Thu 17 September 2026
Cluster Coding Blog

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের আফসার আহমেদের প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

maro news
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের আফসার আহমেদের প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

আফসার আমেদের ছোটগল্পের সামান্য রূপ

বাগনানে চাকরি করতে আসার বছর চারেক বাদে গল্পকার আফসার আমেদের সঙ্গে আমার আলাপ হয় । তিনি হয়ে যান আমার বন্ধু এবং প্রতিবেশী । আগেই জেনেছিলাম তিনি আমার বিদ্যালয়
বাইনান বামনদাসের ছাত্র আর কড়িয়া অঞ্চলে এক দরিদ্র কিন্তু অভিজাত পরিবারে তার জন্ম । ধীরে ধীরে বাংলা একাডেমির তার
ঘরটিতে আমার যাতায়াত শুরু হয় । তারপর তার বাড়িতেও । তার ছেলে ও মেয়ের ইংরেজি শিক্ষার
ভার আমার উপর বর্তায় । আর আমার সকালের হাঁটার বন্ধু হয়ে যান আফসারদার বাবা । আফসারদার সাহিত্য চর্চার পিছনে
বাগনানের ছোট ছোট সাহিত্য আড্ডা প্রথম দিকে তাকে অসম্ভব
সাহায্য করেছে । তার প্রথম গল্প মনের মানুষ  প্রকাশিত হয় বাগনানের ময়দান পত্রিকায় ১৯৭৫ সালে ।
বাংলা ছোটগল্পে আফসার আমেদ এক প্রতিষ্ঠিত নাম । তার ভাবনা এবং ভাষার বিশিষ্টতা তাকে একটা
আলাদা সিগনেচার দিয়েছে যা তার একান্ত নিজস্ব শৈলী । গল্পে তার বড়
সম্পদ তার চরিত্রগুলো আর তাদের শরীরে ছড়িয়ে থাকা গল্প ।
আফসার আমেদের 'খরা'  গল্পের শুরুতেই দেখান বাস্তবতার বিপরীতে তার যাত্রা যেন আধিভৌতিকতার পথে । কলেনপুরের মতো একটি ছোটো গ্রাম এবং তার তিন চারটি ঘর -গেরস্থির প্রেক্ষিতে লেখক তার কাহিনীটিকে সাজিয়েছেন ।
আকাশে জল নেই ,ক্ষেতে কাজ নেই- মৃত্যুর জন্যই প্রেমা আর তরুবালার প্রস্তুতি । পেটের দায়ে প্রেমা পূর্বপুরুষের তেঁতুলগাছটা বিক্রি করে দেয় নন্দ সাঁইকে । তারপর প্রেমা , রতন , রাখহরি মিলে সেই গাছ কাটে । গাছের নীচের কালির থান উপড়ে আসে
গাছের সঙ্গে । শুরু হয় বিপদ । রতন মারা যায় । তরুবালার ছেলে মনা মৃত্যুর দিন গোনে । উলি পিসি উঠোনে মুখ থুবড়ে মারা যায় । রাখহরি রাতদিন গাছপালায় বন
বাদাড়ে শ্মশানে ঘুরে বেড়ায় । কাহিনী ব্যপ্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারগুলিকেও আরো বেশি লালন করে যান গল্পকার । অমাবস্যার রাতে রাখহরি শ্মশানকালীর পুজো করে । দুদিন আগে কলেরায় মারা গিয়েছিল ভোলার কচি মেয়েটা । সেই গলা
শরীরটা মাটির নিচের থেকে তুলে আনে প্রেমা আর রাখহরি । রাখহরি
মন্ত্র পড়ে ।আকাশে মেঘ জমে ভোলার মেয়েকে আবার মাটি চাপা
দেয় দু জনে ।
আফসার সম্পর্কে বলতে গিয়ে অমলেন্দু চক্রবর্তী বলেছেন , " আফসার সর্বাংশে গ্রামের ছেলে । বর্ষার কাদায় শীত গ্রীষ্মের ধুলোয়
পা ডুবিয়েহাঁটা তার আজন্ম অভ্যাস ।.. অন্যদের সেখানে গিয়ে পৌঁছতে হয় , আফসার আমেদ সেখানে আজন্ম বর্ধিত হয়ে উঠেছে উদ্ভিদ বা বৃক্ষের আদলে । যে মানুষগুলি তার রচনার চরিত্র ,ব্যক্তিগত জীবনাচরণে তাদের হয়তো স্বজন
প্রতিবেশী ।"
এই অঞ্চলের শিক্ষক হওয়ায় অল্পবিস্তর আফসারদার চরিত্রগুলো
আমারও নজরে পড়ে । শিহরিত হই ।
আফসার আমেদ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ পড়ছেন তখন তো তিনি লেখক হিসেবে বিশিষ্ট সব পত্র পত্রিকার লেখক ,তার লেখালেখি সম্পর্কে
মনোযোগ তৈরি হয়েছে , তার লেখকবন্ধুদের সাথে মিশে তিনি
কলকাতার নাগরিক জীবন সম্পর্কে
ওয়াকিবহাল , যদিও তিনি গল্প ও উপন্যাস লিখছেন বাগনান ও সন্নিহিত অঞ্চলের মুসলমান মানুষজনের পারিবারিক জীবন নিয়ে ।
এবারের আলোচনা 'ডিপ টিউবলের
দাম কত ?' এখানে ধরা পড়েছে কৃষিজীবী মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কাহিনী । ' ডিপটিকলে  জমিতে সোনা ফলবে । সেই সোনার সম্ভাবনায় শাকুকে উচ্ছেদ দেবে নাকি ?' আড়াইবিঘের চাষি শাকু । এক পা সরু নসিবার স্বামী , মুক্তার , লাইলি আর খুকির
বাপ শাকু নিরাপত্তার প্ৰশ্নে আশংকিত   কিন্তু উচ্ছেদ দেওয়া কিমবা না হওয়ার ঘটনাতে কাহিনীকে ঠেলে দেন না আফসার । সারা গল্প জুড়ে তিনি শাকুর কাজকাম এবং তার ভিতরের টালমাটাল অবস্হাকে প্রকাশ করেন । এইভাবে গল্পকার পাঠককে পৌঁছে দেন কৃষি সম্পর্কের সংকটে ,সংকটের বাস্তবে এবং কল্পনায় ।
'গোনাহ ' গল্পটি একান্তই মুসলিম সমাজের গল্প থাকে না , এর শিকড় দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার সামগ্রিক বাস্তবতার ভেতর । "জয়নুদ্দিন কাজীর বাড়ি মিলাদ-মাহফিল । কলকাতা থেকে মৌলানা আসছেন ।" গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের এ দুটি বাক্যে আফসারদা গল্পের প্রেক্ষিত নির্দিষ্ট করে দেন । এই প্রেক্ষিতের সঙ্গে কাজির বাড়ির কাজের মেয়ে ষোল বছরের ফরিদার সম্পর্কটি কী - পরিপূরক , দ্বান্দ্বিক নাকি সমান্তরাল - তা স্পষ্ট করে তোলেন না আফসারদা । তিনি শুধু ফরিদাকে দেখান - তার কর্মে , কল্পনায় । রসিদ , অনুচ্চারিত কোনো ইঙ্গিতে , ফরিদার কাছে এক গেলাস জল চায় , কাজি গিন্নি সোচ্চারে ফরিদাকে বাসনমাজা সেরে বাকি কাজ সারতে বলে আর ফরিদা এসবের ভেতর কারো বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে । ফরিদা সূঁচের কাজ জানে । সে রুমালে তার কল্পিত বরের নাম লেখে - আবদুল খালেক । জয়নুদ্দিন কাজির বড়ো ছেলের নাম আবদুল মালেক । ফরিদা ভাবতে বসে খালেক আর মালেক একই । ফরিদাকে ঘটে ডাকতে যায়
মালেক  । ফেরার পথে হোঁচট খেয়ে ফরিদার গায়ে পড়ে । ফরিদার শরীরে অনুরণন ওঠে । ঘরে ফিরে ফরিদা মৌলনাকে শরবত দিতে যায় । ফিরে ঘামে ভিজতে ভিজতে আন্ডা ভাজে ,আলু ভাজে , নাস্তা বানায় । ওদিকে মাহফিলের সব তৈরি । কাহিনীর এই অংশে এসে আফসার দেখান ফরিদা এই মাহফিলের বারোয়ারি সম্পত্তি হয়ে উঠেছে । ওদিকে ছটা বালিশের মাঝে অবস্থান করে মৌলানা পাপ পুণ্যের হিসেব শোনায় । কর্ম বিধ্বস্ত ফরিদার কাছে কিছু পরে দেশলাই চাইতে আসে মালেক । এক সময় অন্ধকারে তারা মিথুন -মূর্তি হয়ে যায় ।তখনই হৈ হল্লা ভেসে আসে । বালিশে সুঁচ ছিল । মৌলানা বুকে ঢুকে গেছে । মালেক দৌড়ে ।ফরিদা নিথর দাঁড়িয়ে থাকে ।কাজি সাহেব
চিৎকার করে - ' এটা কার কাজ ? ওরা ঠিক চিনে নেবে । অন্ধকারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে ফরিদা ।
আফসারের এই গল্পে দেহ ও মন ,বাস্তবতা ও কল্পনা , পাপ ও পুণ্য - এরকম বিপরীত গোত্রের শব্দ আমদানি করেছেন । গল্পের শেষে সুঁচ দিয়ে মাহফিলের সুরকে
কেটে দিয়েছেন ।
আফসারের 'ভয় ' গল্পটি সফুকে নিয়ে ,তার শরীরকে নিয়ে । সফুর
আতঙ্কের মন এবং ভয়ের শরীর নিয়ে এই আখ্যান ।
আফসারের গল্পে দুটি স্বতন্ত্র পরিবেশ চেতনা আছে । এর একটি হল মুসলমান সমাজ কেন্দ্রিকতা , অপরটি হল মুসলমান সমাজ নিরপেক্ষতা । বাস্তবিক জীবনে তিনি কিন্তু হিন্দু মুসলিমের ভেদরেখা মানতেন না । আমার বাড়িতে বসে খেতে তার সংকোচ ছিল না । আফসার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সামন্ততান্ত্রিকতার একটি উপাদান হিসেবে দেখেন । গল্পের চরিত্ররা দেহ মন নিয়ে হাজির পাঠকের কাছে । গদ্যের এক নিজস্ব আবহ তিনি গড়ে তুলেছিলেন তার কিসসায় । উপন্যাসের মতো ছোট গল্পকার হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে । তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল ভাবতে গর্ব অনুভব করি । এ মাসে তার মৃত্যুর প্রথম বছর পূর্ণ
হল।
[caption id="attachment_1349" align="alignnone" width="300"] কবি দেবাশিস মুখোপাধ্যায় এর জন্ম কুলটিতে এবং বর্তমান তিনি হাওড়ার বাগনানে বাস করেন । তার কবি জীবন শিশুকাল থেকে । কলকাতার ইন্দ্রাণী পত্রিকায় যখন কবিতা প্রকাশ হয় তখন কবি দশম শ্রেণি 1983. এরপর প্রথম কবিতার বই 1997ক" কবিতার একখন্ড মুখ" । এরপর কর্মসূত্রে বাগনানে এবং দ্বিতীয় কবিতার বই "আজকাল পরশুর গল্প ", এরপর এখন বাংলা কবিতার কাগজ প্রকাশ করে " শূন্য কিন্তু শূন্য নয় " , পত্রলেখা থেকে " ভূমিকা প্রেমের কবিতার " , কবিতা ক্যাম্পাস থেকে " বিষন্ন রেখার পারে " এবং সুতরাং থেকে " ভেনাস বিউটি পার্লার " এবং নতুন পাতার গন্ধ " । কবি কবিতায় বাঁচতে চান।[/caption]
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register