- 6
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
নতুন জায়গায় চলে এল ঘোতন, সাথে বিট্টু… এরপর। পড়ুন ১৯তম পর্বে…
সুলেখা লোভের বশবর্তী হয়ে ঘোতনের পরিকল্পনায় সায় দিল। শুধু নিজে নয়, নিজের শ্বশুরবাড়ির সবাইকে এই পরিকল্পনায় সামিল করল। ঘোতন মহানন্দে ঘরে এসে বিট্টুকে চোখ টিপে জানান দিল, “উদ্দেশ্য সফল”
সুলেখা, বিট্টুকে আদর করে বলল,
“ছেলেটার মুখটা শুকিয়ে গেছে। কতদিন ভালো করে খায়নি। আমি ওকে নিজের হাতে রান্না করে খাইয়ে দেব”
সুলেখা, বিট্টুকে লুচির সাথে আলুরদম ও রসগোল্লা খাইয়ে দিচ্ছে। বিট্টু পরম তৃপ্তিতে খেতে খেতে ঘোতনের দিকে চোখ টিপে মুচকি হাসল…
ঘোতনও বেশ ভালো করে উদরপূর্তি করে বলল,
“বোনের হাতের রান্না মা’কে মনে করিয়ে দিল। কতদিন এমন রান্না খাইনি রে সুলেখা”
সুলেখা আবেগে ভেসে গিয়ে ছোটবেলায় একসাথে কাটানো দিনগুলোর কথা উল্লেখ করল।
অভাবের সংসারে, ওদের বাবা মোটেই সুবিধার লোক ছিল না। ওদের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করত। সামান্য যা অর্থ আসত, সেই দিয়েই অতিকষ্টে ফ্যান, ভাত শাকসব্জী খেয়ে দিন কাটাত। মাঝে মাঝে কাজের বাড়ি থেকে ওদের মা ভালো মন্দ খাবার নিয়ে আসত। সেইদিন ওদের কি আনন্দ! ওদের বাবা বেশীরভাগ দিন নেশা করে এসে বাড়িতে হুজ্জুতি করত। মা ও ওদের ভাইবোনকে গালিগালাজ করত। পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে ওদের বাবার জন্য নানা কটূকথা শুনতে হত। সেইসব দিনের কষ্টের কথা বলতে বলতে সুলেখা কেঁদে ফেলল। ঘোতনকে বলল,
“দাদা, তুই আমাকে ক্ষমা করিস। আমি তোকে আমাদের বাড়িতে আসতে মানা করেছি। স্বার্থপর হয়ে গিয়েছি”
ঘোতন মনে মনে বলল,
“তুই এখনও তাই আছিস। কিন্তু আমাদের আসল উদ্দেশ্য তোকে কিছুতেই বলা যাবে না। তাহলে এমন আদরযত্ন একদম পাওয়া যাবে না”
ঘোতন জানে, এদের কাছে থেকে বিট্টুকে ওর সঠিক গন্তব্য দেখিয়ে তবেই ও বিদায় নেব। তারজন্য যাই হোক হবে। সুলেখা ওকে খারাপ ভাবলেও কিছু যায় আসেনা। রাতের বেলা সুলেখা, ঘোতন ও বিট্টুকে একটা ঘরে শোবার ব্যবস্থা করে দিল। ঘোতন ও বিট্টুর ঘুম আসেনি। দুজনে ফিস ফিস করে কথা বলছে,
“কি বিট্টুসোনা, এখানে এসে খুশি তো? কোনো অসুবিধা হচ্ছে?”
“আমি একদম ঠিক আছি। ঘোতনকাকা, তুমি আমার পাশে আছো যখন, আমার কোনো চিন্তা নেই”
“তাহলে এবার বল, এরপর আমি কার সাথে যোগাযোগ করব? তোর বাবার সাথে এখন যোগাযোগ করা যাবে না। তাহলে কি হরিদাদুর সাথে দেখা করব?”
গ্রামের বাড়িতে ঘোতন নেই, বিট্টুকে নিয়ে সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। বিভাস এবং ওর সাথীরা, পুলিশকে নিয়ে এসেছে ঘোতনের বাড়িতে, কিন্তু বাড়িতে কেউ নেই। পুলিশ অফিসার বিভাসকে বলল,
“কি ব্যাপার? আপনি বললেন কালপ্রীটটা ওর বাড়িতে একটা বাচ্ছা ছেলেকে কিডন্যাপ করেছে। কিন্তু বাড়ি তো ফাঁকা। কেউ তো নেই দেখছি”
“আমি ঘন্টা খানেক আগে এসে ঘোতনের সাথে কথা বলেছি। এই জায়গাটা আমার চাই, অফিসার। ঘোতনকেকে আমার ভীষণ দরকার ছিল। ওকে এরেস্ট করে জোর করে জায়গাটা আমাদের নামে লিখিয়ে নিতাম। হতচ্ছাড়া সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছে”
“আপনি ঠিক বলছেন, এখানে ঘোতন ছিল?”
“হ্যাঁ, স্যার। ওর সাথে একটা বাচ্ছা ছেলেও ছিল। মনে হল, ঘোতন বাচ্ছাটাকে জোর করে নিয়ে এসেছে”
অফিসার ভীষণ বিরক্ত হল। কারণ ইতিমধ্যে ওদের কাছে কলকাতা পুলিশের অনুসন্ধান কার্যালয় থেকে মেসেজ এসেছে, একটা আট-ন বছরের বাচ্ছা ছেলে কিডন্যাপ হয়েছে। সেই বাচ্ছাটার ছবিও তাদের কাছে চলে এসেছে। অফিসার বিভাসকে বলল,
“আমাদের কাছে একটা খবর আছে। কলকাতার হাতিবাগান অঞ্চল থেকে একটি বাচ্ছা ছেলে কিডন্যাপ হয়েছে। সেই বাচ্ছাটার ছবিও আমাদের কাছে সার্কুলেট হয়েছে। দেখুন তো এই বাচ্ছাটা কিনা?”
অফিসার নিজের মোবাইল বের করে ছবিটা বিভাসকে দেখাল। ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখার পর বিভাস বলল,
“অন্ধকারে বাচ্ছাটাকে আমি ভালো করে দেখতে পাইনি। মনে হচ্ছে এই বাচ্ছাটাই”
“এমন বললে হবে না। আমাদের কাছে অর্ডার এসেছে, বাচ্ছাটা যেকোনও জায়গায় দেখা গেলেই সঙ্গে সঙ্গে একশন নিতে হবে। আপনি কি যে করেন?”
বিভাস আশেপাশে থাকা সব পাবলিককে জিজ্ঞাসা করল,
“তোরা এই পাড়াতেই থাকিস। তোরা কি এই বাচ্ছাটাকেই ঘোতনের সাথে দেখেছিস?”
সকলেই ছবিটা দেখল। কিন্তু ঘোতনের সাথে বাচ্ছাটাকে সেইভাবে কেউ দেখেনি। তাছাড়া ঘোতন যখন বিট্টুকে পাড়ার মধ্যে থেকে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল। সেভাবে ওর মুখটা কাউকে দেখায়নি। গামছা দিয়ে মুখমণ্ডল ঢাকা ছিল। তবে ঘোতনের পরিচিত যে বন্ধু পুলিশ আসার খবর দিয়েছিল, সে ছবি দেখে বিট্টুকে চিনতে পেরেছিল। সে অনেকক্ষণ ধরে দেখার পর বলল,
“মনে হয়, এই বাচ্ছাটাই ঘোতনের সাথে ছিল”
পুলিশ অফিসার রেগে গিয়ে বলল,
“সবকটা হতচ্ছাড়ার দল। কেউ ঠিক করে বলতে পারছে না। এখন আমি ঘোতনকে কিভাবে খুঁজব?”
ঘোতনকে দেখতে না পেয়ে বিভাস, পুলিশের দল হতাশ হয়ে ফিরে গেল। তবে বিভাস মনে মনে ছকে রেখেছে,
“আজ পালিয়ে গেছিস ঘোতনকুমার। তবে তোর এই জায়গাটা আমরা একদিন হাতিয়ে নেব”
একদিন কমলের (বিট্টুর বাবা) বাড়িতে ল্যান্ডফোনে একটি কল আসে। কমল ফোনটা ধরতেই ও প্রান্ত থেকে জবাব আসে,
“আপনার ছেলে বিট্টু আমাদের কাছে আছে। ছেলেকে ফেরৎ পেতে হলে পাঁচ লাখ টাকা রেডি রাখুন”
বলেই ফোনটা কেটে দেয়। রত্নাও সেখানে ছিল। কলটা কেটে যেতেই সে কাঁদতে কাঁদতে কমলকে বলল,
“কে ফোন করেছিল? নিশ্চয়ই কিডন্যাপাররা কল করেছিল। কি বলল ওরা? বিট্টুর সাথে কথা হল তোমার? কি বলল?”
“আরে ধুস, পাঁচ লাখ টাকা রেডি রাখতে বলেই ওরা কলটা কেটে দিল। আমি কি করব? বিট্টু কোথায় আছে কিছুই বুঝতে পারলাম না”
কমলের কথার প্রত্যুত্তর রত্না চিৎকার করে আরও কাঁদতে লাগল,
“আমার ছেলেকে যে করে হোক নিয়ে আসো। পাঁচ লাখ কেন? দশ লাখ চাইলেও ওকে তুমি নিয়ে আসো আমার কাছে। ছেলেটা কি করছে কে জানে?” - একথা বলেই রত্না অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করল। বাড়িতে কাজের লোকেরা ধরাধরি করে রত্নার চোখে মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরাল। রত্নাকে কমল বলল,
“এতো উতলা হয়ো না, প্লিজ”
এদিকে পুলিশ অফিসার বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলি কল করে জানতে চাইলেন,
“আপনাদের ল্যান্ডফোন ট্র্যাপ করা আছে। কিছুক্ষণ আগেই একটা কল এসেছিল”
“হ্যাঁ, অফিসার এসেছিল। কিডন্যাপাররাই কল করেছিল। আমার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ডিমান্ড করেই কলটা কেটে দিল”
পুলিশ ট্র্যাপ করেছিল ল্যান্ডফোনটা, কিন্তু অল্প কথা হওয়ায় ঠিক মত লোকেশন পেল না। ওসি বিশ্বজিৎ জানালেন, যত বেশী সম্ভব কিডন্যাপারের সাথে কথা বলতে। যাতে সঠিক লোকেশন ট্রেস করা যায়। সেদিনের মত আর কোনো ফোন এলো না। কমল বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমার সব কাজ ফেলে গোটা দিন ল্যাণ্ডফোনের পাশে বসে রইলাম। অথচ কিডন্যাপাররা আর কল করল না। আবার কবে, কখন কল করবে, সেই আশাতেই বসে থাকি। ছেলেটা আমার কোথায় এবং কিভাবে আছে কে জানে। বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে”
রত্না এই কথা শুনে মনে মনে বলল, “হুম, দরদ যেন উথলে পড়ছে। ও ছেলে বাড়িতে না আসলেই আমি বেশী খুশি হব। একটা হাড় বজ্জাত ছেলে, আমার সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে আসবে। কিছুতেই এই সম্পত্তির ভাগ দেব না”
রত্নার মনের কথা কমল বুঝতে পারল না। রত্নার কথায় এখন সে বিশ্বাসও করতে পারছে না। একটা অদ্ভুত দোলাচলের মধ্যে তার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিট্টু কোথায় আছে? সে ঠিকঠাক খাচ্ছে কিনা সেই নিয়ে কমল বেশ দুশ্চিন্তায় আছে। সে তার প্রথম স্ত্রী, তন্দ্রার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি তোমার অপরাধী, তন্দ্রা। আমি বিট্টুকে আগলে রাখতে পারলাম না। আজ সে কোথায় আছে, কি করছে? আমি কিছুই জানিনা। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তুমি আমাকে একদম ক্ষমা করো না”
রত্না, কমলের অবস্থা দেখে মুচকি হেসে বলল, “যত্তসব ন্যাকামী”। এরই মধ্যে ল্যান্ডফোনে আর একটা কল এল…
----------------------
আবার কার কল এল? পড়ুন পরের ২০তম পর্বে…
0 Comments.