- 16
- 0
শিক্ষক দিবস... আমরা যারা কলম নিয়ে টুকটাক লিখি। যারা লিখতে পড়তে ভালোবাসি... সকলের অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করার পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী সেই শিক্ষককূলকে আমাদের প্রতিদিনের প্রণাম জানাই। তারা না থাকলে আমাদের এ জীবন বৃথা বলেই মনে করি। জীবনে এগিয়ে চলার কারিগর হিসাবে তারা সর্বপ্রথম ভূমিকা পালন করছেন। সেই সকল মানুষদের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে আজকের এই সম্পাদকীয় নিবেদন করলাম একটি গল্পের মাধ্যমে...
আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক
রাজকুমার ঘোষ
আমার জীবনে আমার গৃহশিক্ষক প্রশান্ত মাস্টার মশাইয়ের অবদান অনেকখানি। এমন এক সময় গেছে যে সময় আমি অবসাদে ভুগছিলাম। অঙ্কের প্রতি আমার ভীতি ছিল। এক মাস্টার মশাইয়ের জন্য সেই ভীতি হয়েছিল। মূলত তারই জন্য আমি অঙ্কর মত বিষয়কে মুখস্থ করতাম। ক্লাস এইটে ভীষণ খারাপ রেজাল্ট করি। নবম শ্রেণীতে প্রশান্ত মাস্টারমশাই আমার জীবনে ধুমকেতুর মত আসেন। তিনি আসাতে অঙ্কের প্রতি আমার ভালোবাসা কেমন যেন বেড়ে গেলো। সেই ভালবাসা এখনও অক্ষত আছে। এখনও আমি আমার ছাত্রদের অঙ্ক করাতে ভালোবাসি। তবে শিক্ষক দিবসের দিনে এই গদ্যরচনা লিখলে ভালো হত। আমার পরম শ্রদ্ধেয় প্রশান্ত মাস্টারমশাইয়ের কথা কোনো একসময় অবশ্যই লিখব। এবারে আমি আর একজনের কথা বলতে চাই যিনি ছাড়া আমার এ জীবন অসম্পূর্ণ। তবে তার আগে আমি গল্পের আকারে কিছু জানাতে চাই।
একটি মেয়ে ক্লাস এইট পাশ করতেই তার বাবা-মা আত্মীয়স্বজনরা তার জন্য সম্বন্ধ দেখতে শুরু করে দেন। মেয়েটি খুবই ছোট। খেলাধুলার বয়স। সংসারের বাঁধাধরা নিয়ম নিয়ে কতটুকুই বা আর ধ্যানধারণা হয়েছে! সেই বুদ্ধি তার মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এদিকে কোনো এক আত্মীয় এক সরকারী চাকরি করা যুবকের সন্ধান পান এবং মেয়েটির জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসেন। ধুমধাম করে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। মেয়েটির শ্বশুরবাড়ির ফ্যামিলি বেশ বড়। বাড়ির বড় বৌ হিসাবে সেই পরিবারে আগমণ। পরিবারে আছে শ্বশুর-শাশুড়ী, তিন ননদ এবং দুই দেওর। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিবারে এসে মেয়েটি দিশেহারা। সংসারের হেন কাজ নেই যে মেয়েটিকে করতে হতো না। সে সাংসারিক কাজে সেভাবে পটু ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই সেই পরিবারে সকলের গঞ্জনা তাকে শুনতো হতো। শাশুড়ী থেকে ননদরা তাকে প্রায়ই কথা শোনাত 'বাবা মা কি কিছুই শেখায়নি'। শাশুড়ীর অশ্লীল কটুকথা তাকে শুনতে হতো। কেটে গেলো দেড় বছর। মেয়েটি সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়লো। আড়াই বছর শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটির কোল আলো করে এলো একটি ছেলে। ছোট্ট ছেলেটি আস্তে আস্তে এই সংসারে বড় হতে থাকলো। দেখতে থাকলো মায়ের প্রতি নানা গঞ্জনা ও অত্যাচার। ছোট্ট ছেলেটি যখন চার বছর বয়স তাকে নিয়ে তার মা বই নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসতো। আস্তে আস্তে পরম মমতায় অক্ষরজ্ঞান দিতে থাকলো। ছোট্ট ছেলেটি সেই অক্ষরজ্ঞানের সাথে প্রথম জ্ঞানের আলো হিসাবে নিজেকে বিকশিত করতে লাগলো। কিন্তু সংসারের কাজকর্মে ব্যাঘাত হয়। শাশুড়ী মেয়েটিকে নানা অকথা-কুকথা শোনাতে থাকে। মেয়েটির সহ্যশক্তির সীমা অতিক্রম করলো একদিন। তার নিজের ছেলের পড়াশোনাতে এত আপত্তির কারণে শাশুড়ীকে সেও দু'চার কথা শুনিয়ে দিলো। ভয়ংকরী তেজী শ্বাশুড়ী তার বৌমার আচরণ সহ্য করতে পারলো না। মেয়েটি তখন তার ছেলেটিকে বর্ণপরিচয় বই পড়াচ্ছিলো। শাশুড়ী সেই সময় একটা রুটি করার বেলনা নিয়ে মেয়েটির মাথায় সজোরে আঘাত করলো। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরলো এবং সাথে সাথে বর্ণপরিচয় বইটা রক্তে রাঙা হয়ে গেলো। ছোট্ট ছেলেটি সেই দৃশ্য দেখে বুঝতে পারলো না, কি হল তার মায়ের সাথে? মায়ের আর্তনাদে সে ভয় পেয়ে গেলো। সে কান্নাকাটি করতে লাগলো। তারপর প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ছেলেটি সেই বেলনাটা নিয়ে তার ঠাম্মাকে মারতে উদ্যত হলো......
এই পর্যন্ত গল্পটি থাক। এখানে সেই ছোট্ট ছেলেটি হলো এই অধম। আমার প্রথম অক্ষর বা বর্ণপরিচয়ের জন্য আমার মা-এর বলিদান আজও মনে রেখেছি। আমি মনে করি আজ যা কিছু আমার শিক্ষা সবই সম্ভব হয়েছে মা'র জন্য। সেই প্রতিকুল পরিবেশে আমার মা আমাকে যত্ন সহকারে সেই বর্ণপরিচয় না দিলে আজ 'আমি' হয়ে উঠতে কখনোই পারতাম না। আজ আমি স্টুডেন্টদের কমপিউটার শেখাই, টিউশন করি, একটু আধটু সাহিত্য চর্চা করি সবই আমার মা-এর দান। আমি তা ভুলবো কি করে।।।
এই লেখা শুধু শিক্ষক দিবসের না... প্রকৃত এক নারীর জীবন সংগ্রামের দলিল। তিনি জীবনের সর্বোচ্চ প্রতিকূলতাকে মাথায় নিয়েও তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সর্বোচ্চ লড়াই করে গেছেন। তার সন্তান আগামীদিনে যাতে মানুষের মত মানুষ হতে পারে, সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকে। নারীত্বের জয় এখানেই। আমাদের সমাজ এমন নারীদের জীবন সংগ্রামেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক। বছরের প্রতিটি দিনে আমি আমার মাকে প্রণাম জানাই। আমি যতটুকু জীবনে অর্জন করতে পেরেছি তাঁর অবদান অনস্বীকার্য্য।
0 Comments.