- 9
- 0
ট্রফি মিথ্যে নয়, সত্যি নয়
এর মধ্যে ঘরের সোকেস ভরে উঠলো নানা ধরনের ট্রফিতে । মায়ের গর্ভ হয়ে তাঁদের শোবার ঘরে একটা সুন্দর ট্রফি। ঠাকুরদার ঘরেও একটা । দিদা খুব যত্ন করে তাঁর ঘরেতেও একটা সাজিয়ে রেখেছেন। বাড়ির কাজের মেয়েটাও একটা নিয়ে গেছে। কিন্তু প্রীতমের ঘরের দেওয়ালে বিভিন্ন রেসলারদের ছবি ।
বাড়িতে কেউ এলে তাকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় বসার ঘরে। সেখানেই সোকেসটা সাজানো। আর আছে দুটো সোফা,একটা চারকোণা সুন্দর টী টেবিল। দেওয়ালে বড় মাপের এল.জি. স্মার্ট টি.ভি. ।আর আছে বড় মাপের বাঁধানো প্রীতমের কয়েকটা ফটো, একটাতে রয়েছে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার ছবি। বাকি বাড়ির অন্যান্যদের। অসীমবাবু পায়ে পায়ে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নেওয়া ছবিটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন । জিজ্ঞেস করলেন , দিল্লীতে?
না মানে, ওই -
হ্যাঁ তাই তো দেখছি, কিন্তু রাষ্ট্রপতি কি একা থাকেন ? এটা কোথায় ? কবে হলো ? এবারে স্টেট চ্যাম্পিয়নে এবং স্কুল চ্যাম্পিয়ন দুটোতেই আমি ছিলাম। রাষ্ট্রপতি তো আসেননি। অসীমবাবু প্রায় নিজের মনে বলে চললেন।
ও টিমের সঙ্গে যায়।
হুঁ, মাথাটা ঠিক পাকেনি। তা ওস্তাদকে? মা না বাবা ?
এক্স মিলিটারি অসীম ভদ্রের প্রশ্নটা বীথি ঘোষ ঠিক বুঝতে না পেরে বললো - আমাদের বাবু !
তা তো বুঝলাম, ওস্তাদকে? তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন।
ওই তো সেলিম!
স্টেট, ন্যাশানাল না ইন্টার ন্যাশনাল?
বীথি খুব বেশিদূর পড়াশুনা করেনি । মাধ্যমিক গণ্ডি পেরিয়ে ছিল কিনা কেউ জানে না। প্রয়োজনও হয় না,হবেও না। শ্বশুরের জমিজমা যা আছে নামে বেনামে, তাতে ছেলেদের চাকরির প্রয়োজন ছিল না। তবুও একদিনও মাঠে না গিয়ে দুই ছেলেই পুলিশে চাকরি পেয়ে গেছে। তারাও স্কুলে কোনোদিন সুনাম অর্জন করতে পারেনি । মাধ্যমিক নিয়ে সংশয় আছে অনেকের।
অসীম ভদ্র এই ঘোষবাড়ির বুড়ো কর্তার মাসতুতো শালা । সেনাবাহিনীতে যাবার আগেই এই বোনকেই নিজের বোন মনে করতেন । তাই সব রকম দায়-দায়িত্বও পালন করতেন । নিজেদের সামর্থ্য তেমন ছিল না বলেই মাসির ওপর নির্ভরতা ছিলেন । সেনাবাহিনীতে চলে যাবার পর আর সেভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হয়নি। অন্য মামাতো পিসতুতো বোনেদের মধ্যে এই বোনটার প্রতি মায়া ছিল বেশি , কেননা সে ছিল বোবা । মাসির বিসাল সম্পত্তির বিনিময়ে বোবা বোনের আইবুড়ো নাম ঘুচেছিল । আর সেইখানেই ঘোষকর্তা ফুলে ফেঁপে ঢোল । বোন কতখানি আদরে আছে ,তার নজরদারির অভ্যাসে এই বাড়িতে আসা । বোনের মৃত্যুর পর থেকে আর তেমন আসেন না। বছরে ওই পুজোর আগে দায়িত্ব পালন করতে।
প্রীতম ঘোষ বারো তেরো বছরের,মোটা প্রকৃতির, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে , বাবার থেকে একটু উজ্জ্বল কালো, সাড়ে চার কি পাঁচ ফুট উচ্চ, বাড়ির একমাত্র ছেলে । স্কুল থেকে ফিরে বাইরের জুতো পায়েই ঘরে এসে ঢুকলো, গায়ের জামা ও মাথার চুল বলে দিচ্ছিল সারাদিনটা কেমন গেছে । অসীমবাবু সেনাবাহিনীতে থাকার কারণে কারো বেচাল সহ্য করতে পারেন না । জুতো পায়ে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি বলে উঠলেন - নো নো ডিয়ার , জুতোটা বাইরে।
সে এমনভাবে তাকিয়ে মসমসিয়ে ওই জুতো পায়েই ভেতরে ঢুকে গেল এমনভাবে যেন,তুই কে রে জ্ঞান দিতে এসেছিস? দেওয়ালের ফটোর সঙ্গে মুখে মিল থাকায় আর পরিচয়টা জানার প্রয়োজন হয়নি। তার মাও আগ্রহী হলো না । তবু স্বভাব বশে অসীমবাবু জিজ্ঞেস করলেন, পড়াশুনা কেমন করছে ?
করছে তো । বড্ড ফাঁকি বাজ।
হুঁ , মাঠে যায় , নিয়মিত?
সময় পাচ্ছে কোথায়? এই তো এলো, এখুনি পড়তে চলে যাবে। আর পাঁচ দিন তিন জায়গায় ক্যারাটে। সকালেও সময় পায় না।
কটায় ওঠে ?
ডাকতে ডাকতে নটা । তারপর তো স্কুলে।
হুঁ ,এত ট্রফি? প্রতিভা ! জানো তো বউমা আমাদের রাজ্যে একটা তেলের খনি কাজ শুরু করলো অশোকনগরে ? এবার তাহলে রান্নার গ্যাস আর পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমবে বলো ?
তা তো হবে মামা !
না না , দাম কমে না । যাইহোক ক্যারাটে শিখছে বলে যেন মারপিট করতে যায় না। এই একটাও ট্রফি তখন কাজে লাগবে না। তা তোমার শ্বশুর কোথায় ? দেখছি না ।
ওনাকে তো ডেকে এলাম। ঘরেই আছে।
চলো দেখি,বোন তো আমার, দেখা করেই যাই । বলতে বলতে প্রীতমের জুতোর ছাপ ধরে ভেতরে ভগ্নিপতির ঘরে গিয়ে থামলেন। সেখানে কেউ নেই। অসীমবাবু উঁকি মেরে সোজা হয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। গম্ভীর হয়ে গেলেন।
বাবা নেই? বীথি জিজ্ঞেস করলো ।
দরকারে বোধহয় কোথাও - আচ্ছা, আমিও তাহলে আসি বৌমা । ও হ্যাঁ , এবারে আর পুজোর সময় আসব না, তুমি এই টাকাটা রাখো ।বলে পকেট থেকে সাত হাজার টাকা বীথির হাতে দিয়ে বললেন, তোমার পছন্দ মতো কিনে দিও । আসি তাহলে?
অতদূর থেকে এলেন, একটু চাও খাবেন না ?
এইটুকুই যথেষ্ট। জিনিসপত্রের যা দাম । তেলের খনি পাওয়া গেছে বলে দাম তো কমবে না। তোমাদের ঘরের ট্রফির মতো আরকি। চলি মা ।
অসীম ভদ্রের দোষ বড্ড বেশি কড়া মেজাজ । আর জ্ঞান দেন । বাড়িতে প্রীতমের বাবা ও কাকা সবাই ছিল ওপরে যে যার ঘরে । অন্যদের মতো অসীমবাবু অর্থের অহংকার প্রদর্শন করেন না । সেনাবাহিনী থেকে ফিরে সরকারি অফিসেও চাকরি করেছেন। বিয়ে থা করেন নি । রিটিয়ারের পর যা পেয়েছিলেন,তা থেকে নিজের খরচ চালান ।আর খেলাধুলায় জড়িত ক্লাবগুলোকে প্রতিবছর সামর্থ্য মতো সাহায্য করেন । সেনাবাহিনীতে থাকার সময় অল্পবিস্তর সব কিছু শিখতে হয়েছিল। তাই বিভিন্ন সংস্থা থেকে জাজমেন্টের জন্য আগে আমন্ত্রিত হতেন । এখন আর কেউ দেখতেও ডাকে না।
ভদ্রলোক ঘোষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনে এসে বসেছিলেন । হঠাৎ ঘোষ বাড়ির দিক থেকে হৈহৈ গন্ডগোল ভেসে এলো। স্টেশন থেকে দেখা যাচ্ছে। অসীমবাবুর মন না চাইলেও গেলেন। একটা ট্রেন ছেড়ে দেওয়া মানে ফিরতে আরও দুঘন্টা দেরি। কি আর করা যাবে! তিনি ঘোষ বাড়িতে ফিরে গিয়ে শুনলেন , ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন প্রীতম ঘোষ সমবয়সী এক ফুটবলারের হাতে ধোলাই খেয়ে ধ হয়ে গেছে।
বাড়ির পাশেই মাঠ । খেলতে না গেলে যে মস্তানি করা যাবে না,তা তো নয়। বলটা ছুটে এসে বেড়ায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে রাস্তায়। ফুটবলার ছেলেটা হাত দিয়ে বলটা ধরেছে সবে,প্রীতম তার হাত সমেত সট মেরে বসে। ফুটবলার ছেলেটা কৈফিয়ৎ চাইলে চ্যাম্পিয়ন তাকে ঠেলা মেরে ফেলে দেয় । সে ছাড়বে কেন, বুনো রাগের কাছে ক্যারাটের প্যাঁচপয়জার দেখাবার সময় কোথায়।
বাকি ফুটবলাররা ছুটে এসে ছাড়িয়ে দিলেও ততক্ষণে চ্যাম্পিয়নের নাক মুখ ফেটে গেছে। মাঠের হৈচৈ আর ছেলের হাউমাউ কান্না শুনে ঘোষ বাড়ির সকলে বেরিয়ে এসেছিল। পুলিশ বাড়ি বলে কথা । কিন্তু গ্রামের দিকের মেঠো ছেলেরা কাউকে ভয় পায় না। অসীমবাবু ঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। দুপক্ষের ঠেলাঠেলি লাঠালাঠিতে ওঠার আগেই তিনি মিলিটারি ঢঙে গর্জে ওঠেন । দু পক্ষ ক্ষণিকের জন্য থমকে যায় । ওইটুকুই সময় । অসীমবাবু উভয় পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাগ্নেদের উদ্দেশ্যে বলেন, খেলার মাঠের ঝগড়ায় তোমরা এসেছো কেন ? এটা ট্রফি নয় ,আসল লড়াইয়ে জায়গা। যাও , ওর ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করো গিয়ে। তারপর মাঠের ছেলেদের দিকে ফিরে বললেন, খেলোয়াড়দের এত মাথা গরম করতে নেই । যাও , মাঠে যাও । ভালো করে প্রাক্টিস করো । সামনের নভেম্বরে আর্মিতে কাস্টিং আছে । তোমাদের ফোর্ট উইলিয়ামে দেখতে চাই । আমি থাকবো ।
তাঁর চেহারা আর গলার গাম্ভীর্য সকলকে মোহিত করে। খেলোয়াড়রা ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে অসীমবাবু পকেট থেকে নিজের কার্ড বের করে একজনকে কাছে ডাকেন , শোনো। এটা রাখো । কোনো সাহায্যে প্রয়োজন হলে ফোন করবে। আর্মিতে কেউ ঘুষ দিয়ে ঢুকতে পারে না । নিজেদেরকে তৈরি করো,আমি আছি ।
কার্ডে লেখা ছিল ব্রিগেডিয়ার অসীম ভদ্র। গ্রাম হলেও তারা অশিক্ষিত ছিল না। ব্রিগেডিয়ার কী তারা জানে । ছেলেটা প্রণাম করবে না স্যালুট জানাবে বুঝতে পারছিল না । অসীমবাবু মিলিটারি কায়দায় লং মার্চের আওয়াজ তুলে খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে স্যালুট জানালেন।
মাঠের ছেলেরা ফিরে গেলে বিজয় ঘোষ এগিয়ে এসে বললো, আসুন মামা ।
সেকি ! বৌমা যে বললো তোমরা কেউ বাড়িতে নেই । অসীমবাবু বললেন।
বৌদি হয়তো জানতো না -
ঠিকই , আমিও জানি না তোমরা আছো। না জানাটাই ভালো । চলি , ও হ্যাঁ,বৌমাকে বলো , সত্যি সত্যি জিনিসের দাম কমবে না ।
৩১ আগস্ট ২০২৬
0 Comments.