Fri 17 April 2026
Cluster Coding Blog

T3 - নববর্ষ সংখ্যায় হিমাদ্রী শেখর দাস

maro news
T3 - নববর্ষ সংখ্যায় হিমাদ্রী শেখর দাস

মনের জানালা

চৈত্রের শেষ বিকেল। আকাশে মেঘের হালকা আস্তরণ, সূর্য তীব্র হয়ে যেন ক্লান্ত হয়ে বিদায় নিচ্ছে। অরিন্দম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল—হাতে এক কাপ চা, আর মনে কত হিসেব,নিকেশ। বছরটা শেষ হতে চলেছে, কিন্তু তার জীবনের অনেক অঙ্কই যেন এখনও অসম্পূর্ণ।

গত বছরের শুরুতে সে অনেক স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করেছিল। নতুন চাকরি, নিজের লেখালিখির একটা জায়গা তৈরি করা, আর পরিবারের জন্য কিছু করতে পারা—সব মিলিয়ে একগুচ্ছ প্রত্যাশা। কিন্তু বছর শেষে দাঁড়িয়ে সে বুঝল, প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মাঝে তফাৎ খুব বেশি।

চাকরিটা সে পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ছ’মাসের মধ্যেই কোম্পানির আর্থিক সমস্যার জন্য সেটি চলে যায়। প্রথমে সে ভেবেছিল, “এই তো, নতুন কিছু খুঁজে নেব।” কিন্তু দিন গড়িয়ে মাস হয়ে গেল, তবু নতুন কিছু ঠিকমতো জোটেনি। বন্ধুরা কেউ বিদেশে, কেউ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে ছবিগুলো দেখতে দেখতে নিজের জীবনটা হতাশ মনে হতো।

অরিন্দম মাঝে মাঝে নিজের ডায়েরিটা খুলে বসত। বছরের প্রথম পাতায় সে লিখেছিল—

“এই বছরটা আমার হবে।”

এখন সেই লাইনটা পড়ে তার মনে হতো, যেন অন্য কারও লেখা।

তবু সবকিছুই কি ব্যর্থতা? সে নিজেকে প্রশ্ন করত।

মাঝে মাঝে কিছু ছোট ছোট মুহূর্ত মনে পড়ে যেত। তার লেখা একটা ছোট গল্প একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু সেই দিনটা তার কাছে ছিল আলাদা। মা ফোন করে বলেছিল, “তোর লেখা পড়ে খুব ভালো লাগল।” সেই কথায় গর্বের একটা সুর ছিল, যা অরিন্দমকে ভিতর থেকে আনন্দ দিয়েছিল।

 একবার সে অনেকদিন পর নিজের বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করেছিল, পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করেছিল । সেই দিনটা তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, জীবন শুধু সাফল্যের মাপকাঠিতে মাপা যায় না।

কিন্তু তবুও, বছরের শেষে এসে ব্যর্থতার ভারটাই যেন বেশি অনুভূত হচ্ছিল।

পাড়ায় পাড়ায় আলো, গান, হাসির শব্দ। অরিন্দমের ঘরটায় কিন্তু এক অদ্ভুত নীরবতা। সে ল্যাপটপ খুলে বসেছিল—কিছু কাজের খোঁজ করছিল, কিন্তু মনটা ঠিক সেখানে ছিল না।

হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা পুরনো ফোল্ডার বাংলা নববর্ষ,১৪৩২, সে খুলল। তাতে লেখা ছিল— আমার শপথ-

 প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা লেখা । নতুন কিছু শেখা। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা

অরিন্দম নিজেই হেসে ফেলল। “নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা”—এই লাইনটা পড়ে তার মনে হলো, সে হয়তো এই একটাই কাজ ঠিকমতো করতে পারেনি।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। তার কলেজের শিক্ষক, সেন স্যারের মেসেজ—

“নতুন বছরের জন্য কী ভাবছিস? পুরোনো ব্যর্থতা নিয়ে বসে থাকিস না। নতুন করে শুরু কর।”

অরিন্দম অবাক হলো। অনেকদিন পর স্যারের সঙ্গে কথা হয়নি। সে রিপ্লাই দিল—

“স্যার, সবকিছুই যেন গোলমাল হয়ে গেছে। কিছুই ঠিকমতো করতে পারিনি।”

স্যার লিখলেন—

“সবকিছু ঠিকমতো হয়নি মানেই সবকিছু ভুল হয়নি। ব্যর্থতা মানে শেষ নয়, সেটা শুধু একটা অভিজ্ঞতা।”

এই কথাগুলো অরিন্দমকে থমকে দিল। সে জানালার দিকে তাকাল—বাইরে আতশবাজির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ।

 মনে পড়ল, ছোটবেলার বাবার কথা, --“নতুন বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়, এটা একটা সুযোগ, নিজেকে নতুন করে গড়ার।”

অরিন্দম হঠাৎ নিজের ডায়েরিটা আবার খুলল। এবার নতুন একটা পাতা।

সে লিখতে শুরু করল—"১৪৩৩'

আমি জানি, আমি সবকিছু পাব না।

আমি জানি, আমি আবারও ব্যর্থ হব।

কিন্তু আমি আবার চেষ্টা করব।”

লেখাটা শেষ করে সে থামল। মনে হলো, এতদিন সে শুধু ফলাফল নিয়ে ভাবছিল—সাফল্য বা ব্যর্থতা। কিন্তু চেষ্টা করার প্রক্রিয়াটাকেই সে ভুলে গিয়েছিল।

নতুন বছর মানে কি সত্যিই সবকিছু বদলে যায়? না, হয়তো না। কিন্তু মানুষ যদি নিজেকে একটু বদলাতে পারে, তাহলেই তো অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়া যায়।

রাত বারোটা বাজল। চারদিকে বাজির আওয়াজ " শুভ নববর্ষ' অরিন্দম জানালাটা খুলে দিল। ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগল, কিন্তু তার মনে হলো, এই হাওয়ার মধ্যে একটা নতুন গন্ধ আছে—সম্ভাবনার গন্ধ।

সে নিজের মনে বলল, “এই বছরটা হয়তো আমার হবে না। কিন্তু আমি এই বছরটাকে আমার মতো করে গড়ে নেব।”

পরের দিন সকালে অরিন্দম তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। অনেকদিন পর সে নিজের জন্য একটা রুটিন বানাল। প্রথম কাজ—এক ঘণ্টা লেখা। সে ল্যাপটপ খুলে বসে গেল।

প্রথমে কিছুই আসছিল না। তারপর ধীরে ধীরে শব্দগুলো আসতে শুরু করল। সে লিখতে লাগল,, নিজের আশা,নিজের ব্যর্থতা নিজের দুর্বলতা, সবকিছু।

লিখতে লিখতে সে বুঝতে পারল, তার ভেতরে এতদিন ধরে জমে থাকা কথাগুলোই তাকে আটকে রেখেছিল।

দিন কয়েকের মধ্যে সে কয়েকটা জায়গায় কাজের জন্য আবেদন করল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসেনি, কিন্তু এবার সে ভেঙে পড়ল না। সে জানত, প্রত্যাখ্যানও এই পথের অংশ।

একদিন বিকেলে সে আবার সেই পত্রিকার অফিসে গেল, যেখানে তার গল্পটা প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পাদককে সে নতুন কিছু লেখা দেখাল। সম্পাদক বললেন, “লেখায় একটা সততা আছে। চালিয়ে যাও।”

এই কথাটা তার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি ছিল।

মাস দুয়েক কেটে গেল। অরিন্দম এখনও বড় কোনো সাফল্য পায়নি, কিন্তু সে থেমে থাকেনি। প্রতিদিন একটু একটু করে এগোচ্ছিল।

একদিন হঠাৎ তার মেইলে একটা অফার এল,একটা ছোট প্রকাশনা সংস্থায় কনটেন্ট রাইটারের কাজ। খুব বড় কিছু নয়, বেতনও খুব বেশি নয়, কিন্তু অরিন্দমের মুখে হাসি ফুটল।

সে জানত, এটা হয়তো তার স্বপ্নের শেষ গন্তব্য নয়, কিন্তু এটা একটা শুরু।

সেদিন রাতে সে আবার ডায়েরি খুলল। লিখল--

“সাফল্য মানে শুধু বড় কিছু পাওয়া নয়। সাফল্য মানে নিজের হাল না ছাড়া।

ব্যর্থতা মানে শুধু হার নয়, ব্যর্থতা মানে শেখা।”

জানালার বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। অরিন্দম মনে মনে ভাবল, “নতুন বছর আসলে নতুন করে কিছু দেয় না, আমরা নিজেরাই নতুন করে নিতে শিখি।”

তার চোখে তখন আর আগের সেই হতাশা নেই। এখন একরাশ শান্তি আর এক চিলতে আত্মবিশ্বাস।

কারণ সে বুঝে গেছে—

প্রত্যাশা থাকবে, ব্যর্থতা আসবে, কিন্তু সেই চাওয়া- পাওয়া আর হারানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন করে শুরু করার শক্তি। সেই শক্তিটাই হয়তো আসল সাফল্য।

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register