- 36
- 0
প্রকৃতির হাত ধরে আসুক বিপ্লব, স্বীয় মাতৃভাষার আশ্রয়ে●●●
বিপ্লব হোক স্বতঃস্ফূর্ত, বিদ্রোহ হোক মানুষের বিবেকের স্বাভাবিক উচ্চারণ। যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, যে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাই চূড়ান্ত সত্য বলে বিবেচিত হয়, যে সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যের নামে চিন্তার জগত অবরুদ্ধ— সেই সমাজের অচলায়তন ভাঙা জরুরি। কখনও সে ভাঙন আসুক রবীন্দ্রনাথের মুক্তির আহ্বানে, কখনও নজরুলের লৌহকপাট ভাঙার দুর্বার শ্লোগানে।
বিপ্লবের ধারা ভিন্ন হতে পারে, তার ভাষা ও সুরও হতে পারে ভিন্ন এবং বিচিত্র; কিন্তু সর্বক্ষেত্রে তার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মুক্তি, বৈষম্যের অবসান এবং একটি অধিকতর ন্যায়সংগত পৃথিবী নির্মাণ।
বিপ্লব মানেই ধ্বংস— বা গেল গেল রব, তা কখনোই নয়। অগ্রগতি মানেই প্রকৃতির ওপর আধিপত্য নয়। প্রকৃতিকে পরাজিত করার যে অহংকার আধুনিক সভ্যতার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিন ধরে, আজ তার পরিণতি আমাদের সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে উন্নয়নের নামে, পাহাড়ে ধ্বস নামছে অপরিকল্পিত নির্মাণে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং দূষণ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে— প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতার স্থায়ী বিজয়কেতন উড্ডয়ন সম্ভব নয়।
দেশ হল সেই নদী, যার জলে কৃষকের ফসল বাঁচে; সেই বন, যার ওপর নির্ভর করে অসংখ্য প্রাণের অস্তিত্ব; সেই পাহাড়, যার ভূতাত্ত্বিক স্থিতি ও বনসম্পদ রক্ষা করে মানুষের জীবন; সেই কৃষিজমি, যা আমাদের খাদ্য জোগায়।
তাই সবার আগে দেশ— এই কথার মধ্যে দেশপ্রেমের যে আবেগ নিহিত, তার যথার্থ অর্থ খুঁজতে হবে দেশের মাটি, জল, অরণ্য, পাহাড়ের যথাযথ সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে। এমনকি মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যেও। পরিবেশকে বিপন্ন করে যে উন্নয়ন, তার চাকচিক্য যতই আকর্ষণীয় হোক, তা শেষ পর্যন্ত আত্মবিনাশেরই নামান্তর।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া একটি আধুনিক রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতির মূল্য দিচ্ছে কে? উন্নয়নের সুফল যদি কেন্দ্রীভূত হয় অল্প কিছু মানুষের হাতে, আর তার মূল্য দিতে হয় বননির্ভর জনগোষ্ঠী, কৃষক, শ্রমিক কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন।
শুধু কাগজে কলমে নয়, প্রকৃতিভিত্তিক বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য শর্ত মনে করে কাজ করতে হবে। তবেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
এই বৃহত্তর ভাবনা ও কর্মের পরিসরে ধর্ম, জাত, বর্ণ এবং পরিচয়ের প্রশ্নও নতুন করে বিবেচ্য হোক। মানুষের প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকুক, সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় থাকুক, সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক নিজের ছন্দে, জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি থাকুক— কোনও পরিস্থিতিতেও যেন মানুষের মর্যাদা ক্ষুন্ন না হয়।
লোকগান, আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, লোকশিল্প, কৃষিজ্ঞান, উদ্ভিদসম্পর্কিত ঐতিহ্য এবং প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত জীবনবোধের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত নিজেকে পুনর্নির্মাণ করে। তাই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে তার স্বাভাবিক বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করা আর এই বিকাশের অন্যতম প্রধান বাহন ভাষা। ভাষা একাধারে যোগাযোগের মাধ্যম, মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, জ্ঞান এবং কল্পনার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। একটি ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে কোনও অঞ্চলের উদ্ভিদের স্থানীয় নাম, ঔষধি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, ঋতুচক্রের পর্যবেক্ষণ, কৃষিকাজের সূক্ষ্ম কৌশল কিংবা প্রকৃতিকে বোঝার স্বতন্ত্র পদ্ধতি। বিশেষত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলির বিলুপ্তির সাথে সাথে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানজগতেরও। অতএব, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সংরক্ষণের জন্যই প্রয়োজন ভাষার সংরক্ষণ।
অন্যের কাছে পৌঁছনোর সেতু নির্মাণ করে ভাষা। বাংলা, অসমিয়া, বোড়ো, মিশিং, কার্বি, ডিমাসা, নাগামিজ কিংবা ভারতের অসংখ্য ভাষা—প্রত্যেকের নিজস্ব ইতিহাস আছে, গুরুত্বও যথেষ্ট। কোনও ভাষাকে বড় করতে গিয়ে অন্য ভাষাকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসার যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন এক ভাষাভাষী মানুষের অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি কৌতূহল এবং শ্রদ্ধা। বহুভাষাভাষী মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে তা হয়ে উঠতে পারে বৃহত্তর মানবিক সংলাপের ভিত্তি।
মাতৃভাষা হোক ক্লান্ত বিপ্লবীর আশ্রয়স্থল। যে মানুষটি দীর্ঘদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে, যে কণ্ঠটি প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তুলেছে, যে পথিকটি নতুন পৃথিবীর সন্ধানে পরিচিত ভূখণ্ড ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে—তার ফিরে আসার জন্য একটি ভাষা থাকুক। সেখানে সে তার পরাজয়ের কথা বলতে পারবে, ব্যর্থতার হিসাব মেলাতে পারবে, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার শক্তিও খুঁজে পাবে। মাতৃভাষা হোক আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ।
দেশের জন্য উন্নয়ন, প্রকৃতির জন্য সংযম, মানুষের জন্য সাম্য, সংস্কৃতির জন্য স্বাধীনতা এবং প্রতিটি মাতৃভাষার জন্য মর্যাদা— এই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার, প্রয়োজনে বিপ্লব আসুক প্রতিটি ক্ষেত্রে। মানুষ এগিয়ে চলুক প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে; নিজের ভাষায় শিকড় গেড়ে, অন্যের ভাষায় সংলাপ রচনা করে।
সায়ন্তন ধর
0 Comments.