- 12
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
বিট্টুর কথা কি মেনে চলবে সুলেখার শ্বশুরমশাই? পড়ুন পরের ২২তম পর্বে…
সুলেখার শ্বশুর বিট্টুর কথায় চমকে গেল। আসলে ঘোতনকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। ভেবেছিল ঘোতনকে বিপাকে ফেলবে। সেটা আর সম্ভব হল না। বিট্টুর উপস্থিত বুদ্ধিতে বুড়ো থ। বিট্টুর দিকে বিদ্রুপ সহকারে খানিকক্ষণ তাকিয়ে চুপ করে গেল। সুলেখার শ্বশুর ভীষণ ধূর্ত ও ধান্দাবাজ। সে ঘোতনকে ব্যতিব্যস্ত করার উদ্দেশ্যেই মিথ্যে কথা বলেছে। টিভিতে বিট্টুর নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত কোনও খবর টেলিকাস্ট হয়নি তো ঘোতনের কথা কোত্থেকে আসবে! বুড়োর উদ্দেশ্য বিশ বাঁও জলে, সে নিজের ঘরে চলে গেল। সুলেখা বিট্টুকে আদর করে বলল,
“তুই খুব বুদ্ধিমান ছেলে। আমাদের কথা অনেক ভেবেছিস। আজ তোর জন্য চিকেন রাইস বানাব। তুই চিকেন খেতে ভালোবাসিস তো বিট্টু?”
বিট্টু তার ঘোতনকাকার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দিল। রাতে আনন্দের সাথে চিকেন রাইস খেয়ে ঘোতনকাকাকে জড়িয়ে ধরে বিট্টু শুয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে বলল,
“ঘোতনকাকা, এই বাড়ির দাদুটা খুব চালাক”
“ঠিক বলেছিস বিট্টুবাবা। আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। আমরা এখানে কিছু দিন থেকেই পালিয়ে যাব, বুঝলি”
পরের দিন সকালে ঘোতন তার গ্রামের সেই বন্ধুকে আবার ফোন করল,
“আরে পল্টু, তুই পুলিশকে আমার নামে লাগিয়েছিস, তাইতো?”
“সত্যি বলছি, আমি কিছু বলিনি”
“তাহলে একটা খবর দে। বিট্টুর নিরুদ্দেশের খবর কি সব চ্যানেলে দেখাচ্ছে? সাথে কিডন্যাপার হিসাবে আমার নাম দেখাচ্ছে কি?”
“এইসব ঢপের কেত্তন তোকে কে বলল? এতো কিছু হয়নি। শুধু পুলিশের থানাগুলোয় বিট্টুর নাম ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের এলাকার বড়বাবু শুধু জানে, বিট্টু তোর সাথে পালিয়েছে। কোথায় পালিয়েছে সে খবর জানেনা। তবে তোর নাম সব থানায় জানিয়েছে কি না, সে কথা বলতে পারছি না”
ঘোতন ফোনটা রেখে অনেকটা নিশ্চিন্ত হল। এবার সুলেখার বাড়িতে ফিরে সে চুপ করে আছে। বিট্টুর সাথে নানা মজার কথায় মেতে আছে। ঘোতন কথায় কথায় বিট্টুকে জিজ্ঞাসা করল,
“আচ্ছা বিট্টু, তুই কদিন আগে ঘুমের ঘোরে জাহাজে করে বেশ কিছু জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছিলিস? তুই অনেকগুলো শক্ত নাম উচ্চারণ করছিলিস। কি যেন নামগুলো?”
“মায়ানমার, রেঙ্গুন, জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং… এই নামগুলো বলছিলাম”
“হ্যাঁ। এই নাম গুলোই। কি এগুলো?”
“এ বাবা, এই নামগুলো জানো না?”
ওদের কথার মাঝে সুলেখার শ্বশুর কোত্থেকে চলে এল। ফোড়ন কেটে বলল,
“ঘোতন একটা জেল খাটা কয়েদি। জোচ্চর, চিটিংবাজ, খুনী। একটা ছোটলোকের বাচ্ছা। ও কি করে জানবে?”
এই কথা শুনে ঘোতন ভয়ানক রেগে গেল। বিট্টুকে বলল,
“বজ্জাত বুড়োটার কথা শুনলি তো বিট্টুসোনা। এমন ভাবে বলছে, যেন নিজে একটা শিয়াল পণ্ডিত। বুড়ো, এই নামগুলো কি তোর জানা আছে? শুধু ফাঁকা আওয়াজ। বিট্টুসোনা, বুড়োকে প্রশ্ন করত”
বিট্টু বেশ মজা পেল।
“ও দাদু, তুমি মায়নমারের নাম শুনেছ?” – বিট্টু হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল।
“আমি এসব জানিনা। তুই এর পাল্লায় পড়ে গোল্লায় গিয়েছিস?”
“আচ্ছা দাদু, হংকং, সিঙ্গাপুর এগুলোই বা কি?”
“চুপ কর। আমাকে বেশী জ্বালিয়ো না। আমি এক্ষুণি পুলিশকে কল করে সব জানিয়ে দেব”
“দাদু হেরে গিয়ে উল্টোপাল্টা বকছে। তুমি পুলিশকে বলে দাও। আমি তোমার নাম করে বলব, এই বুড়োটা আমাকে তার বাড়িতে জোর করে আটকে রেখেছে” – একথা বলেই বিট্টু হাসতে লাগল। ঘোতন খুব মজা পেয়ে গেল। বুড়োর মুখের অবস্থা দেখে সশব্দে হাসতে লাগল। সুলেখা হাসির কলরবে সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল,
“কি ব্যাপার? বিট্টুসোনাকে সাথে নিয়ে সবার এত হাসি, নিশ্চয়ই মজার কথা হচ্ছে?”
ঘোতন বলল,
“না রে বোন। বুড়োর থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছে বিট্টু। বুড়োটা বেশী লফর ঝফর করতে এসেছিল।” – সুলেখার শ্বশুর তার ঘরে পালিয়ে গেল। সুলেখা রাগ করে বলল,
“বয়স্ক মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলছিস, দাদা?”
“ঠিকই আছে। আমার পেছনে পড়ে ছিল বুড়োটা, আর আসবে না। যাই বল, তোর এই বিটকেল শ্বশুরটা একদম ফালতু লোক আছে। ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের সাথে ঝগড়া করতে এসেছিল”
“বয়স হয়ে গেছে। সেইজন্যই এমন করছে”
“দেখ বোন, একটা কথা বলি, যে বদমাশ, সে সব বয়সেই হয়”
সুলেখা কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।
বিট্টুকে জড়িয়ে ধরে ঘোতন বলল, “বিট্টু এবার বল। মাঝে রসভঙ্গ করতে মৌমাছি, বোলতা এসেছিল। আমরা ভীমরুল হয়ে হুল দিয়ে আক্রমণ করেছি। বুড়ো কেটে পড়েছে। আমরা ঘরে যাই। ঘরের মধ্যে গল্প করব”
বিট্টুকে সাথে নিয়ে ঘোতন ঘরে গেল,
“হ্যাঁ, বল বিট্টু। ওই নামগুলো কি?”
“আমি তোমাকে আমার হরিদাদুর কথা বলেছিলাম। আমাকে খুব ভালোবাসে। মা চলে যাওয়ার পর হরিদাদু আমার কাছে অনেকদিন ছিল। দাদু জাহাজে চাকরি করত। অনেক দেশ ঘুরেছে। আমি যে নামগুলো বলছিলাম, প্রত্যেকটি দেশের নাম। দাদু জাহাজে করে ঐ সব দেশে গিয়েছিল। আমাকে অনেক কাহিনি শুনিয়েছে। একবার নয় বারবার শুনিয়েছে”
“তুই ঘুমের ঘোরেই বকতিস। তবে কিছু শব্দ শুনতে পেতাম”
“হরিদাদু নিজের কাহিনি আমাকে এতবার শুনিয়েছে। গল্পগুলো চোখের সামনে যেন দেখতে পাই”
“আমাকেও গল্প শোনা তবে”
“তুমি শুনবে ঘোতনকাকা?”
“হ্যাঁ, আমি শুনব তো”
“ঠিক আছে তোমাকে আমি জাপান সম্বন্ধে বলব”
“জাপান?”
“হ্যাঁ গো। জাপান একটা দেশের নাম। যেমন আমাদের দেশের নাম ভারতবর্ষ”
“বাহ, তুই এই বয়সে কত কি জানিস? আমি তোর মত লেখাপড়া শিখিনি। তাই কিছুই জানিনা”
“ঠিক আছে এবার তুমি জাপান সম্বন্ধে জেনে নাও”
বিট্টু বলতে শুরু করল…
জাপান এশিয়ার সব চেয়ে উন্নত দেশ। পৃথিবীর যে কোন দেশের সঙ্গে যে কোন প্রতিযোগীতায় টেক্কা দিতে পারে এই জাপান। এই দেশে সকলেই শিক্ষিত। ছবির মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেশ। জাপানকে বলা হয় পৃথিবীর স্বপ্নপুরী। আমেরিকা জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পরমানু বোমা ফেলার পরেও জাপান সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কিভাবে উন্নতি করতে পারে। সঠিক শাসন ব্যবস্থা এবং কেবলমাত্র পরিশ্রম ও সততার দ্বারা একটা দেশ উন্নতির শিখরে চড়তে পারে। হরিদাদুর জাহাজ প্রথমেই জাপানের "কোবে" শহরে প্রবেশ করে। এখানে পৃথিবীর বৃহত্তম ষ্টীম প্ল্যান্ট। বন্দর সংলগ্ন পথ সোজা চলে গেছে শপিং সেন্টারের দিকে। শপিং সেন্টারের পাশেই একটি পার্কে সুন্দর ভাবে রক্ষিত আছে একটি ফ্লাওয়ার ঘড়ি। উঁচু মটির ঢিপিতে গোল করে বারো-রকমের ছোট ছোট ফুলের গাছ দিয়ে সাজান ঘড়িটি । সেন্টার পয়েন্টে ঘড়ির কাটা সব সময় চলছে। অনেকদূর থেকে দেখলেও সময় বোঝা যায়। পার্কের পাশেই একটি বহুতল বিল্ডিং। ঐ বিল্ডিং-এ একটি বড় পোষ্ট-অফিস্। ঐ অট্টালিকার প্রবেশ পথের কাছেই একটি সুড়ঙ্গ পথ। সেখানে আছে শপিং সেন্টার। নীচ থেকে মাঝে মাঝে বিভিন্ন সিঁড়িতে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় উঠে আসা যায়। এ যেন মাটির তলায় একটি শহর। উপরেও একটি শহর। আবার কিছুদূর চলে গেলে সিঁড়ি বেয়ে একদিকে রেল ষ্টেশনে যাওয়া যায়। ওখান থেকে পৃথিবীর দ্রুততম রেল চলে গেছে টোকিও শহরে। মনে হয় যেন একই স্থানে তিনটি শহর, একটি মাটির নীচে অপরটি সমতলের উপর দিয়ে। আশ্চর্য্য শহর। স্টেশন থেকে হেঁটে মেন শপিং সেন্টারে যেতে গেলে দূরে অনেক ছোট পাহাড়। ওখানে কেবল্ রোপে এক পাহাড়ের উপর থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়া যায়। শহরে সর্বত্রই বিদেশীদের জন্য ট্যাক্স ফ্রি ঘড়ি, ক্যামেরা, টিভি, টেপ রেকর্ডার প্রভৃতি ইলেকট্রনিক্স-এর দোকান আছে এবং শহরের সর্বত্র কাচের ছোট ছোট ঘরে ফুড শপ আছে। জাপানীরা খুব সমুদ্রের কাছে থাকে। সেখান থেকে মাছ ধরে মেশিনে কেটে মাছগুলোকে দোকানের মধ্যে সাজিয়ে রাখে। দেখে মনে হয় যেন সন্দেশ রসগোল্লার মত পরপর সাজান আছে। হরি তার এক ইংরেজ কলিগকে নিয়ে এমনই একটি ফুড শপের মধ্যে প্রবেশ করল। ইংরেজ কলিগ টনিকে বলল,
“মাছ খাবে টনি?”
“হোয়াট?”
“টনি ডু ইউ ইট মাছ?”
“মাছ, হোয়াট ইস ইট”
হরি খুব হাসতে লাগল। বলল, “ইটস ফিস”
“ওহো ইয়েস ইয়েস। আই লাইক ফিস”
হরি মাছ ভাজার অর্ডার দিল। সাহেব মাছ খেতে গিয়ে বিপাকে পড়ল।
----------------------
সাহেবের কি হল? পড়ুন পরের ২৩ পর্বে…
0 Comments.