Fri 18 September 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব - ৩৬)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব - ৩৬)

পুপুর ডায়েরি

না , আগের কথায় ফিরে আসি । আমার স্কুল প্রাইভেট এবং ইংলিশ মিডিয়াম । আমার পরিবারের আর কোন বাচ্ছা এত টাকা মাইনের স্কুলে পড়েনি । এরকম ইউনিফর্ম আর ড্রেস কোড , বিশেষ ব্যাগ বই ইত্যাদি নিয়ে কেউ ইস্কুলেও যায়নি । মাকে তাঁর দিদা , শ্রীমতী সরোজিনী ঠাইন , মানে ঠাকরুন ,কিছু টাকা দিয়েছিলেন চিকিৎসা করার জন্য । অসুখ করত মায়ের ত এত পরিশ্রম করতে করতে ।ম্যালনিউট্রিশন বলেছিলেন ডাক্তার , মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছিলেন যখন কিছু দিন আগে । মা সেই টাকাটা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আমায় সাউদার্ন অ্যাভিনিউর নতুন ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়ে , ইউনিফর্ম , ব্ল্যাক সু , ব্যাগ , ওয়াটার বটল ,সব কিনে নিয়ে চলে এলেন । আমাদের চারু অ্যাভিনিউর গলির শেষ বাড়িতে ঠাকুমা থাকতেন । আর দুই কাকা । বাবার অফিস , আর এস এন কম্পানি লক আউট হয়ে গেছিল আমার জন্মের সময় । আমাদের পত্রিকা “ বিদ্যার্থী রঞ্জন” আর শাড়ির দোকান , মহারানি , নিয়ে বাবা লড়াই করছিলেন । তাই আমাদের ছয় জনের পরিবারে , একমাত্রে চাকুরে মানুষ ছিলেন মা । অফিস থেকে ফিরে পুপুর হাত ধরে মা যেতেন ঠাকুমার কাছে। বাতে সমস্ত হাড়গুলি আটকে গিয়েছিল প্রানবন্ত মানুষটির। শয্যাশায়ী অবস্থায় মেরুদণ্ডটিও বেঁকে গিয়ে ছোট্ট হয়ে গিয়েছিলেন একেবারে। তখন এতো রকম চিকিৎসা পদ্ধতি ছিলো না। আর বাতের ব্যথা আজও পিসিমা, জেঠা কাকা, এমনকি তাঁদের ছানাপানাদের পর্যন্ত কাবু করে রেখেছে পুপুদের পরিবারে। দু জন লোক রাখা থাকতো ঠাকুমার কাছে। চোখে মোটা ঘোলাটে চশমা পরা ফর্সা, কোঁচকানো চামড়া খুব রোগা, মঞ্জুর মা। আর চকচকে কালো, একটু গোলগাল মাসি। যাকে ঠাকুমা ডাকতেন, গোবিন্দের মা। মা ডাকতেন, পতির মা। আর পুপু ডাকতো “পতির মা -মাসি”। পরে শুনেছিলাম, ঠাকুমা ওর ছেলে গোবিন্দকেও চিনতেন। সেই একমাত্র জোয়ান ছেলেটি মারা গেছিলো অল্প বয়সেই। আমার মা বিয়ে হয়ে এসে তাকে দেখেননি। হারানো ছেলের কথা মনে করিয়ে দু:খ দিতে চায়না বলেই পরবর্তী সময়ে মানুষ এই মহিলাকে পতির মা বলে ডেকেছে। আমি একটু বড়ো হয়ে রহস্যভেদী হবার চেষ্টা করি। “ ওর নাম কেন পতির মা? কে পতি? বরকে তো বলে পতি। ওর বরের নাম তো সবাই বলে সন্যেসী, তবে? ” মা হেসে বললেন, ওরে আমার বাংলায় পণ্ডিত, হ্যাঁ, বরকে পতিই বলে। তাই বলে ও তো আর বরের মা হয় না। ওর বড় মেয়ে আছে। তার নাম প্রতিমা। তার মা বলে, ওকে সবাই পতির মা বলে, বুঝেছো? ” আমি এতসব মানুষের টানাপোড়েন খুঁজে বের করতে পেরে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি। আবার ভাবি, কই প্রতিমা ? ওর সঙ্গে ত একটা নাক দিয়ে ঝোল গড়ানো, ভুশুণ্ডি কালো, গায়ে সাদা খড়িওঠা, জটা পাকানো লালচে খয়েরী চুলের সিড়িঙ্গে মেয়ে খালি ঘুরে বেড়ায়। তাকে ত মাসি জোসনা বলে ডাকে। আবার ফাঁকফোকর পেলে মাকে জিগ্যেস করি। —- জোসনার কি ভালো নাম প্রতিমা? মা শুনে মিষ্টি মিষ্টি হাসেন। তারপরে রহস্য ভেদ করে দেন প্রতিমা অনেক বড়ো মেয়ে। তার তো বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেমেয়ে আছে। জ্যোৎস্না অনেক ছোটো। তাই এখনো মায়ের পিছু পিছু ঘোরে। যাই হোক, সেই পতির মা মাসিই আমার ছোটো বেলা থেকে বড়ো হয়ে মেডিক্যাল কলেজ অবধি সবখান জুড়ে। আমার ইস্কুলের দারোয়ান, টিচাররা, অন্য ক্লাসমেট, অন্য বাচ্চাদের গার্জিয়ানরা, নাচের স্কুল, রবিতীর্থের দারোয়ান দাদা, গুরুজীরা, এমনকি নালন্দা টিউটোরিয়ালের জাঁদরেল স্যার, প্রবীর বাবু পর্যন্ত, আমার পাশে অতি বিশ্বস্ত, ভীষণ যত্নশীল, বই আর জিনিসপত্র নিয়ে চলা এই অতন্দ্র প্রহরীকে চিনে গিয়েছিলেন। মা এর দেখাশোনা করতেন, টাকাপয়সা ও দিতেন যথেষ্ট, তার পরেও বলতেন, শুধু অর্থের জন্য কী আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয়। পতির মা না থাকলে আমি চাকরি করে তোমায় বড় করতাম কী করে। সত্যি, আত্মীয়ের চেয়ে কম কিছু নিকট বলে মনে করিনি কখনও এ মানুষটিকে তো।
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register