- 31
- 0
শুভ বিজয়া
বিসর্জনের ঢাকটা আজ একটু বেশি করুণ শোনাচ্ছিল। অরুণ জানলার ধারে বসে শুনছিলেন। সারাদিনের ব্যস্ততার পর পাড়াটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এসেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যেখানে আলো, মাইক, মানুষের ভিড় – সেখানে এখন পড়ে আছে ছেঁড়া ফুল, কাগজের প্লেট আর বাঁশের কয়েকটা খুঁটি।
দুর্গাপ্রতিমা চলে গেছে। কিন্তু অরুণের মনে হচ্ছিল, শুধু প্রতিমাই নয় – আরও কিছু একটা চলে যাচ্ছে।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে চারটে ট্রলি ব্যাগ। নীলার ব্যাগটা সবচেয়ে বড়। কাল সকালে সে স্বামীর কাছে বিশাখাপত্তনমে ফিরে যাবে। বিয়ের পর কয়েক মাস বাবার বাড়িতে ছিল। এবার আবার সমুদ্রের শহরে তার নতুন সংসার। মেঘলার ব্যাগে বইয়ের চেয়ে বেশি গবেষণার কাগজ। আগামী মাসে সে চণ্ডীগড়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবে। অর্কর ব্যাগে ল্যাপটপ, কয়েকটা ফর্মাল শার্ট আর নতুন অফিসের আইডি-কার্ডের কাগজপত্র। সে চলে যাবে নয়ডার কর্পোরেট দুনিয়ায়। আর ছোট ছেলে ঋত্বিক? সে যাবে আহমেদাবাদ। মামার সঙ্গে টেক্সটাইলের ব্যবসায় ঢোকার কথা হয়েছে।
চারটি সন্তান। চারটি শহর। চারটি আলাদা ভবিষ্যৎ। আর অরুণ? এই পুরোনো বাড়িটায় তিনি আর তাঁর স্ত্রী দুজনে থাকবেন।
রান্নাঘর থেকে তাঁর স্ত্রী মাধুরী চায়ের কাপ এনে টেবিলে রাখলেন। – "এত চুপ করে আছ কেন?"
অরুণ মৃদু হেসে বললেন, "ভাবছি, আমাদের বাড়িটা এবার সত্যিই বড় হয়ে গেল।"
মাধুরী বুঝলেন কথাটার অর্থ।
বাড়ি বড় হয়নি। মানুষ কমে গেছে। রাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছিল।
নীলা বলল,"বাবা, তুমি এমন মুখ করে বসে আছ কেন? আমরা তো যাচ্ছি কাজের জন্য।"
অরুণ বললেন,"জানি।"
মেঘলা হেসে বলল,"তুমি কি চাও আমরা কেউ বাইরে না যাই?"
– "না। তোরা উড়বি। সেটাই তো চেয়েছিলাম।"
– "তাহলে?"
অরুণ একটু থেমে বললেন, "শুধু ভয় হয়, তোরা সবাই উড়ে গেলে এই মাটিটার কী হবে?"
অর্ক হেসে উঠল। – "মাটি? বাবা, এখন পৃথিবীটা অনেক বড়। কোথায় থাকছি সেটা এত গুরুত্বপূর্ণ নয়।"
অরুণ ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "হয়তো তোদের কাছে নয়।"
ঋত্বিক এতক্ষণ চুপ করে ছিল। হঠাৎ বলল, "আমি একটা কথা বলব?"
– "বল।"
– "এখানে থেকে কী করব? প্রতিদিন খবর খুললে অশান্তি। কোথাও মারামারি, কোথাও ভয়, কোথাও মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, কোথাও আবার দলাদলি। চাকরি করতে গেলে সুপারিশ, ব্যবসা করতে গেলে ঝামেলা। সবাই তো পালাতে চাইবে।"
কথাটা বলেই সে চুপ করে গেল। অরুণ কোনো উত্তর দিলেন না। জানালার বাইরে তাকালেন। পাড়ার মোড়ে বিশাল একটা রাজনৈতিক ব্যানার। গত মাসে যে মুখটা ছিল, আজ তার জায়গায় অন্য মুখ। নিচে বড় অক্ষরে লেখা – "নতুন দিনের স্বপ্ন।" অরুণ মনে মনে হাসলেন। এই শহরে স্বপ্নেরও যেন দল আছে।
পরদিন ভোরে প্রথমে মেঘলা বেরিয়ে গেল। তারপর অর্ক। নীলা যাওয়ার সময় মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঋত্বিক বাবার পা ছুঁয়ে বলল, "বাবা, রাগ করো না।"
অরুণ তার মাথায় হাত রেখে বললেন, "যা। নিজের মতো করে বাঁচ।"
চারটে গাড়ি। চারটে রাস্তা। চারটে বিদায়। তারপর গেটটা বন্ধ হয়ে গেল। অরুণ অনেকক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাড়ির ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত নীরবতা। সিঁড়িতে আর কারও পায়ের শব্দ নেই। বারান্দায় কারও হাসি নেই। রান্নাঘরে কারও চিৎকার নেই – "মা, চা দাও!"
মাধুরী ধীরে ধীরে এসে পাশে দাঁড়ালেন। – "কী ভাবছ?"
অরুণ বললেন, "ভাবছি, আমরা কি আস্তে আস্তে একটা দেশ খালি করে ফেলছি?"
মাধুরী চুপ করে রইলেন।
অরুণ আবার বললেন, "যে ছেলেটা এখানে বড় হলো, সে অন্য শহরে যাবে। যে মেয়েটা এই মাটিতে স্বপ্ন দেখতে শিখল, সে অন্য রাজ্যে গিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করবে। তারপর একদিন হয়তো আমাদের পাড়ায় শুধু বৃদ্ধ মানুষ থাকবে।"
মাধুরী বললেন, "সবাই তো আর ফিরবে না।"
– "সেটাই ভয়।"
বিকেলে বিসর্জনের পর পাড়ার ক্লাবঘরটা খুলে রাখা হয়েছিল। কয়েকজন বৃদ্ধ বসেছিলেন। কেউ তাস খেলছিলেন, কেউ চুপচাপ মোবাইল দেখছিলেন। অরুণ গিয়ে বসলেন। হঠাৎ পাশের বাড়ির রাম কাকু বললেন, "তোমার চার ছেলেমেয়েই চলে গেল শুনলাম?"
– "হ্যাঁ।"
– "আমার দুই ছেলেও বাইরে। একজন মুম্বই, আরেকজন কোচি।"
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইলেন। তারপর রাম কাকু বললেন, "জানো অরুণ, আগে মানুষ শহর বদলাতো। এখন মানুষ দেশটার ভেতরেই নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে বেড়ায়।"
অরুণ বললেন, "আর আমরা যারা থেকে যাই?"
রাম কাকু মৃদু হেসে বললেন, "আমরা স্মৃতি পাহারা দিই।"
সন্ধে নামছিল। দূরে কোনো বাড়িতে বিজয়ার প্রণাম নিতে লোকজন এসেছে। কেউ মিষ্টির বাক্স হাতে যাচ্ছে। কেউ ফোনে বলছে – "ভালো থেকো। আবার দেখা হবে।"
অরুণের ফোনটাও বেজে উঠল। স্ক্রিনে চারটে ভিডিও কল। চার সন্তান একসঙ্গে।
নীলা বলছে, "বাবা, শুভ বিজয়া।"
মেঘলা বলছে, "মন খারাপ করো না।"
অর্ক বলছে, "পরেরবার সবাই আসব।"
ঋত্বিক চিৎকার করে বলছে, "বাবা, মিষ্টি খেয়েছ?"
অরুণ হাসলেন। চারটে মুখ স্ক্রিনে। চারটে আলাদা শহরের আলো তাদের পেছনে। তিনি বললেন, "তোরা যেখানে থাকিস, ভালো থাকিস। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস – যে জায়গা তোদের বড় করেছে, তাকে পুরোপুরি ভুলে যাস না।"
কল কেটে গেল। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। অরুণ উঠে বারান্দায় এলেন। রাস্তার দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হলো – এই শহরটা এখনও পুরোপুরি ফাঁকা হয়নি। এখানে এখনও কিছু মানুষ আছে, যারা ভয় পেয়েও দরজা খোলে। অন্যায় দেখেও প্রতিবাদ করে। অপরিচিতের বিপদে পাশে দাঁড়ায়। কেউ চলে যায়, কেউ থাকে। কেউ শহর বদলায়, কেউ সময় বদলানোর অপেক্ষায় থাকে। আর সেই মুহূর্তে অরুণ বুঝলেন – "বিজয়া মানে শুধু বিদায় নয়।"
বিজয়া মানে, চলে যাওয়ার পরেও সম্পর্কের সুতোটা ধরে রাখা। মা দুর্গা বিসর্জনে যান। কিন্তু পরের বছর আবার ফিরে আসেন। হয়তো মানুষও একদিন ফিরবে। হয়তো সন্তানরা নয় – তাদের স্বপ্নগুলো ফিরবে। অরুণ দরজাটা খুলে বাইরে এলেন। পাশের বাড়ির বৃদ্ধা ডাকলেন, "অরুণবাবু, বিজয়ার মিষ্টি খাবেন?"
তিনি হাসলেন। – "অবশ্যই।"
তারপর দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। পেছনে পড়ে রইল অন্ধকার বাড়ি। সামনে ছোট্ট একটা আলো। আর অরুণ মনে মনে বললেন – "শুভ বিজয়া।"
0 Comments.