ড রোড ধরে হেঁটে, কাস্টম-হাউজের অফিস থেকে, একজন পরিচিতের কাছ থেকে একটাকা ধার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে। বন্ধুরা সবাই সাবধান হয়ে গেল, 'কী হাত সাফাই রে বাবা! প্রথম দিনই এ অভিজ্ঞতা! যাক, দু'টাকার উপর দিয়ে পাওয়া গেল দারুন অভিজ্ঞতা। ফেরার সময় ট্রপিকালের পাশ দিয়ে চিত্তরঞ্জন এভেনিউ ক্রশ করে, নাখোদা মসজিদের রাস্তা ধরে হেঁটে নতুন পথ আবিষ্কার করে চিৎপুর হয়ে, বড়বাজারের পথ ধরে হাওড়া ব্রীজে ওঠা। বাসভাড়া,বেঁচে গেল, আবার সময়েই হাওড়া স্টেশনেও আসা গেল। এ পথই হবে, রাজীবের ফিরতি পথ, কারন, চীৎপুর অতিক্রম করে বড়বাজারে আসতেই কী বাস, কী ট্রাম, নট নড়ন চরন; সব প্যাসেঞ্জারই হাঁটতে শুরু করে; ভিড়ের চাপে ট্রাফিক জ্যাম, নিত্য-নৈমিত্তিক; সুতরাং বাসে বা ট্রামে চেপে, পয়সা খরচ করে যদি হেঁটেই শেষ পর্যন্ত যেতে হয়, তবে প্রথম থেকেই হাঁটাই শ্রেয়, তাতে পয়সা বাঁচে,আবার সময়েই হাওড়া স্টেশনেও পৌঁছানো যায়।
চলবে
0 Comments.