Tue 03 November 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে রাজকুমার ঘোষ

maro news
হৈচৈ ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে রাজকুমার ঘোষ

বিট্টুর সঙ্গী 

এরপর হরিদের জাহাজ কোন দেশে যাবে? পড়ুন ২৬তম পর্বে…  

   

জাহাজে চাকরি করার সুবাদে হরিদাদুর বিভিন্ন দেশে যাওয়ার মধ্যে জাপানও ছিল। বিট্টু হরিদাদুর সমস্ত ঘটনা শুনে মনের মধ্যে গেঁথে রেখেছে। বলা যেতে পারে, হরিদাদু ছোট্ট বিট্টুর বিরাট ফ্যান। হরিদাদু বিট্টুর কাছে জাপানে কাটাবার কথাও বর্ণনা করেছিলেন। সেই কাহিনি বিট্টু তার প্রিয় কাকা ঘোতনকে শুনিয়েছে। জাপানে হরিদাদুর অতিবাহিত করা দিনগুলোর বর্ণনা বিট্টুর কাছে শুনে ঘোতন যারপরনাই অবাক। সেই দেশে তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ঘোতন সত্যিই হতবাক। যে বিট্টুকে জড়িয়ে ধরে বলল, 

“এই কারণে তুই শিক্ষিত আর আমি মূর্খ” 

“কেন এমন বলছ ঘোতনকাকা? তুমি খুব ভালো। আমাকে ভীষণ ভালোবাসো” 

“সে তো ভালোবাসি। আমি বলতে চাইছি আমি কিছু জানতাম না। সারাটা জীবন শুধু মস্তানি, চুরি ডাকাতি করে কাটিয়েছি। পড়াশোনা করা খুব প্রয়োজন। আমি তোকে তোর বাবার কাছে ঠিক ফিরিয়ে দেব। ভালো করে তুই পড়াশোনা করে অনেক বড় হবি। তোর মা যেমনটি চেয়েছিল, তুই তেমনই হবি” 

“না, আমি তোমার কাছে থাকব। আমার বাবা আমাকে চায়না। সে থাকুক তার নতুন বৌ-এর কাছে” 

“আরে বাবা, তুই বুঝতে পারছিস না কেন? তোর নতুন মা’র যা বিবরণ দিচ্ছিস। তাতে করে মনে হয় তোর বাবা খুব শিঘ্রই নতুন মা’র আসল রূপ বুঝতে পারবে। বাবা, ঠিক তোর যত্ন নেবে দেখিস।” 

“ঠিক আছে ঘোতনকাকা, তাই হবে। তার আগে বলো, জাপান কেমন লাগল?” 

“আহা, খুব ভালো। তোকে একটা কথা বলার আছে। কথা দে, তুই মজা করবি না” 

“বলো?” 

“আমাকে পড়াশোনা শেখাবি?” 

“তুমি শিখতে চাইলে আমি নিশ্চয়ই শেখাব” 

“তুই খুব ভালো ছেলে বিট্টু। একেবারে মায়ের প্রিয় ছেলে। তোর কাছে জাপান সম্বন্ধে কত কিছু জানতে পারলাম। অথচ আমি জাপান নাম শুনেছি। ভেবেছি, বাসে করে জাপান যাওয়া যাবে। আমি একদম মূর্খ” 

বিট্টু ঘোতনের কথায় খুব জোরে হেসে ফেলল। ওর হাসির আওয়াজে ঘোতনের বোন সুলেখা ঘরের বাইরে থেকে বলল, 

“কিরে বিট্টু ঘুমোসনি? দাদার গলার আওয়াজও পাচ্ছি। কি কথা হচ্ছে?” 

“কিছু না। আমরা তোর শ্বশুরের কথা ভেবে হাসছি। বুড়োর এই বয়সেও টাকা কামানোর স্বভাব।“ 

“খবরদার, আমার শ্বশুরের সামনে একদম বলিস না। তোদের বাড়িতে থাকতে দেবে না” 

বোনের কথায় ঘোতন বেশী কথা বাড়াল না। বিট্টুকে ঈশারায় ঘুমোতে বলল। 


পরের দিন সকালে ঘোতন ঘুম থেকে উঠে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বিট্টু ঘুমিয়ে আছে। এদিকে বোনের শ্বশুরও ঘোতনের পিছু নিয়েছে। ঘোতনের গতিবিধি লক্ষ্য করাই তার মূল উদ্দেশ্য। সকালে গ্রামের রাস্তায় হেঁটে চলেছে ঘোতন। সূর্য তখনও সেভাবে মেলে ওঠেনি। হালকা আলোর রশ্মির আভাসে চারিদিকের গ্রাম্য পরিবেশ একটু একটু করে বিকশিত হচ্ছে। ঘোতন নিজের মনেই বলছে, “বিট্টুকে নিয়ে আসলে ভালো হত। সকালের পরিবেশ দেখলে ওর মনটা চনমনে হয়ে উঠত” এরই মধ্যে সে লক্ষ্য করেছে সুলেখার শ্বশুর ওকে অনুসরণ করছে। ব্যাপারটা ওর সুবিধার মনে হচ্ছে না। বুড়োর মনে সন্দেহ ঢুকেছে। সে ঘোতনের কার্যকলাপ সম্বন্ধে জানতে চাইছে। সত্যিই কি বিট্টুকে কিডন্যাপ করে টাকার ব্যবস্থা করবে? না কি ঘোতন একাই সমস্ত টাকা আত্মস্যাৎ করবে? ঘোতন তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগল। বুড়োর নাগালের বাইরে চলে যেতে চাইল। মোরামের রাস্তা ধরে সে হাঁটতে হাঁটতে দেখল, দুটো কুঁড়ে ঘর পাশাপাশি আছে। সেই ঘরদুটোর চারপাশ বেশ ঘন জঙ্গল, সবুজে মোড়া। সেখানে গিয়ে সে লুকিয়ে পড়ল। ঘোতন লুকিয়ে দেখতে লাগল বুড়ো কি করে? 

বুড়ো অর্থাৎ সুলেখার শ্বশুর ঘোতনের পিছু নিয়েছিল। কিন্তু কিছুটা যাবার পর সে ঘোতনকে দেখতে পেল না। চারিদিকে খুঁজতে লাগল। বেশ খানিকক্ষণ পায়চারি করল। তারপর কিছুটা এগিয়ে আবার পিছিয়ে এল। নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে লাগল, 

“শালা, শয়তান ঘোতনটা কোথায় গেল? আমার চোখকে ধুলো দেবে মর্কট, এতো সহজে আমি ওকে ছাড়ব না? 

ঘোতন কথাটা শুনে ওর কাছে এসে বলল, 

“কি করবে আমাকে? আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছি তুমি আমার পিছু নিয়েছ? কি ভেবেছ? বেশী বাড়াবাড়ি করবে না বুড়ো? আমি ভুলে যাব তুমি আমার বোনের শ্বশুর” 

“তোর মতলবটা কি? ঐ ছেলেটাকে নিয়ে কি করতে চাস? তোর জন্য আমরা বিপদে পড়ব? ছেলেটার বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নে। আমাদের হিস্যা বুঝিয়ে দিয়ে এখান থেকে কেটে পড়” 

“আমার মতলব কি? সেটা জানার দরকার নেই। তোমার মতলব যে সুবিধার নয়, সে ভালোই বুঝতে পারছি। খুব সাবধান। আমার সাথে বেশী চালাকি করতে যেও না। এই বয়সে প্রাণটা যাবে, তাই চাইছ? আমার সম্বন্ধে তুমি নিশ্চয়ই জানো” 

“তুই কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস?” 

“হ্যাঁ, তাই দেখাচ্ছি। এখনো ভোর হয়ে আছে। তোমাকে মেরে ওই খাল পাড়ের মাটিতে পুঁতে দেব। কেউ কিছু টের পাবে না। দু’দিন পর আমি পালিয়ে যাব। দেখবে, তোমার কি হাল করব?” 

ঘোতন এই কথা বলে বুড়োর গলা জোর করে টিপে ধরল। বুড়োর প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ওই অবস্থায় সে কোনরকমে ঘোতনের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইল। ঘোতন জানে, সে শুধু ভয় দেখাতে চাইছে। তাই ছেড়ে দিল। 

“যা ভাগ বুড়ো। আমার সাথে বেশী চালাকি করতে আসিস না। চোখে অন্ধকার দেখবি” 

শ্বশুর ভয়ে পালিয়ে গেল। যাবার আগে ঘোতনের কথাগুলো শুনে নিল, 

“বাড়িতে গিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকবি। কাউকে কিছু বললে, বাড়িতেই তোকে মেরে, লাশটা গুম করে দেব” 


বুড়ো পালিয়ে গেল। ঘোতন তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারল না। সেও ফিরে চলল, সে সিদ্ধান্ত নিল, এখানে আর থাকা যাবে না। যেভাবে বুড়ো পেছনে লেগেছে। এখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো। বিট্টুর বিপদ কমবে। কিন্তু সে কোথায় যাবে? সেটাই বুঝতে পারছে না। বিট্টুকে নিয়ে ওর বাবার কাছে সরাসরি যাওয়া যাবে না। তাতে ওর বাবার সন্দেহ বাড়বে। কারণ সেখানে ওর সৎমা আছে। পুলিশের জালে জড়িয়ে পড়তে পারে। মনে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘোতন ফিরে এল বাড়িতে। গিয়ে দেখল, সুলেখার শ্বশুর মেঝেতে পড়ে গিয়েছে। মাথা ফেটে গিয়েছে। না, বুড়ো চোখ মেলেই আছে। কিন্তু ঘোতনের চিন্তা হল, বুড়ো এসে সবাইকে বলে দেয়নি তো, সে বুড়োকে মারতে গিয়েছিল। ওকে প্রাণে মারবার হুমকি দিয়েছে। মনে একরাশ সাহস নিয়ে সুলেখাকে জিজ্ঞেস করল, “কি হল বুড়োর? মানে তোর শ্বশুরের? মাথা ঘুরে পড়ে গেল না কি?” 

“সকালে কোত্থেকে এসে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকতে গিয়ে হোঁচট খেল। মাথাটা ফেটেছে। জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে? জানাল, হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছে” 

যাক বুড়ো তাহলে সত্যিই ভয় পেয়েছে। ঘোতন বলল, 

“কি মেসোমশাই, ভয় পেয়ে গেছ? তুমি একদম চিন্তা করো না। ডাক্তার দেখিয়ে নিও। বিশ্রাম নিও। ঠিক হয়ে যাবে। এই বয়সে এতো ছটপট করার কি আছে? চুপটি করে থাকতে পারো না?” 

সুলেখার শ্বশুর ঘোতনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ঘোতন, মানুষটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে ওর ঘরের বিছানায় শুয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে বলল, 

“যা বললাম। বেশী কায়দা করেছ কি, একেবারে খাল পাড়ের মাটিতে পুঁতে দেব। নিজে ভালো থেকো, আমাদের ভালো রেখো। মাথা ঘামিও না” 

যাই হোক, এই বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে আরও বেশ কিছুটা দিন। বিট্টুর কাছে আরও অনেক কিছু শোনা যাবে। বিট্টুর খোঁজ করতে গেল ঘোতন। বিট্টু তখনও ঘুমের রাজ্যেই আছে। সকালে ঘটনার কোনও প্রভাব ওর উপর পড়েনি। বিট্টুর ঘুমন্ত মুখ বড় মায়াময়। ঘোতন ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, 

“বেচারা অল্প বয়সে মাকে হারাল। বড় ভালো ছেলে আমার বিট্টু। আমি তোর অধিকার ঠিক পাইয়ে দেব, তার জন্য আমার প্রাণ যাবে, কুছ পরোয়া নেহি”        

--------------------- 

ঘোতনের পরবর্তী পদক্ষেপ কি? … পরের ২৭তম পর্বে পড়ুন

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register