- 59
- 0
আজকাল, দিনকাল, সমকাল
সময় কখনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সে বদলায়—নদীর স্রোতের মতো, কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল। আজকের পৃথিবীও ঠিক তেমনই এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চারদিকে প্রযুক্তির ঝলকানি, তথ্যের বিস্ফোরণ, উন্নয়নের উচ্চকিত স্লোগান—তবু মানুষের ভিতরে কোথাও যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। এই “আজকাল”-এর সঙ্গে “দিনকাল”-এর দূরত্ব যত বাড়ছে, “সমকাল” ততই হয়ে উঠছে এক জটিল আয়না।
একসময় মানুষ খবরের কাগজ খুলে পৃথিবী চিনত, এখন পৃথিবী মানুষের মুঠোফোনে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু তথ্য যত বেড়েছে, সত্য তত সহজ হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে মতামতের চিৎকার এত প্রবল যে, সংলাপের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। মানুষ শুনতে কম চায়, বলতে বেশি চায়। ফলে মতের ভিন্নতা এখন প্রায়শই শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রের প্রাণ যে সহনশীলতা, সেটাই আজ সবচেয়ে বিপন্ন।
অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়নের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে, কিন্তু সমাজের ভিতরে বৈষম্যের দেয়ালও সমান গতিতে উঁচু হচ্ছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, বিলাসী নগরসভ্যতা; অন্যদিকে বেকার যুবক, কৃষকের অনিশ্চয়তা, শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস। প্রযুক্তি মানুষকে দ্রুত করেছে, কিন্তু সবসময় মানবিক করেনি। এই বৈপরীত্যই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আমরা এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে বাস করছি। বিশ্বায়নের ঢেউ আমাদের পৃথিবীর কাছে এনেছে, কিন্তু নিজের মাটি থেকে অনেককে দূরেও সরিয়ে দিয়েছে। লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক ভাষা, গ্রামীণ ঐতিহ্য—সবকিছু যেন বাজারের চাপে ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। অথচ একটি সমাজ তার শিকড় ভুলে গেলে, তার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
তবু এই সময় সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রশ্ন করতে জানে, প্রতিবাদ করতে জানে, নতুন স্বপ্ন দেখতে জানে। পরিবেশ রক্ষা থেকে সামাজিক ন্যায়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন চেতনা জন্ম নিচ্ছে। মানুষ এখনও কবিতা লেখে, গান গায়, গাছ লাগায়, বন্ধুত্বে বিশ্বাস রাখে। এই ছোট ছোট মানবিক কাজগুলোই প্রমাণ করে, সমকাল এখনও পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়ে যায়নি।
সময়কে দোষ দেওয়া সহজ, সময়কে বোঝা কঠিন। “আজকাল” যদি অস্থির হয়, তবে “সমকাল”-এর দায় আমাদের সবার। কারণ সমাজ কেবল শাসক বা প্রযুক্তি তৈরি করে না—সমাজ তৈরি করে মানুষ, তার চিন্তা, তার বিবেক। তাই প্রয়োজন আরও সংবেদনশীলতা, আরও সহমর্মিতা, আরও প্রশ্ন করার সাহস।
শেষ পর্যন্ত, সময়ের প্রকৃত পরিচয় নির্ভর করে আমরা তাকে কেমন করে বাঁচছি তার উপর। আজকের দিনকাল হয়তো দ্রুত বদলাচ্ছে, কিন্তু মানুষ যদি তার মানবিকতা হারিয়ে না ফেলে, তবে সমকাল এখনও আশার আলো দেখাতে পারে।
এইসব তিন কাল নিয়ে কথাবার্তা আজ এটুকুই থাক, কাল বিলম্ব না করে পড়ে নিই গতকাল কবিরা কি লিখেছেন আগামীকালের জন্য।
সায়ন্তন ধর
0 Comments.