- 27
- 0
যদি বৃষ্টি না হয়
সাহিত্য সভার জন্য আমাকে, মাসে একবার সাহিত্য অনুরাগীদের বাড়ি যেতে হয়। একদিন সতীশবাবু নামে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে গেলাম। তিনি সাহিত্য সভার কথা
শুনে খুব আগ্রহ দেখিয়ে বললেন - হ্যাঁ খুব ভালো বিষয়। এই সাহিত্য সভার জন্য আমরা আগে কত কিছু করেছি। এপার বাংলা ওপার বাংলা একটা সাহিত্য
সেতু তৈরি করবার চেষ্টা করেছিলাম। পারলাম না। তারপর অখ্যাত লেখক-লেখিকাদের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করার চেষ্টা করলাম। সেতু অনেকটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোন সাহায্য পেলাম না। সেতুটা ভেঙে গেল। আমার খুব ভালো লাগছে আমাকে সাহিত্য সভায় যাওয়ার জন্য বলছো। তবে কি জানো আজকে বহরমপুর থেকে আমার এক দাদা আসবেন তিনি অনেকদিন পরে আছেন তো। একটু তার সঙ্গে থাকতে হবে। পরের সভাতে যাব। পরের মাসে গিয়ে বললাম "মেসোমশাই আজ যাবেন তো" অনেক দূর থেকে অনেকে আসে, আপনি কাছে থেকেও একবারও গেলেন না।
সতীশবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন - না না সে কি কথা ! সাহিত্য বলে কথা। এই সাহিত্যের জন্য আমরা কিনা করেছি। কত প্রতিভা খুঁজে খুঁজে বের করেছি। আমাকে দেখে ছেলে ছোকরারা খাটের তলায় লুকাতো। আমি তাদের খাটের তলা থেকে বের করে বলেছি। এই কবিতা লেখ, আইসক্রিম দেব। গল্প লেখ, পাটালি দেব। এইতো আমার উৎসাহে একজন কবিতা লিখে লন্ডনের বিশ্বকবি সম্মেলনে গেছিল। সেইসব দিনের কথা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। তবে এই মাসটা বাদ দাও বাবা। সোদপুরে এক ভাগ্নের বিয়ে। আমি আবার তার প্রিয় মামা কি না। সামনের মাসের সাহিত্য সভা যাবই। আমি মনে মনে বলি যাবেন না ঠিক আছে অসুবিধা থাকতে পারে। কিন্তু এত কথা কেন যে বলেন, বুঝি না। আমি বিষন্নতা চেপে রেখে বলি ঠিক আছে অসুবিধা থাকলে কি করবেন বলুন। প্রতিমাসের দ্বিতীয় রবিবার দমদম কিশোর ভারতী স্কুলে আমাদের সাহিত্য সভা হয়। আপনি একটু নোট করে রাখুন। যদি কোন অসুবিধা না হয় চলে আসবেন।
সাহিত্য সভা যথারীতি চলতেই থাকে। সাহিত্য সভায় যাওয়া, যাদের নেশা তাদের নিয়েই সাহিত্য সভা চলে। এর মধ্যে একদিন রাস্তায় সতীশবাবুর সঙ্গে দেখা। সতীশবাবু হাতের ব্যাগ নামিয়ে রেখে আমাকে বললেন - "আরে তুমি যে, আমার কাছে আর এলে না তো। কি ব্যাপার! সাহিত্য সভা হচ্ছে তো? আমি বললাম। নিশ্চয়ই হচ্ছে। আগামী দিনেও হবে। সতীশবাবু আমাকে সান্তনা দিয়ে বললেন - আমি যেতে পারিনি। তবে মনটা আমার খুবই আঁকুপাকু করে। মনে হয় সব ফেলে দিয়ে শুধু সাহিত্য নিয়ে থাকি। একদমই সময় পাচ্ছিনা, এই দেখো না, এক রবিবারে গেলাম নিক্কো পার্কে, তার পরের মাসে গেলাম - সায়েন্স সিটি দেখতে। তারপর ঘরের দরজা জানালা রং করা, বাড়ির সামনেটা বেড়া দিয়ে ঘেরা। এর মধ্যে পুরনো সাহিত্যের ছাত্ররা আসছে তাদের সঙ্গে নানা আলোচনা। আমি কেটে পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সতীশ বাবু ছাড়েন না। পথচারীদের শুনিয়ে আমাকে বলেন - শোনো
শোনো সাহিত্য সভা। তুমি যখন বলছ - সাহিত্যের ব্যাপার তো শত কাজ থাকলেও সাহিত্যের টানে মন ছুটে চলে দিগদিগন্তে।
পথচারীরা শুনছে দেখে আগ্রহ পেয়ে বললেন - "সাহিত্য সভা আমরা খুব বেশি না হলেও করতাম। আমাদের টার্গেট ছিল ছোকরাদের উপর। কেউ হয়তো ঘুড়ি ওড়াচ্ছে,
তাদের ঘুড়ি কেটে গেছে। আমি বলতাম সাহিত্য সভায় এসো। দেখবে হতাশার
পর কেমন আনন্দের জোয়ার আসে। মাঠের কোণে বসে তাস খেলছে। আমি গিয়ে বলতাম - ইয়ং ছেলে হয়ে তাস খেলছ! সাহিত্য সভায় যাও। দেখবে তাসের কথা আর মনে পড়ছে না। আমি সাহিত্যের জন্য নিজের শরীরের কথা ভাবি না। নিজের আয়, উন্নতি, অর্থ যশ, বিষয় সম্পত্তির কথা ভাবি না। আজকের সাহিত্য সভায় যাবোই। যদি বৃষ্টি না হয়।"
0 Comments.