- 14
- 0
স্টেরয়েড ওষুধ বিষ, না অমৃত??
ওষুধের জগতে স্টেরয়েড ট্যাবলেটের কথা আমরা কমবেশী সবাই শুনেছি। আমরা না জেনে, না বুঝে অনেকেই ইচ্ছেমতো এগুলো গ্রহণ করছি। স্টেরয়েড হল এমন একটি ওষুধ যা যন্ত্রণা নির্মূল করে দ্রুত। আজকাল মানুষ না জেনে বুঝেই ম্যাজিক ফলাফল চায়। তাই এর যথেচ্ছ ব্যবহার হয়। কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহারে পরিণামে ক্ষতি ডেকে আনে। শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক অ্যালার্জি ও অন্যান্য রোগে তীব্র সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে ওষুধ হিসাবে অনন্যোপায় হয়ে স্টেরয়েড দেওয়া হয়। বিভিন্ন চর্মরোগ, আর্থ্রাইটিস, হাঁপানি ও ফুসফুসের কিছু সমস্যায়, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনির কিছু সমস্যায় নির্দিষ্ট মাত্রা ও সময় অনুযায়ী চিকিৎসকরা স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। বিশেষ কারণ ছাড়াই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই আমাদের দেশে মানুষ ব্যথা, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, শরীরের বিভিন্ন ধরণের দাগ তোলার জন্য ওষুধের দোকান থেকে বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কথামতো অনেকদিন ধরে স্টেরয়েড প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ব্যবহার করেন। স্টেরয়েড ব্যবহারে শরীরের ভেতরের অসুখের আগুনটাকে চাপা দিয়ে রাখে। আসলে অসুখ শরীরের ভেতরে বাড়তেই থাকে। কিন্তু আপাতভাবে কম অনুভূত হয়। লক্ষণগুলিও আর দেখা যায় না।রোগী আপাত খুশী হলেও পরিণতি কিন্তু ভয়ঙ্কর হতে পারে। আমাদের কিডনির ওপরে একটি অ্যাড্রিনালিন গ্ল্যাণ্ড রয়েছে। মূলতঃ সেখানেই তৈরী হয় স্টেরয়েড। এই স্টেরয়েড শরীরের নানা জায়গায় বিভিন্ন সময়ে চলতে থাকা প্রদাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরে স্টেরয়েড কম তৈরী হলে বা তা শরীরকে পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট না হলে বাইরে থেকে চিকিৎসকরা স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। অনেক সময় শরীরে দরকারমতো স্টেরয়েড তৈরী না হলে বা না থাকলে উচ্চচাপ, খিদে কমে যাওয়া, ওজন কমে যেতে পারে। সাথে আরো অসুখ দেখা দিতে পারে। কিছু অসুখে যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, সি ও পি ডি, কিছু ধরণের অ্যানিমিয়াতে দীর্ঘদিন ধরে স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। কখনো কখনো সারাজীবনও হয়ত খেতে হয়। কিন্তু সাধারণতঃ স্টেরয়েডগুলি স্বল্পমেয়াদী হয়। ফলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়। সর্বদা দীর্ঘায়িত ব্যবহারের সম্ভাব্য বিপদগুলোর ওপর নজর রাখা উচিত। স্টেরয়েড একনাগাড়ে নিলে হাড় পাতলা হয়ে অস্টিওপোরোসিস হতে পারে। সবচেয়ে খারাপ দিক হল দীর্ঘ সময় ধরে স্টেরয়েড ব্যবহৃত হলে শরীরে স্টেরয়েড উৎপাদন কমে যায়। রোগী স্টেরয়েড ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আবার হঠাৎ করে স্টেরয়েড খাওয়া বন্ধ করে দিলে শারীরিক দুর্বলতা, পেট ব্যথা, বমি, শরীরে নুনের ঘাটতি সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। রক্তচাপ কমে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। স্টেরয়েড খাবার আগে চিকিৎসককে সব খুলে বলা প্রয়োজন। মনে রাখা প্রয়োজন যেকোন অবস্থাতে স্টেরয়েড আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মানে নিরাপত্তার ফাঁক তৈরী করা। শরীরে রোগ জীবাণুর সংক্রমণ বেড়ে যায় নীরবে। স্টেরয়েডের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেগুলো দেখা দিতে পারে, ওজন বেড়ে যাওয়া, বিশেষ করে মুখ এবং ঘাড়ের পেছনে, ত্বকের সমস্যা ব্রণ, ঘা দেখা দিতে পারে। চুল পাতলা ও ঘুমের সমস্যা হয়। চোখের সমস্যা, হরমোনের সমস্যাও দেখা দেয়। স্টেরয়েড সতর্কতা অবলম্বন করে ধূমপান ছেড়ে দেওয়া, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা, নিজেকে সংক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে চলতে হবে। সর্দি-কাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা, জ্বর 100 ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আসল কথা হল কখনোই নিজে থেকে বা ওষুধের দোকানের পরামর্শে স্টেরয়েড ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনে চিকিৎসকই একমাত্র ভরসা হবেন। পরিশেষে বলা যায় স্টেরয়েড একদিকে যেমন অমৃত, আর একদিকে বিষ। সঠিক ব্যবহারে এটা অমৃত আর বেঠিক ব্যবহারে এটা হয়ে উঠতে পারে বিষ।
0 Comments.