- 7
- 0
প্রশান্ত মহাসাগরে লুপ্ত পাহাড় আবিষ্কার
আমাদের সমুদ্র অভিযান প্রশান্ত মহাসাগরের আড়াই হাজার ফুট নিচে। একেবারে সমুদ্রতল দেশে। সমুদ্র তলদেশ কিন্তু সমান নয়। মাঝে মাঝে
বিরাট গর্ত। স্থানটি অন্ধকারময়। সেখানে আমরা তৈরি করেছি একটা গবেষণাগার। সেই গবেষণাগার সম্পূর্ণ স্টিলের তৈরি। জানালাগুলো
আশ্চর্যজনক কাচের তৈরি। সেই কারণে আমরা গবেষণাগারে বসে সমুদ্রের অসংখ্য প্রাণীদের কাণ্ডকারখানা দেখতে পেলাম। গবেষণাগারটি ভারত সরকার ও জাপান সরকারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি। আমি, এনাখ ও জাপানি বন্ধু এই সমুদ্র অভিযানে এসেছি। বলতে বাধা নেই আমরা বিখ্যাত বিজ্ঞানী রাংটুলদার প্রতিনিধি। "পকেটে গাড়ি, গাছের মতো জীবনযাপন ইত্যাদি আবিষ্কার করে - রাংটুলদা এখন ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক। আমরা সকাল হলেই সমুদ্র তলদেশে পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে পড়তাম। তারপর যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে অত্যাধুনিক ক্যামেরায় অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর ছবি তুলে গবেষণাগারে ফিরে আসতাম। আমরা দুই তিন দিনের মধ্যে বুঝতে পারলাম যে সমুদ্রের তলভাগকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উপরতলার সূর্য আলোকিত অঞ্চল। মাঝারীতলা গোধূলি অঞ্চল। একেবারে নিচের তলায় ঘন অন্ধকার অঞ্চল।
উপরতলায় ভাসমান উদ্ভিদ এবং অসংখ্য প্রাণের আবির্ভাব। এখানকার সব প্রাণী নিরামিষাসি। তিমি এই অঞ্চলের বাসিন্দা। সমুদ্রের যত নিচের দিকে যাচ্ছি ততই ঠান্ডা। অথচ আমরা জানি মাটির যত নিচে যাওয়া যায় ততই গরম বেড়ে যায়। ২ হাজার মাইল মাটির নিচে তো আগুনের
রাজত্ব। সমুদ্রের বেলায় ঠিক এর উল্টো। সমুদ্রের তলদেশ অন্ধকার অঞ্চলটির উত্তাপ শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু সমুদ্রের জল যেহেতু লবণাক্ত। সেই কারণে সমুদ্রের জল জমে বরফ হয়নি। একেবারে সমুদ্রের নিচে গবেষণাগারটিতে বসে কাজকর্ম করি। মনে হয় না আমরা সমুদ্রের তলে আছি। মনে হয় শহরের কেন্দ্রস্থলে বসে কাজকর্ম করছি।। দুদিন পর আমাদের গবেষণাগারে কম্পিউটার যে তথ্য দিল
তা এইরকম।
রাক্ষসে হাঙ্গর - হাঙ্গর বংশের সবচেয়ে মারাত্মক। গায়ের রং সাদাটে। লম্বায় ১০ মিটার। লেজটা মাছের মত। উপরের চোয়াল বড়। নিচের চোয়াল ছোট। তিমি হাঙর - আকারের রাক্ষসের চেয়ে বড়। প্রায় কুড়ি মিটার লম্বা। নিরামিশাসী। হাতুড়ি হাঙ্গর- পাঁচ ফুটের মত লম্বা। কাইমেরা - একমাত্র প্রশান্ত মহাসাগরে পাওয়া যায়। মাথার কাছে দুটো কানকো। পাখির ডানার মত দেখতে। যখন জলের মধ্যে ছোটে তখন মনে হয় - পাখি ছুটে যাচ্ছে। তরবারি লেজের মাছ- এদের বৈশিষ্ট্য হলো স্ত্রী মাছ ডিম পারবার পর পুরুষ মাছে পরিণত হয়। এবং পরে বাবাও হয়। টুনা - এরা পরিযায়ী মাছ। ক্রমাগত পূর্ব মুখে চলতে থাকে। জন্মস্থলে আর কোনদিনও ফিরে আসে না। আংলার ফিস - সমুদ্রের তলদেশে অন্ধকার রাজ্যের বাসিন্দা। এদের নাকের ডগায় একটা খরগো থেকে ঠিক যেন একটা এন্টেনা। সেই এন্টেনা তে আলো পর্যন্ত জ্বলে। ছোট কোন মাছ ওই আলো দেখতে এলেই আংলার ফিসের পেটে চলে যায়। এদের জীবন বৈশিষ্ট্য বিচিত্র। যেমন দেড় মিটার লম্বা আংলার মাছের তলপেটে আটকে রয়েছে একটা ছোট্ট আংলার মাছ। কম্পিউটার মারফত জানা গেল ছোট্ট মাছটি হচ্ছে পুরুষ । সে তার স্ত্রীর পেটের নিচে থেকে স্ত্রীর রক্ত শোষণ করছে। সারা জীবনটাই এইভাবে থাকবে। স্ত্রীর মৃত্যু হলে পুরুষটি সহমরণে যাবে। কম্পিউটার মারফত সামুদ্রিক প্রাণীর জীবন বৈশিষ্ট্য জানবার পর আমাদের কৌতূহল আরো বেড়ে গেল আমরা আবারো পর্যবেক্ষণ করতে বের হলাম। কিন্তু আমাদের জাপানি বন্ধু ওকোতাসু গেল না। অতি আশ্চর্য সব প্রাণীর ছবি ক্যামেরাবন্দি করা হলো। সমুদ্রের তলের অপরূপ দৃশ্য দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে গেছি যে সমুদ্রের তলদেশে আসবার মূল উদ্দেশ্য ভুলে গেছিলাম। টনক নড়ল জাপানি বন্ধু ওকোতাসুর কার্যকলাপে। আশ্চর্য হয়ে দেখি ওকোতাসু একটা শিলাখন্ড নিয়ে পরীক্ষা করছে। আমরাও কিছুক্ষণ পরীক্ষা করলাম। তিনজনেই আনন্দে উঠলাম। কারণ শিলাখণ্ডটি
আসল গ্রানাইট পাথর। সুতরাং আমরা গ্রানাইট পাথরের মারফত বুঝতে পারলাম যে কয়েক লক্ষ বছর আগে এখানে একটি পাহাড় ছিল। পাহাড়টি ভূ:ক্ষয় হতে হতে সমতলের মিশে গেছে। অর্থাৎ আমরা একটি ক্ষয়িষ্ণু পাহাড় আবিষ্কার করলাম। আমাদের সমুদ্র অভিযান শেষ হলো। কলকাতায় ফিরে রাংটুলদাকে শিলাখণ্ডটি দিলাম। রাংটুলদা আমাদের পিঠ চাপড়ে ধন্যবাদ দিয়ে, শিলাখণ্ডটি তার গবেষণাগারে রেখে দিলেন।
0 Comments.