- 8
- 0
আলোর উৎসবে হাড়াল
শরতের আকাশে তখন সাদা মেঘের আনাগোনা। বাতাসে পুজোর গন্ধ। কাশফুলের দোল, শিউলির সুবাস আর সন্ধ্যার আকাশে পাখিদের ঘরে ফেরার দৃশ্য জানান দিচ্ছে, মা আসছেন। শহর থেকে গ্রাম – সর্বত্রই উৎসবের প্রস্তুতি। কিন্তু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চম্পাহাটির হাড়াল অঞ্চলে উৎসবের আমেজ একটু অন্যরকম। এখানে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় আরেক উৎসবের আয়োজন – বাজির মেলা। শিয়ালদহ থেকে ক্যানিংগামী লোকালে চেপে চম্পাহাটি স্টেশনে নেমে রেলগেটের দক্ষিণ দিকে এগোলেই অটো, টোটো আর মোটর ভ্যানের সারি। গন্তব্য চিনের মোড়, হাড়াল। রাস্তার দুপাশে তখন নানা রঙের দোকান। কোথাও মিষ্টির গন্ধ, কোথাও লুচি ভাজার শব্দ, কোথাও আবার চা-সিঙাড়ার আড্ডা। কিন্তু মানুষের আসল আকর্ষণ বাজির দোকান। চিনের মোড় থেকে বাঁদিকে হাড়ালের দিকে যত এগোনো যায়, ততই চোখে পড়ে বাজির সম্ভার। রাস্তার দুপাশে সারি সারি দোকান, দোকানের সামনে সাজানো রঙ-বেরঙের প্যাকেট। মনে হয়, যেন এক টুকরো রঙিন পৃথিবী নেমে এসেছে মাটিতে।
হাড়ালের বাসিন্দা নিতাই মণ্ডল। বংশপরম্পরায় তাঁদের পরিবার বাজি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। বাবা, ঠাকুরদা – সবাই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছোটবেলা থেকে নিতাই বাজির কারিগরি, ব্যবসার ওঠাপড়া আর উৎসবের মরশুমের ব্যস্ততা দেখে বড় হয়েছে। এখন তার নিজেরও একটি দোকান রয়েছে। শুধু হাড়াল নয়, আশপাশের বহু গ্রামের মানুষও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কারও বাড়িতে বাজি তৈরি হয়, কেউ প্যাকেটজাত করেন, কেউ দোকান সামলান, আবার কেউ দূরদূরান্তে বাজি সরবরাহ করেন। নিতাইয়ের ছেলে বাবাই কলকাতার একটি কলেজে পড়ে। বাবার ব্যবসা নিয়ে তার একটু অন্যরকম ভাবনা। সে চায় পড়াশোনা শেষ করে অন্য কোনও চাকরি করবে। বাবার মতো বাজির ব্যবসায় নামার ইচ্ছা তার নেই। একদিন সন্ধ্যায় বাবাই বাবার দোকানে এসে দাঁড়াল।
—বাবা, এত কষ্ট করে এই ব্যবসা করো কেন? সারাবছর তো তেমন বিক্রি নেই। দুর্গাপুজো আর কালীপুজোর সময়টুকুই যা রোজগার।
নিতাই হেসে বলল, "তুই ঠিকই বলেছিস। কিন্তু এই কয়েকটা মাসের রোজগারেই কতগুলো সংসার চলে জানিস? শুধু আমাদের পরিবার নয়, আশপাশের কত মানুষের হাঁড়ি চড়ে এই ব্যবসার ওপর নির্ভর করে।"
বাবাই চুপ করে রইল। সে জানত, বাবার কথায় সত্যি আছে। কিন্তু এই ব্যবসার ঝুঁকি, বিস্ফোরণ, পরিশ্রম আর অনিশ্চয়তাও সে দেখেছে।
দিন যত এগোতে লাগল, হাড়ালের মেলার প্রস্তুতি তত জমে উঠল। দুর্গাপুজোর সময় থেকেই ক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। আর কালীপুজো যত এগিয়ে আসছে, ভিড় তত বাড়ছে। কলকাতা, বারুইপুর, সোনারপুর, জয়নগর, ক্যানিং, ডায়মন্ড হারবার – এমনকী দূরদূরান্তের জেলা থেকেও মানুষ আসছে বাজি কিনতে। একদিন সকালে নিতাইয়ের দোকানে এলেন এক ভদ্রলোক। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। ছোট ছেলেটি দোকানের সামনে সাজানো বাজির প্যাকেট দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
—কাকু, ওই যে রঙিন আলো জ্বলে, ওটার নাম কী?
নিতাই বলল, "ওটা রংমশাল। আর ওই যে ঘুরতে ঘুরতে আলো ছড়ায়, সেটা চড়কি।"
ছেলেটি একের পর এক নাম জানতে লাগল। তুবড়ি, ফুলঝুরি, ফানুস, রকেট, সাপবাজি, চকলেট বোম, আলু বোম, বিড়ি বোম, জেনেটার বাজি, আনারকলি, দোদোমা, লঙ্কা পটকা, সেল, স্কাই শট, আছাড় বাজি, দেশলাই বাজি, এমনকী বিভিন্ন প্রকারের মোমবাতি – কত রকমের নাম! বাবার হাত ধরে আসা ছেলেটির চোখে বিস্ময়ের শেষ নেই। বাবাই পাশ থেকে হেসে বলল, "এখানে এলে শুধু বাজি কেনা হয় না, বাজির নাম শেখারও একটা আলাদা পাঠশালা আছে!"
সবাই হেসে উঠল। মেলার অন্য প্রান্তে তখন খাবারের দোকানেও বেশ ভিড়। কোথাও গরম জিলিপি, কোথাও ঘুগনি, কোথাও ফুচকা, মশলা মুড়ি, ভেলপুরি, আচার, ডাবের জল, আবার কোথাও কড়াইয়ে তেল ফুটিয়ে ভাজা হচ্ছে আলুর চপ, বেগুনি আর পেঁয়াজি। বাজি কেনার পাশাপাশি মানুষ খাবার খাচ্ছে, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করছে, ছবি তুলছে। ছোটদের আনন্দ আর বড়দের কেনাকাটার ব্যস্ততা মিলিয়ে হাড়াল যেন এক বিশাল মিলনমেলা। তবে এই আনন্দের আড়ালে রয়েছে অনেক পরিশ্রমের গল্প। নিতাইয়ের প্রতিবেশী রহিম মোল্লা। তাঁর পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে বাজি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর স্ত্রী প্যাকেট তৈরির কাজ করেন, ছেলে দোকানে সাহায্য করে। রহিমের কথায়, এই ব্যবসা তাঁদের কাছে শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, বংশপরম্পরায় চলে আসা জীবনের পরিচয়।
একদিন বাবাই রহিম কাকুকে জিজ্ঞাসা করল, "কাকু, তোমাদের এত কষ্ট হয়, তবু এই কাজ ছাড়তে পারো না কেন?"
রহিম মুচকি হেসে বললেন, "বাবা, এই শিল্পের সঙ্গে আমাদের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে জানিস? ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে দোকানে আসতাম। আজ আমার ছেলে আসে। তবে সময়ের সঙ্গে সবকিছু বদলাতে হয়। নিরাপত্তা, নিয়মকানুন মেনে কাজ করা আর ভালো মানের পণ্য তৈরি করা খুব জরুরি।"
কথাগুলো বাবাইয়ের মনে দাগ কাটল। কালীপুজোর মাস জুড়ে হাড়ালে মানুষের ঢল নামে। চম্পাহাটি স্টেশন থেকে চিনের মোড় পর্যন্ত যেন মানুষের স্রোত। অটো, টোটো, মোটর ভ্যানের ভিড়। কেউ বাজির প্যাকেট হাতে ফিরছেন, কেউ আবার শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত। দোকানিরা এক মুহূর্তের জন্যও বসার সময় পাচ্ছেন না। নিতাইয়ের দোকানেও প্রচণ্ড ভিড়। বাবাই বাবার সঙ্গে হিসাবপত্র সামলাচ্ছে। মাঝে মাঝে ক্রেতাদের পছন্দমতো বাজি দেখিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ এক বৃদ্ধা এসে বললেন, "বাবা, আমার নাতনির জন্য একটু আলো জ্বালানোর মতো কিছু দাও। ও খুব ভয় পায় শব্দে। কিন্তু আলো দেখতে ভালোবাসে।"
নিতাই যত্ন করে তাঁকে শব্দ কম হয় এমন অনুমোদিত আলোকসজ্জার সামগ্রী দেখাল। বৃদ্ধা খুশি হয়ে কিনে নিলেন। বাবাই লক্ষ করল, এই মেলায় শুধু বিক্রিবাট্টা নয়, মানুষের পছন্দ, আনন্দ আর আবেগেরও কত রকমের প্রকাশ রয়েছে। কেউ শব্দ ভালোবাসে, কেউ আলো, কেউ আবার পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে আসে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানের ভিড় কিছুটা কমল। নিতাই দোকানের সামনে বসে চায়ের কাপ হাতে নিল। বাবাই পাশে এসে দাঁড়াল।
—বাবা, আজ একটা কথা বুঝলাম।
—কী কথা?
—তোমাদের এই ব্যবসা শুধু বাজি বিক্রির ব্যবসা নয়। এর সঙ্গে কত মানুষের জীবিকা, কত পরিবারের স্বপ্ন জড়িয়ে আছে। হাড়ালের এই মেলাটা আসলে একটা এলাকার অর্থনীতি আর সংস্কৃতিরও অংশ।
নিতাই ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল – "তাই তো। তবে শুধু ঐতিহ্য থাকলেই হবে না। মানুষের নিরাপত্তা, পরিবেশের কথা আর আইন মেনে এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নতুন প্রজন্ম যদি ভালোভাবে দায়িত্ব নেয়, তবেই এই শিল্পের ভবিষ্যৎ থাকবে।" বাবাই বাবার কথায় সম্মতি জানাল।
পরদিন কালীপুজো। চারদিকে আলোর সাজ। সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেছে। নিতাইয়ের নাতনি মুন্নি হাতে ফুলঝুরি নিয়ে বাবার কাছে এসেছে। তার চোখে আনন্দের ঝিলিক।
—দাদু, হাড়ালে এত বাজি আসে কোথা থেকে?
নিতাই হেসে বলল, "এখানকার মানুষের হাতের পরিশ্রমে। কত মানুষ কতদিন ধরে এই কাজ করে। এই হাড়াল শুধু একটা গ্রামের নাম নয়, অনেক মানুষের রুটিরুজির ঠিকানা।"
মুন্নি কিছুই বুঝল না। সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সেদিন রাতে চারদিকে আলো ঝলমল করছিল। কিন্তু নিতাইয়ের মনে হচ্ছিল, আসল আলো তো শুধু বাজির নয় – এই আলোর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের শ্রম, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার লড়াই।
চম্পাহাটির হাড়াল তাই প্রতি বছর দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজোর মরশুমে নতুন করে জেগে ওঠে। দিন নেই রাত নেই ব্যবসা চলে পুজোর কয়েকটা দিন। মানুষের খাওয়া-ঘুম পর্যন্ত উবে যায়। চিনের মোড় থেকে হাড়ালের অন্দরমহল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এক উৎসবের আবহ। দূরদূরান্তের মানুষ আসেন, কেনাকাটা করেন, খাবার খান, আনন্দ করেন। আর স্থানীয় মানুষ অপেক্ষা করেন এই কয়েকটি মাসের জন্য, কারণ তাঁদের কাছে এই মেলাই বছরের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ। রাতের আকাশে আলো ফুটে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু হাড়ালের মানুষের পরিশ্রমের আলো নিভে যায় না। সেই আলোই বাঁচিয়ে রাখে একটি জনপদের স্বপ্ন। কারণ, হাড়ালে বাজি শুধু উৎসবের উপকরণ নয় – বাজি এখানকার মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবিকার নাম।
0 Comments.