- 35
- 0
শহরতলির ইতিকথা
রাজীবের কলেজ তো নৈশ- বিভাগে,সুতরাং সে ও রমাকান্তবাবু সাইকেল করে রাতে ফিরতি পথে একসঙ্গে বেশ কিছুটা পথ আসে, তারপর তো ছাড়াছাড়ি; পরে, একলাই বাড়ি আসতে হয়; রাস্তায় লোক চলাচল দেখতে পায়, ঐ পথে চট-কলের কাছে এলে, দেখে, দারোয়ানেরা গেটের সামনে ও ভিতরে, সন্ত্রস্ত ও সজাগ,তবে,মুখে চোখে একটা আতঙ্কের ভাব।কয়েকদিন আগেই কারখানার অদূরেই,কারখানার প্রাক্তন ক্যাসিয়ার,সুদের ব্যবসাও করতো, তারই বাড়ির সামনে,রাস্তার অপর পারে অর্থাৎ গঙ্গার দিকে, ব্যাঙ্কের সামনে,
নক্সালরা খুন করেছে। খোঁজ চলছে।চারদিকে,সিআরপি'র বুটের আওয়াজ। কোথাও, কখন, কোন জায়গা ঘিরে ,বাড়ি বাড়ি
তল্লাশি চলবে,তা বোঝা ভার।সেই সময় ঐ পাড়া বা ঐ এলাকায়,সাময়িক কার্ফু; ঐ খানে তখন কারো ঢোকা বা ওখান থেকে বের হওয়া যাবে না; সিআরপি'র জোয়ানেরা, প্রবেশ পথে আটকাবে;ওদের তল্লাশি শেষ হলে,তবেই ঐঅস্থায়ী কার্ফু উঠে যাবে,এ এক অসহনীয় অবস্থা!
রাজীবের পাড়ার ছোট ছোট ছেলেদের উপর ঐ নক্সালাইটদের প্রভাব বেশ;ওরা, এই সিআরপি-নক্সালাইটদের লুকোচুরি খেলা,বেশ উপভোগ করে;পড়াশোনার তো বালাই নেই;সিআর পি'র গাড়ি দেখলেই এই বাচ্চাদের দল,ঐ নক্সালাইটদের কাছে খবর পৌঁছে দেয়-,খোচর- বৃত্তিতে,ওরা আনন্দ পায়;ওদের খেলার সরঞ্জাম সরবরাহ করে ঐ দাদারা; এভাবেই ছেলেগুলোকে হাত করে নিয়েছে,ওরাই এখন ছেলেদের কাছে গড-ফাদার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় নকল করা চলছে অবাধে,কারও কিছু বলার নেই।
বই দেখে হচ্ছে পরীক্ষা,অন্য কলেজের নক্সালরা এসে,অঙ্ক কষে দিচ্ছে; ইনভিজিলেটররা,সাহস করে পরীক্ষার হলে থাকতে পারেন না,আতঙ্ক গ্রাস করেছে সবাইকে----মুক্তাঞ্চল হলে যা হয় আর কী!এই টোকাটুকি করে পাস করতে,কিন্ত,কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র-সংগঠন পিছপা নয়,সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা এখন প্রহসন,মেধা যাচাই'র প্রশ্নই ওঠে না।রমার মত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে,এই অবাধ টোকাটুকির পরীক্ষা-পদ্ধতি ভগবানের আশীর্বাদ। রমা,প্রি-ইউনিভারসিটি পরীক্ষায় সম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে,তিন বছরের ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হয়েছে,অবশ্যই পাস-কোর্সে,এখন সে পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় বসেছে,আর যাই হোক পরীক্ষা একে বলা যায় না;বিশ্ববিদ্যালয় অসহায়,সবাই অসহায়,কিন্ত মুখে প্রতিবাদ করার সাহস কারো নেই,তাহলেই লাশ হয়ে যাবে।দেশে,রাষ্ট্রপতি-শাসনের পর নির্বাচন হলো;সেও এক প্রহসন;বামদলগুলোকে তো ভোটের দিন,বেরোতেই দিল না;কেন্দ্রের সরকারী দলের লোকই মুখ্যমন্ত্রী,তাই তারপক্ষেও
নিজের ছাত্র-সংগঠনের বিরুদ্ধাচরন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।তবে,নক্সাল দমনের তোড়জোড় চলছে জোড় কদমে।
অঞ্চল বা জেলা হাসপাতালের চিত্রটা পাল্টিয়ে গেছে;ডাক্তারদের ফি কমে গেছে;কোনো রুগী হাসপাতালে ভর্তি করতে ঐ নক্সালাইটদের শরণাপন্ন হলে,জানবেন,সব সুন্দরভাবে ঘটে যাবে;রাতে,রোগী ভর্তি হলো; ডাক্তারেরা তো রাতে থাকে না; ঐ নক্সালদাদা,প্রথমে ডাক্তারের কোয়ার্টারে গিয়ে করবে অনুরোধ;কোনো বেগরবাঁই তো,ডাক্তারের কলারে উঠবে হাত,চলবে
শাসানি; যদি রোগীর মৃত্যু ঘটে,তো,ডাক্তারের ছেলে-মেয়েও হয়ে যাবে লাশ,অতএব,চলো,রাতেও ভর্তি হওয়া রোগীর ট্রিটমেন্ট করতে-- সাধারণ জনগনের কাছে এতো আশীর্বাদ! ভয় হলেও ওরাই তো সাধারণ মানুষের ভরসা,সুতরাং,গরীব-গুর্বোর মধ্যে,ওদের একটা প্রভাব আছে।ওদের মধ্যে সত্যি করেই যারা নক্সালাইট,তারা তো আদর্শবাদী;হঠাৎই দেখা গেল,সব আদর্শবাদীগুলোই একে একে পুলিশের জালে আবদ্ধ হলো;অধিকাংশকেই,পুলিশ কাউন্টার করে মেরে দিল অথবা একেবারেই নুলো করে ছাড়লো;বেশ কিছূ নক্সালকে পুলিশ,লোক-দেখানি ধরে নিয়ে গেল,তারপর,কয়েকদিন পরেই মুক্তি,অথবা ভালো চাকরিতে বহাল করা চললো;পরে বোঝা গেল,পুলিশই ঐ সব ছেলেদের,নক্সালাইটদের মধ্যে ঢুকিয়ে,নক্সালাইটদের আন্দোলনকে কড়াহাতে দমন করার মতলব করেছে; রাজনীতির ঘূর্ণির মাঝে পড়ে একটা জেনারেশন, প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হল।যে বাঙালি,সারা ভারতকে শিক্ষার পথ দেখিয়েছে,আজ সে নুলো বনে গেল: রাজীব ভাবে,এরা কারা,নিজের ভালো,দেশের ভালোবাসার বোঝে না,সারা দেশে বাঙালি নিজেকে হাসির খোরাক করে তুলেছে।
সজীব কারখানায় বাম রাজনীতি করা শ্রমিক ইউনিয়ন করে,অতএব সেও সংশোধনবাদী;রাজীব,ওদের এ সব রাজনীতি বোঝে না;কী সংশোধন, কী ঠিক, সবই তার কাছে বেঠিক বলে বোধ হয়।নিজের কাজ ঠিকমত করতে হবে,নিজের কর্মস্থল হবে মন্দির,কারন,তা মুখে অন্ন যোগায়।সুতরাং,সেই মন্দিরকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করাই ধর্ম,না, এ মন্ত্র শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলবে না,দাবির সঙ্গে দায়িত্ব যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত,তা বললে তো নিজের বৈপ্লবিক ভাবটা টসকে যায়,আর শ্রমিক তো তাৎক্ষনিক লাভটাই বোঝে,ফলে প্রকৃত রাজনৈতিক আদর্শবাদী ব্যক্তিত্ব তাদের কাছে হয় অপাংক্তেয়--চলে ধূর্ত রাজনীতির রমরমা।
চলবে
0 Comments.