- 65
- 0
শহরতলির ইতিকথা
সংসারের আর্থিক 'ঘোঘ' বাড়লেও হাজরামশাই'র কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ছোটো ছেলের খড়-কল রমরমিয়ে চলছে, মেজোমেয়ে ও মেজোজামাই'র আনাগোনা বেড়েছে; পুলিশের চাকরিতে প্রমোশন পেয়ে,জেলার হেড-কোয়ার্টার থেকে মেজো জামাই'র থানায় পোস্টিং হয়েছে। থানা মানে তো সোনার খনি;এক একটা থানা আছে,সেখানে পোস্টিং পাবার জন্য ,পুলিশ বিভাগে নিলাম-ডাকও হয়ে থাকে বলে শোনা যায়; পুলিশ-বিভাগের লোকই এ কথা বলে থাকে,যাকগে সে সব কথা:এখানে, মেজো-জামাই'র ঘুরপথের টাকা, ঘুর পথে খেটে,সাদা ধবধবে হয়ে যায় সোজা পথে; শালা-শ্বশুরের মুখের হাসি চওড়া করে চলেছে;খড়-কলে নতুন বৈদ্যুতিক মেশিন বসেছে;সকাল আটটা থেকেই ঘরঘর শব্দ, তুলেই চলেছে ;তিনটে ভ্যান-রিক্সা, খড়-কুচোর বস্তা নিয়ে দুপুরের পর খদ্দেরদের বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসে;সকাল আটটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত চলে খড় কাটা; খড় মজুত করার জন্য দুটো গো-ডাউন হয়েছে,না,দাহ্য সামগ্রী হলেও,মেজো-জামাই'র প্রভাবে,বীমা বা অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়নি। শুকনো খড়ে জলের ছিটে দিতে হয়;মানে এক কুইন্টাল খড়কুচোতে প্রায় দশ কেজির মত জল দিতে হয়,তবু কাটার সময়,ধুলো ওড়ে;খড়কলের বাইরে, টিনের ছাওয়া বারান্দায়, হাজরামশাই চেয়ারে বসে টেবিলের পা দানিতে, পা নাচিয়ে কাগজ পড়ে,চা খায়; আর ভাবে, রাস্তার লোক ভাবছে,হাজরা, খড়ের ধুলো শুঁকছে,"বাবা,জানে না তো,আমি মধু খাচ্ছি,এক কুইন্টাল খড়ে,জল শুকিয়ে গেলেও সাত/আট কেজি জল তো থেকেই যায়,অর্থাৎ ঐ আট কেজির খড়ের দাম মুফতে,এরপর লাভ তো আছেই; এই জন্যই বলে,'বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী'।"
সেজোছেলে,আবার কন্ট্রাকটারের অধীনে কাজ করছে, নিজের হাত খরচাটুকুই হয়; গ্রীলের কাজ, তালচিরে কাজ করার সময় একটু শিখেছিলো; নিজে মেশিন কিনে তো কাজ করা সাধ্যাতীত,হাজরামশাই একটি পয়সাও সেজোছেলের জন্য খরচা করতে আগ্রহী নয়।ওর পড়াশোনা হলো না,বাবা-মা'র আঁতুড় তুলতে তুলতেই ওর স্কুলের পড়ার কাল কেটেছে;আর,ওরও সে রকম জেদ ছিল না,ফলে,স্কুলের গণ্ডী আর পেরোতে পারেনি। সবাই ভেবেছিল,হাজরামশাই,কোম্পানির দেওয়া সুযোগটা নিয়ে,ছেলেটাকে জীবনে দাঁড় করিয়ে দেবে,না,সে গুড়ে বালি,অন্য সহকর্মীরা কিন্তু নিজেদের অকাল- কুষ্মাণ্ডদের হিল্লে করে দিয়েছে।
এদিকে,'পিতাস্বর্গ, 'এ জ্ঞানটা টনটনে,রাজীবকে এ কথাটা, দম্পতি বারবার শোনায়।একদিন থাকতে না পেরে, এবার রাজীব মুখ খুললো, "তোমরা কী ভেবেছ, বল তো? আমার পড়াশোনার জন্য, স্কুলের পর একটা পয়সা দিয়েও তো কখনও সাহায্য করনি,পুজোয় সকলের জন্য কিছু না কিছু হলেও, আমার জন্য একটা পা-জামাও কখনো কেনা হয়নি,মনে আছে?" উত্তরে হৈমবতী বলে,"আমি একটা পাস না করালে, কী করতিস?" রাজীব বলে, "এর জন্য তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ,তবে ভুলো না,তোমার আতুড় তুলতে,আমার কৈশোর কেটেছে চোখের জলে; সঙ্গীরা খেলেছে,আর আমি,তোমার মেজো মেয়েকে কোলে নিয়ে মাঠের বাইরে।"
"ও রকম লেখাপড়ার মাথায় মারি ঝাঁটা,বাবা- মা'র সম্বন্ধে এমন কথা,"বলতে বলতে হৈমবতী, পাড়া মাথায় করে।
রাজীবের দিদি জন্ম-নিয়ন্ত্রন করে পরিবার সীমিত রেখেছে;মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে;এবার ছেলেদের বিয়ের সময় হয়ে গেছে।বড় ছেলের বিয়ে , মেয়ে-জামাই,নেমতন্ন করতে এসেছে। সবাই আনন্দ করে বিয়ে বাড়ি গেলেও,হাজরা-দম্পতি যায়নি। বিয়ের কয়েকদিন পরে
ছেলের বৌ নিয়ে, বড় মেয়ে, বাবা-মা'র কাছে এসেছে;নাত-বৌ,প্রণাম করে,নমস্কারি কাপড়,দিদি-শাশুড়ির হাতে তুলে দিল। হাজরা-দম্পতি,কানের দুল দিয়ে আশীর্বাদ করেছে। মাস-শাশুড়ি ও মামা শ্বশুরদের এত অল্প বয়স দেখে, বৌ'র মনের কী অনুভূতি হচ্ছে তা বুঝতে পেরে,বড় মেয়ে লজ্জায় মুখ ঢাকে। যাই হোক,বড় মেয়ে,বৌমাকে নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে গেছে।
না, বড় মেয়ের প্রয়োজন,ওদের কাছে ফুরিয়েছে;এখন এ সংসারে,মেজোজামাই-মেজোমেয়েই সব;টাকায় গোপাল নাচে, এতো সর্বজনবিদিত,এতে আর আশ্চর্য কোথায়! আর বিয়ে দিতে বাকি আছে মাত্র ছোট মেয়ে,সে তো বর পাকড়াও করেই রেখেছে, অতএব,রাজীবেরও প্রয়োজন ফুরিয়েছে; মুখাগ্নি করতে একটা ছেলেই যথেষ্ট, আর, তাছাড়া, এ বাড়ি একজনের পরিবার নিয়ে থাকারই উপযুক্ত, অতএব রাজীবকে এ বাড়ি থেকে যেতেই হবে।
গ্রামের বাড়ি বিক্রি হয়েছে;জমি বিক্রি নিয়ে নাকি ঝামেলা চলছে,এ নিয়ে কখনও হাজরা ,রাজীবের সঙ্গে কথা বলেনি।গ্রামে থাকতে,প্রায়ই বলতো, "তুই টাকা দে,তোর নামে কয়েক বিঘে জমি কিনে দিই।" রাজীব,জমি-জমার চক্করের মধ্যে আর পড়তে রাজি নয়;মেজোসহোদরার বিয়ে উপলক্ষ্যে
গণ্ডগোলের সময়,সজীবের শ্বশুরবাড়ি ও ওর কলেজের কাছে বাড়ি করার জন্য,হাজরার মতানুসারেই দশ কাঠা জমি, তিন ভাই'র
জন্য না কিনে,তিনভাইও সজীবের ছেলের নামেও ঐ জমি কেনে। রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে,সব স্থিতু হয়ে গেলে,ওখানে বাড়ি করার দরকার হয়নি; আর নাবালকের নাম জমিতে জড়িয়ে বলে, বিক্রিও করা যাচ্ছে না।তাই,জমি-জমা সম্পর্কে রাজীব নিস্পৃহ।
চলবে
0 Comments.