- 9
- 0
পাখির বাসা
ছোট্ট মেয়েটার নাম তিতলি। গ্রামের মানুষ বলে, ওর নাম তিতলি হয়েছে বলেই ও এত চঞ্চল। কিন্তু তিতলি জানে, তার মা তাকে এ নাম দিয়েছিলেন কারণ তিতলির বাবা পাখি পছন্দ করতেন। এখন বাবা নেই। শুধু উঠোনের কোণে একটা পুরোনো বাঁশের খাঁচা রয়ে গেছে, তার ভেতরে একটা শালিক।
মা প্রতিদিন ভোরে উঠে খাঁচা পরিষ্কার করেন। শালিককে চাল দেন, জল দেন। তারপর মাঠে যান। সারাদিন কাজ করেন,ধান কাটা, কচুরিপানা তোলা, ভেজিটেবল বাগানে পানি দেওয়া। সন্ধ্যায় ফিরে রান্না করেন, তিতলিকে পড়ান, তারপর সেলাই করেন। মায়ের হাতে সবসময় সুতো জড়ানো থাকে।
তিতলি একদিন জিজ্ঞেস করল, মা, তোমার কি ছুটি নেই?
মা হেসে বললেন, মানুষের কাজ শেষ হয় না রে বুঝি।
তিতলি ভাবল, তাহলে পাখিরা কেন ছুটি পায়? তারা তো যখন ইচ্ছা উড়ে যায়, যখন ইচ্ছা গাছে বসে।
একদিন বিকেলে তিতলি খাঁচার পাশে বসে ছিল। শালিকটা হঠাৎ বলে উঠল, ছেড়ে দে আমাকে। আকাশ দেখতে চাই।
তিতলি চমকে গেল। পাখি কি সত্যিই কথা বলে? নাকি সে ভুল শুনেছে?
সে মাকে বলল, মা, আমাদের শালিক কথা বলছে।
মা এক মুহূর্ত থমকে গেলেন। তারপর চোখে জল চলে এলো। বললেন, তোর বাবাও বলত, এই পাখিটা একদিন কথা বলবে।
তিতলি বুঝল না। কিন্তু সে দেখল, মায়ের চোখের জল ঠিক যেন বৃষ্টির ফোঁটার মতো,রঙ নেই, তবু সব কষ্ট ভিজিয়ে দেয়।
কয়েকদিন পর গ্রামে মেলা বসল। তিতলির মা তাকে নিয়ে গেলেন। সেখানে এক লোক খাঁচায় বন্দি টিয়া পাখি বিক্রি করছিল। টিয়াটা বারবার বলছিল, রাম রাম। ছেড়ে দে। রাম রাম।
লোকটা হাসছিল। মানুষরা কিনছে। তিতলি জিজ্ঞেস করল, এই পাখিটা কোথা থেকে এলো?
লোকটা বলল, জঙ্গল থেকে।
তিতলি ভাবল, জঙ্গল থেকে এনে খাঁচায় বন্দি করা হয়েছে। আর মানুষ কিনে নিচ্ছে। পাখির আকাশ কেউ কেনে না। আকাশ তো সকলের জন্য । তবু পাখিরা তা হারায় কিছু স্বার্থপর মানুষের জন্য। চিড়িয়াখানা বা খা়চায় বন্দি করে রাখে বন্য প্রাণীদের।
সে মাকে টেনে বলল, মা, আমরা কিনব না। আমাদের শালিককেও ছেড়ে দিই।
মা কিছু বললেন না। শুধু তিতলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
বাড়ি ফিরে তিতলি খাঁচা খুলল। শালিকটা একবার তাকিয়ে রইল। তারপর ডানা মেলে উড়ে গেল। আকাশের দিকে।
তিতলি চোখে জল রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। মা পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ভালো করেছিস রে।
তিতলি জিজ্ঞেস করল, মা, পাখিরা কি ফিরে আসে?
মা বললেন, যারা ভালোবাসে, তারা ফিরে আসে।
সেই সন্ধ্যায় তিতলি দেখল, শালিকটা আবার এসেছে। উঠোনের গাছে বসে আছে। খাঁচায় ঢুকল না, কিন্তু গান করল।
তিতলি বুঝল,ভালোবাসা মানে বন্দি করা নয়। ভালোবাসা মানে ছেড়ে দেওয়া, তবু ফিরে আসার আশা রাখা।
0 Comments.