- 25
- 0
দিঘির দীর্ঘশ্বাস
এরম একটি বিশাল দিঘির পাড়ে পূর্ণিমার আলোয় শীতল হাওয়া খেতে খেতে বসে জীবন কথা বলছো তুমি ও তোমার প্রেমিক। অনেক সুন্দর মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে, দূরত্ব ক্রমশ কমে কমে নিঃশ্বাসটুকুই আর ফারাক। ঠিক তখনই, সেই মুহূর্তেই—ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠে তোমার হাত এক ধাক্কায় সরিয়ে তোমার প্রেমিক বিদ্যুতের গতিতে ঝাঁপিয়ে দৌড় শুরু করল—তুমি বুঝতে পারার আগেই এই অন্ধকারে সে অদৃশ্য হয়ে যায়—তুমি তার নাম ধরে ডাকছো—কোথায় তুমি, কই গেলে, কিন্তু তখনও কোনো সাড়া পেলে না...
তোমার হৃদ্স্পন্দন ক্রমশই উত্তেজনায় বেড়ে উঠছে। তোমার সামনের দিকে দিঘি, আকাশে পূর্ণিমার ঝলমল করতে থাকা চাঁদ, তোমার পায়ের আলতার ছাপ আজ যেই ঘরের ভিতরে ছেপে ওঠার কথা ছিল, তা হলোনা, অথচ তোমার পা বেয়ে অসহায় এক প্রবল চাপা ভয় উঠে যাচ্ছে তোমার বুকে, বেড়ে উঠছে রক্তচাপ। তোমার চোখ ছলছল, ভীষণ একা ও অসহায়...
দূর থেকে কেউ যেন দেখছে এই আঁধারেও—একটি যুবতী, পায়ে আলতা, কপালে টিপ, চোখে কাজল, লাল আভা ঠোঁট, গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি আবিরের আভা তার গালে। এখন তার চোখ থেকে টপটপ করে এক ফোঁটা, দু’ফোঁটা জল নেমে এলো...
সে বুঝতে পারল, আর তার প্রেমিক এখানে নেই—
দিঘির ওপারে, আধারী দিগন্তে পূর্ণিমা নিশির মায়াবী আলোয় একটি কন্যা, লাল বেনারসি ও চকচকে মুকুট পরনে, গাছকৌটো নিয়ে—একটি মাচায় পা দোলাচ্ছে, বাতাসে তার রজনীগন্ধার মালার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
তুমি ঝাপসা ঝাপসা দৃষ্টিতে অবাক হয়ে সেই কন্যাকে দেখে যাচ্ছো। দূর থেকে শেয়াল-এর অনর্গল আর্তস্বর—হঠাৎই একজন, সুপুরুষের মতো দেখতে, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, টোপর পরে উপস্থিত কন্যাটির সামনে।
মাচা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কন্যা, ছেলেটির আরও নিকটে গিয়ে দাঁড়াল—তাদের দূরত্বও একই নিঃশ্বাসের ফারাক। দুজনের প্রবল দীর্ঘশাস আঁচড়ে পড়ছে একে ওপরের ওপর। বিবাহের এক উন্মাদনা ভরা সুভাসে, ছেলেটি তার দর্পণটা ও তার সোহাগী কন্যার গাছকৌটোটা মাচায় রেখে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। নিমেষেই যেন কন্যার হৃদয় ফেটে বেরিয়ে আসলো যখন ছেলেটি তার আলতো স্পর্শ কন্যার স্থনে করলো। তখন তুমি পলক ফেলার কোথাও ভুলে গিয়েছো। এবারে দুজনে ঐশ্বরিক চুম্বনের প্রথম ভেজা স্বাদে লিপ্ত হতে শুরু করল।
তুমি হাঁ করে শুধু দেখে যাচ্ছো দূর থেকে।
কপালের সৌখীনতার গহনা সরিয়ে, কন্যার গলায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের ওপর দিয়ে সমানভাবে চুম্বনের মায়াবী তৃপ্তি, তুমি শুধু দেখছো। কন্যার সিঁদুর এলোমেলো হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই, ছেলেটির গলায় কন্যা মায়াবী প্রেমের মিষ্টি দন্তাঘাতে নিজের সর্বস্ব লুটিয়ে ফেলল—
আর এদিকে তোমার চোখ দিয়ে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। পেছনে জঙ্গল থেকেও যেন কুহকিনী বাতাসে আসছে ঢেউয়ের মতো করে। রজনীগন্ধার গন্ধ এবারে যেন কমজোর হয়ে পড়েছে, তীক্ষ্ণতা কমে গিয়ে, বাতাসে ঘামে ভেজা দুটি দেহের গন্ধ আসছে, যারা ইতিমধ্যেই এই খোলা আকাশের মন্ত্রমুগ্ধ রাতে পূর্ণিমায়, নিজেদের সমস্ত বিলাসিতাগুলোর একটা একটা করে পাহাড় জয় করছে।
নিশির ডাকের মতো, দিঘির ওপার থেকে আসছে মিলন হওয়ার স্বর। একদম আছড়ে পড়ে তোমার হৃদয়। তুমি এবারে চিৎকার করে ডাকছো, তোমার প্রেমিকের নাম ধরে, আর্তনাদে ফেটে পড়ছে যেন এই রাত, রাতের আকাশ, দিঘি, অরণ্য সব; নিশীথের হাহাকার দেখছে সমস্ত অন্ধকার সৃষ্টি।
ঠিক তখনই শেষ ছোবলের পরম-সন্তুষ্টি পেয়ে দুজনেই যেন এবারে বিশ্রামের দিকে এগিয়ে চলল। তুমি দেখছো দূর থেকে—ছেলেটির কুঁচকানো ধুতিতে কন্যা-সন্তুষ্টির চিহ্ন—
লাল আভা গালে, তার দেহের উষ্ণতা এখন যেন দূর থেকে অনুভব করা যাচ্ছে। দুজনেই মাচা থেকে গাছকৌটো আর দর্পণ হাতে নিয়ে ধান ছেটাতে-ছেটাতে চাঁদের আলোয় অদৃশ্য হয়ে যায়।
তুমি এখন কথা, স্বর, সব হারিয়ে ফেলেছো। তোমার প্রেমিক নিরুদ্দেশ—সূত্র ছাড়াই উধাও সে। তোমারও তাপে ভরা দেহের আর্তনাদে ফেটে পড়ছে চারিদিক। চোখের জল ধুয়ে নিয়ে গেছে তোমার কাজল। চাঁদের থেকেও বেশি ফ্যাকাশে লাগছে তোমাকে এখন। অথচ তুমিও ছটফট করছো আরও বেশি এবারে বিরহে, বিচ্ছেদে এবং তোমার ইস্ট্রোজেনের মরণচাপে।
ঠিক তখনই... তোমার শরীরে ভোগের পরিতৃপ্তি ভেসে আসার আগের চমক যেন ফুটে উঠল...। তুমিও দীর্ঘশাস ফেলে নিজের প্রতি অঙ্গ আতৃপ্তি সমাপ্ত করতে একপা দুপা করে এগিয়ে গেলে। দীঘির ঠিক তীরেই তোমার ইস্ট্রোজেনের দেয়াল ভেঙে ভিজে উঠে অন্তঃকুঞ্জ, তোমার রাজনীগন্ধা নেই, হয়তো বাহ্ বদনাম রটবে। তোমার বেনারসি নেই, মুকুট নেই। তবুও দুহাতে অবয়ব তোমায় আহ্বান করছে। দুজনের আশ্লেষ হওয়ায় তোমার স্তনবৃন্ত যখনি তার কেশে ঢাকা বুক চুলো তার সমস্ত সংযম বিরতি নিয়ে মিলিয়ে গেলো দীঘির জলে। তোমার শরীরে সভ্যতার শেষ সুতো টুকুও তুমি খুলে, তার বীজদণ্ডতে উজাড় করে দিলে নিজেকে।
তোমার ঠোঁটের কোনায় ফুটে ওঠা শেষ মিলনের অনুন্ধানে যখন সমস্ত মানুষের ভিড় জমে গিয়েছিলো, একজন দূর থেকে তোমার ইস্ট্রোজেনের গন্ধে একা নীরবে সেই মাচায় গিয়ে বসে রইলো।
0 Comments.