- 6
- 0
নীল মলাটের উপাখ্যান
বিকেলটা ঠিক যেন বিষাদের রঙে তুলি ভেজানো কোনো এক ক্যানভাস। আকাশটা মেঘলা নয়, কিন্তু কেমন এক ধূসর চাদরে ঢাকা। রাস্তার ধারের নিম গাছটার পাতাগুলো আজ বড় বেশি স্থির। শহরের এই ব্যস্ত কোলাহলের মাঝেও সুমিতের বারান্দাটুকু এক আশ্চর্য দ্বীপের মতো শান্ত।
হাতে মাটির ভাঁড়। গরম চায়ের সেই সোঁদা গন্ধটা নাকের কাছে আসতেই সুমিতের মনে হলো, সময়টা যেন ঠিক দশ বছর পেছনে থমকে দাঁড়িয়েছে। সেই একই রকম বিষণ্ণ বিকেল, আর উল্টো দিকের চেয়ারে বসে থাকা এক জোড়া কাজল-কালো চোখ।
"চা-টা আজ একটু বেশি কড়া হয়ে গেছে, তাই না?" — অবিন্যস্ত চিন্তার ভিড়ে সুমিতের মনে হলো কেউ যেন কথাটা বলল। কিন্তু সামনে শুধু পড়ে আছে একটা খালি চেয়ার আর টেবিলের ওপর ধুলো জমা কিছু অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি।
অদিতি বলত, "প্রেম হলো গণিতের সেই অনির্ণেয় মান, যাকে শত চেষ্টা করেও কোনো সমীকরণে মেলানো যায় না।" সুমিত তখন হাসত। বিজ্ঞান আর যুক্তির মানুষ সে, অদিতির এই কাব্যিক দর্শনগুলো তার কাছে মনে হতো নিছক কল্পনা। আজ দশ বছর পর, যখন সে সাহিত্যের অলিগলিতে শব্দ খুঁজে বেড়ায়, তখন বোঝে—কিছু বিচ্ছেদ আসলে শেষ নয়, বরং এক অনন্ত অপেক্ষার সূত্রপাত।
মাটির ভাঁড় থেকে শেষ চুমুকটা দিয়ে সুমিত ডায়েরিটা খুলল। পৃষ্ঠাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, ঠিক যেমন পুরনো প্রেমিকের মনের কোণগুলো ক্রমে বিবর্ণ হয়। বিকেলের আলোটা ক্রমেই মরে আসছে। চায়ের ভারটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে সুমিত দেখল, বারান্দার কোণে রাখা কামিনী গাছটা থেকে একটা ফুল টুপ করে খসে পড়ল।
কোনো কথা হলো না, কোনো বিদায়বেলার দীর্ঘশ্বাস ঝরল না। শুধু রয়ে গেল এক চিলতে বিষণ্ণতা আর চায়ের ভাঁড়ে লেগে থাকা এক টুকরো উষ্ণতা। সুমিত ডায়েরির পাতায় লিখল—
"কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকাই ভালো, কারণ সমাপ্তি মানেই তো সবটুকুর ইতি। আর আমাদের এই প্রেম না হয় শব্দহীন মহাকাব্য হয়েই থেকে যাক।"
রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টটা জ্বলে উঠল। বিষণ্ণ বিকেলটা এখন গাঢ় সন্ধ্যায় রূপ নিয়েছে। চায়ের ভাঁড়টা এখন শীতল, কিন্তু হৃদয়ের গহীনে এক অদ্ভুত দহন রয়ে গেল। এটাই কি তবে কথা সাহিত্যের সেই চিরন্তন আর্তি, যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তিই বেশি সুন্দর?
0 Comments.