Thu 17 September 2026
Cluster Coding Blog

রুমেলা দাসের গল্পতরু

maro news
রুমেলা দাসের গল্পতরু

মোনালিসার হাসি

ইগো!
এতদিনের সংসারে রাজত্ব করতে আসবে শিক্ষায়, রুচিতে কয়েকধাপ এগিয়ে যাওয়া আধুনিকা? বৈশালীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে! মানিয়ে নেবার সংজ্ঞাটা ফিকে হয়ে উঠেছে ক্রমশঃ। অভিজ্ঞান পাশে থাকলেও মনে হত ঠিক ভুলের দাঁড়িপাল্লাটা গুলিয়ে যাচ্ছে ওর কাছেও! বৈশালীর সঙ্গে অভিজ্ঞানের সম্পর্কের বয়স ১৩বছরের বেশি। বিয়ের আগের সাতটা বছর, আর বিয়ের পরের ছ'ছটা বছরের পার্থক্য আকাশ পাতাল। মনে পড়ে যায়, সেই প্রথম দিনের কথা। যেদিন অভিজ্ঞান, ওদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল বৈশালীকে। বাপি রাজি ছিল না। ওঁরা বলেছিলেন, "আমরা গিয়ে আগে কথা বলব অভিজ্ঞানের অভিভাবকের সঙ্গে, তারপর মেয়ে যাবে ওখানে!" কিন্তু বৈশালী কিছুটা জেদ করেই ছুটে গেছিল সত্যিকারের নিজের বাড়ি! হবু শাশুড়ি বলেছিলেন- "তুমি ঠিক কতটা লম্বা, আমার থেকে?" কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেপে নিতে শুরু করেন বৈশালীর দৈহিক উচ্চতা! এহেন ছেলেমানুষি দেখে হেসে উঠেছিল সবাই। বৈশালী উচ্চতায় শাশুড়ির কাঁধ ছাপিয়ে না গেলেও, মানসিকতায় অনেকটাই এগিয়ে ছিল। সেটা পদে পদে উপলব্ধি করেছিলেন স্বয়ং রেবা মুখার্জী। আর তাই পরিবারের ভলিউম যতটা সম্ভব, নিজের হাতে নিয়ে আসতে শুরু করেন! একের পর এক মানসিক আঘাত, বৈশালীর মনে তিক্ততার প্রাচীর তৈরি করে।
বাপের বাড়িতে দশ বছর বয়স থেকে, মা না থাকার অভাব ওকে শিখিয়েছে, প্রতিকূল যেকোনো পরিস্থিতি অনুকূল করা যেতেই পারে, মনের অপরিসীম জোর থাকলে। মনে হচ্ছিল, যদি নিজের মত করে গুছিয়ে নেওয়া যেত সংসারটা। কোথাও! কোনোখানে! এই ওঠাপড়ার গ্রাফকে আয়ত্তে আনতে অভিজ্ঞান ঠিক করে দিঘা বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা। ওরা দুজন নয়! সবাই মিলে! আর দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেখানেই। মন্দারমণি থেকে ফেরার পথেই চরম বিপদ ঘটে। স্যান্ট্রোটা ওভারটেক করতে গিয়ে ব্রেক ফেল করে, প্রচন্ড জোরে আঘাত খায় রাস্তার পাশের দেবদারু গাছের সঙ্গে। জানলার কাঁচ ভেঙ্গে সোজা একটি ডাল আড়াআড়িভাবে ঢুকে যায় অভিজ্ঞানের মায়ের মাথায়! পথেই মারা যান মিসেস রেবা মুখার্জী। অসম্ভব এক দোলাচলের মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে বৈশালী। নিজের মধ্যে কী জানি এক দংশন কুরে কুরে খায়। মন থেকে মায়ের মত মানুষটিকে না চাওয়ার কারণ-ই কি এর জন্য দায়ী? অথচ সে তো নিজের মায়ের মতোই দেখতে চেয়েছিল তাঁকে সংসার শুরুর দিন থেকে।
এখন বাড়ির একমাত্র কর্ত্রী বৈশালীই। বুঝে নিতে হচ্ছিল ১৩দিনের নিয়মকানুন। এই প্রথম রান্নাঘরে ঢুকে মনের মত করে গুছিয়ে নিচ্ছিল সে। আর ঠিক তখনই আচমকা অস্বস্তি ঘিরে ধরতে শুরু করে। ধোঁয়া ধোঁয়া আবছায় ভরে যায় চারপাশ। মানসিক বিপর্যয়ই কি দায়ী এর জন্য? নাকি অন্য কিছু...! নিজেকে একটু সামলে সামনের দিকে এগোতে গিয়েই লক্ষ করে একজন মহিলার গলার শব্দ। শব্দ শুনে আরো এগোতেই চোখে পরে মানুষদুটোকে। চেনা চেনা লাগলেও, ঝাপসা ভাবে বড়ই অস্পষ্ট দেখায় তাদের। কানে আসে রূঢ় কতগুলো কথা। বয়স্ক একজন মহিলা ক্রমাগত কঠিন কথা বলে চলেছে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সদ্য বিবাহিত যুবতীকে। বুঝিয়ে দিচ্ছে সংসার সম্পর্কে তার অপরিণামদর্শীর নানান দিক! বয়স্ক মহিলা কি যুবতীর শাশুড়ি? কে এরা? এখানে কী করছে? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না বৈশালী। কথা বলার জন্য হাতটা উঁচু করতেই...
"বৌদি ছবিটা এসে গেছে! দাদা সাজিয়ে দিতে বলল!" লক্ষ্মীর গলার আওয়াজে চমক ভাঙ্গে বৈশালীর। দ্যাখে চারকোণা ফ্রেম হাতে করে দাঁড়িয়ে কাজের মেয়ে। পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যেতে থাকে চোরা ঠান্ডা স্রোত। ঝাপসা মাখা জায়গাটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে! স্পষ্ট দ্যাখে ফটোফ্রেমের মুখটার হুবহু মিল, কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়ে থাকা সদ্য বিবাহিত যুবতীর মত। রেবা মুখার্জী? অবাক হয়ে বৈশালী দেখে, ছবির মধ্যের মুখের হাসিটা অনেকটা মোনালিসার মত। সে হাসির অর্থ কেউ বুঝবে না। বুঝবে শুধু বৈশালী।
(সমাপ্ত)
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register