Thu 17 September 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব - ৩৬)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব - ৩৬)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

একটু পর সুধাময় এলেন ছুটির টেবিলে। একটা ডাইরি রাখলেন। পেজ মার্ক দেওয়া আছে ভেতরে।  বললেন -দেখো পেজ মার্ক দিয়ে রেখেছি। আমাকে এখন বেরোতে হবে। হাটখিরা চা বাগানে যেতে হবে। তুমি ডাইরিটা  খুলে আগে ভালো করে পড়ো। তারপর গুছিয়ে লিখে আমাকে দেখাবে। আগামীকাল রোববার। খুব ভালো করে লিখো। ইতিহাস মানে অতীত জানা খুব জরুরি। নাহলে কখনওই বর্তমানকে জানতে পারবে না।
ছুটি মন লাগিয়ে পড়ছে বাবার ডাইরি। বাবা অচিনপুরে পড়াশোনা করেছেন, দেশভাগের কথাও লেখা আছে। ছুটি বসে গেল দেশভাগ নিয়ে ভাবতে। এখানে অনেককিছু লেখা, বেশ কঠিন লাগছে।  সে দেখেছে বাবা আর মা যখন কথা বলতে বসেন কিছু কিছু জায়গার নাম বলেন, কিছু মানুষের কথা বলেন, তারপর মা-র এক সম্পর্কের ভাইকে নাকি মেরে ফেলেছিল শয়তানরা। যখন মা বাবা বলেন - ঠাকুরকাকা, ঠাকুরকাকি, সুন্দরকাকা, সুন্দরকাকি, তারপর উত্তরের ঘর, দক্ষিণের ঘর, পুবের ঘর পশ্চিমের ঘর... আরও কত কী নাম, তারপর কত কী গ্রামের নাম। কৌতূহল আর কৌতূহল। পেজ মার্ক ঠিকঠাক রেখে সে ডাইরির অন্য পৃষ্ঠায় গেল। একটি পৃষ্ঠায় চোখ গেল আঁটকে। রবীন্দ্রনাথের একটি হাতে আঁকা ছবি। পেন্সিল দিয়ে আঁকা।  এটা কি বাবা এঁকেছেন? ছবির নীচে লেখা-
 " মমতাবিহীন কালস্রোতে
বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হতে
নির্বাসিতা তুমি
সুন্দরী শ্রীভূমি
  ভারতী আপন পুণ্য হাতে
বাঙালির হৃদয়ের সাথে
 বাণীমালা দিয়া
 বাঁধে তব হিয়া
 সে বাঁধনে চিরদিন তরে
তব কাছে, বাঙলার আশীর্বাদ
গাঁথা আছে।"
এরপর লেখা -
"আশ্রমে ফিরে এসেছি। পাহাড় (শিলং) থেকে নেমে আসবার পথে গৌহাটি,  শিলেট (সিলেট)  ও আগরতলা ঘুরে এলুম। বলা বাহুল্য বক্তৃতার ত্রুটি হয়নি। দিনে চারটে করে বেশ প্রমাণসই বক্তৃতা দিয়েছি এমন দুর্ঘটনাও ঘটেছে।  এমনতর রসনার অমিতাচারী আমি যে রাজি হয়েছি তার কারণ ওখানকার লোকেরা এখনও আমাকে হৃদয় দিয়ে আদর করে, এটা দেখে বিস্মিত হয়েছিলুম। বুঝলুম কলকাতা অঞ্চলের লোকের মত ওরা আমাকে এত বেশি চেনেনি। ওরা আমাকে যা-তা একটা কিছু মনে করে। তাই সু্যোগ পেয়ে খুব করে আমার মনের কথা ওদের শুনিয়ে এলুম। "
(কালিদাস নাগকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি। চিঠিপত্র -১২, সন ১৯১৯, ৩ ডিসেম্বর)
-কি রে ছুটি লেখা শুরু করেছিস?  ছোড়দির গলা শুনতে পেয়ে ছুটি তাড়াতাড়ি পেজ মার্ক তুলে নিয়ে সেই পৃষ্ঠা খুলে বসে। ভাবে, হ্যাঁ আগে ভালো করে পড়ে নিই।
আরও একটু দেখে পড়ে ভাবল, আগে বাজে খাতায় লিখে নিই। একেবারে মনের মত করে। তারপর ওটা থেকে গুছিয়ে ভালো খাতায় লিখব। হ্যাঁ, এইটাই খুব ভালো হবে। বাজে খাতা মানে তরতর করে লিখে যাওয়া। যখন যা মনে আসে সব।বাবার ডাইরি আরেকটু পড়ার সুযোগ যদি পাওয়া যেত। অনেক কিছু অজানা কথা লেখা। সবটা বুঝতে সে পারবে না কিন্তু যা কিছু বোঝা যাবে তাই বা মন্দ কি! কিন্তু বাবা আজই নিয়ে যাবেন। আগামীকাল আবার চাইলে হয়তো দেবেন কিন্তু কাল রবিবার, বাবা বাড়িতে আছেন, সুতরাং এটা পড়ার সুযোগ আর পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, ঠাকুরকাকা, ঠাকুর কাকি,  সুন্দরকাকা, সুন্দরকাকি পুবের ঘর, পশ্চিমের ঘর, উত্তরের ঘর, দক্ষিণের ঘর এদের একটা জুৎসই স্থান এই ডাইরিতে আছে। দেশভাগ ব্যাপারটা সাংঘাতিক কিছু। এটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক কী এই ছোট বুদ্ধি দিয়ে সে বুঝে কী করে!
বাজে খাতা বের করে সে লিখল -
" কে না জানে ইংরাজরা আমাদের দেশে একেবারে ঘোর রাজত্ব করেছে। আমার মনে হয়,  ওরা যেমন দুষ্টু ছিল তেমনই কিছু ভালো কাজ করেছিল। স্যার ক্লাশে বলেছেন আমরা যেখানে আছি তার তিনদিকে পাহাড় আর একদিকে পুব বাংলা। ওটা নাকি পড়েছে করিমগঞ্জ শহরে। ওই শহরে আমি কোনও দিন যাইনি। আমাদের আত্মীয় সবাই অচিনপুরে থাকে। অচিনপুরে পিসিমা, মামা, ওরা আছেন। গেলে বেশ ভালোই লাগে। মার সাথে যাই। বাবার সাথেও যাই। আচ্ছা, ইংরেজরা কেন কিছুটা ভালো ছিল বললাম,  এই চাবাগান ওরাই তো করেছে। আর উইলসন ইশকুল! সে যে কী ভালো কাজ কী করে যে বলি! কেন ভালো?  আমি খুব আনন্দ পাই তাই ভালো।
 আগে নাকি অচিনপুর একটা গ্রাম ছিল। কাছাড়ি রাজারা রাজত্ব করত। এখানে সালামতপুরের বর্মণদের "কাছাড়ি "বলে অনেকে। খাসপুরে ওদের নাকি রাজধানী ছিল। এখনও রাজবাড়ি মন্দির এগুলো আছে। মণি গিয়েছিল। আমার সাথে সেদিন অনেক গল্প করেছে। মণিরা রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকে ছিল। ভেতরে ভ্যাপ্সা সোঁদা গন্ধ। হয়েছে কি, মণি সেদিন স্বপ্ন দেখল অনেকগুলো লোক রাজার বেশ পড়া হাতে বল্লম নিয়ে মণির দিকে তাকিয়ে কীসব বলছে। মণি কিছুই বুঝতে পারছে না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ওর ঘুম ভাঙল। চারদিক নিপাট নিঝুম।  ভয়ে মণি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তারপর মণির মা মণিকে একগ্লাস গরম দুধ খাওয়াতে মণি আবার ঘুমিয়ে পড়ল। মণির মা বলেছেন কাছাড়ি রাজাদের ভূত রাজবাড়ির ভেতরে মণি ঢোকায় খুব রাগ করেছে। কে জানে ওটা রাজবাড়ি নাকি সমাধিমন্দির। জানালা নেই। জানালা ছাড়া কি মানুষ  থাকতে পারে?  আমি যদি খাসপুর যাই তাহলে ভেতরে যাবো না মোটেই। আচ্ছা অচিনপুর থেকে  অনেকদূর চলে আসলাম। ফিরে যাই অচিনপুরে।হ্যাঁ ওটা আগে গ্রাম ছিল। এই চাবাগান গুলোর জন্যেই  সে এখন শহর। অচিনপুরের পাশে তরতর করে বয়ে যাচ্ছে নদী বরবক্র। বর্ষায় নদী ফুঁসে ওঠে।  না, নদী নিয়ে আর লিখছি না। তাহলে নদী রচনা হয়ে যাবে। আচ্ছা,  এখন আসল কথায় আসি, ইতিহাস বলে কাছাড় জেলার অধিপতির হাতে আসে কিছু চা পাতার নমুনা, পরীক্ষা করে দেখা গেল ওগুলো চা গাছের পাতা। তখন বাইরে থেকে কিছু পরীক্ষক এসে পরীক্ষা করে দেখলেন এখানে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে চা গাছ রয়েছে। এরপর পরিকল্পনা মত তৈরি হলো  চাবাগান। এইসব চা বাগানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠল অচিনপুর শহর।ইংরাজ ম্যানেজাররা নিজেদের আমোদপ্রমোদের জন্যে ক্লাব তৈরি করল। তৈরি হলো  পোলো ক্লাব, টেনিস ক্লাব আরও কত কী। তারপর বরবক্রের তীরে একটি আধভাঙা পরিত্যক্ত ঘরে ইশকুল চালু করা হলো। ধীরে সেই ইশকুলটির নিজস্ব রূপ পেল। সেই ইশকুলটি এখনকার সরকারি  বালক বিদ্যালয়। " শেষের দিকটা হুবহু ডাইরি থেকে নকল করে নিল ছুটি।আগামীকাল সকাল থেকে গুছিয়ে লিখে রাতে সে বাবাকে দেখিয়ে নেবে। সোমবার ইশকুল যাবেই।
ক্রমশ 
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register