- 7
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
বিট্টু তার স্বপ্নে হরিদাদুর সফর সঙ্গী… হরিদাদুর কাহিনি থাইল্যান্ডে একটি মেয়ের পরিবারে চলে গেল…
তারপর… দশম পর্বে…
ঘুমের রাজ্যে বিট্টু তার গভীর অনুভবে হরিকৃষ্ণ মিত্র অর্থাৎ হরিদাদুর ব্যাংক ঘুরতে যাওয়ার কাহিনিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে…
হরি ব্যাংককে যে সুন্দরী মেয়েটির বাড়িতে গিয়েছে। সেই মেয়েটির মা জানাল, তিনি তার স্বামীর সঙ্গে একবার ভারতে ভ্রমন করেছিলেন। তিনি বললেন,
"ভারতে নারীদের সম্মান খুব বেশী। পৃথিবীর কোথাও মেয়েদের এত সম্মান নেই”
হরির কথাটা শুনে খুব ভালো লাগল। সে বুকে হাত দিয়ে বলল, "মেরা ভারত মহান"
মেয়েটির মা-বাবা বিভিন্ন সুখাদ্য রান্না পরিবেশন করে হরিকে ভীষণভাবে আপ্যায়ন করেন। ওদের নিজস্ব গাড়ী, জাপানী গাড়ী আছে। মেয়েটির মা ড্রাইভ করে সমস্ত গ্রাম ঘুরে দেখিয়ে দিলেন। অবশেষে মেয়েটি হরিকে নিয়ে শহরের হোটেলে পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে এয়ার-ইন্ডিয়া অফিসে যায়। সেখানে জানতে পারে একজন বাঙ্গালী মিঃ বোস, গ্রাউন্ড ইনঞ্জিনিয়ার সপরিবারে ব্যাংককে বাস করে। টেলিফোনে যোগাযোগ করা হল। অনেকদিন পরে বাংলায় কথা বলা যাবে আশা করা গেল। বোসবাবু হরির সাথে এগারোটায় দেখা করার টাইম দিয়েও এলেন না। হরি ক্যাজুয়ালি নিল ব্যাপারটা। এমনটি হতেই পারে। বেকার রাগ করে ব্যাংককে ঘোরার ম্যুডটা নষ্ট করলে চলবে না।
ব্যাংকক্ শহর বেশ বড় শহর। খুব বড় এযারপোর্ট। শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে সবুজ ময়দান। তার পাশ দিয়ে সুন্দর রাস্তা চলে গেছে, সেখানের মার্কেটে এক সর্দারজির জামা কাপড়ের দোকান। ভারতের লোক। সে ব্যাংককেই পাকাপাকি থাকে। সর্দারের দোকানে দেখা গেল এক ভদ্রমহিলা বাংলায় কথা বলছেন তার স্বামীর সাথে। আলাপ করে জানা গেল সেই ভদ্রলোকই গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার মিঃ বোস। আলাপ করার পরও ঐ ভদ্রলোক হরির কাছে সরি পর্যন্ত বলল না। অথচ হরির সাথে জাহাজে যেতে চাইছিল। হরি পত্রপাট প্রত্যাখান করল, সে জানাল,
"ফালতু, অবিবেচক লোকেদের জাহাজে কোনও জায়গা নেই"
হরি সর্দারজীর সাথে বেশ আলাপ জমিয়ে ছিল। সর্দারজী হরিকে নিয়ে তার বাড়ী নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি হরিকে ব্যাংকক ঘুরেও দেখাল। মি.বোস হরির পেছনে ঘুরঘুর করছিল, যাতে করে হরির জাহাজে যাওয়া যায়। জাহাজে কাস্টমসে বেশ কিছু বিদেশী জিনিসপত্র সস্তায় যাতে পাওয়া যায়, সেই ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার জন্য হরির সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করছিল। এমনকি হরিকে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। হরি রাজি হয়নি। মি.বোসের মানে লাগল। সে এবার হরিকে জব্দ করার জন্য বেশ কিছু ব্যাংককের গুণ্ডাকে হরিকে ভয় দেখানোর জন্য বলল।
একদিন হরি সর্দারজির বাড়ি থেকে নিজের হোটেলে ফেরার রাস্তা ধরেছিল। হঠাৎ ওর সম্মুখে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। ট্যাক্সি থেকে জনা চারেক লোক এসে হরিকে ধরে জোর করে ট্যাক্সিতে বসিয়ে দ্রুত গতিতে রাতের ফাঁকা রাস্তা ধরে এগোতে লাগল। হরিও দমবার পাত্র নয়। সে ট্যাক্সির মধ্যেই একজনকে চোয়াল লক্ষ করে সজোরে ঘুসি চালিয়ে দিল। হরির ঘুসিতে লোকটি চোয়ালে হাত দিয়ে ককিয়ে উঠল। হরি সুযোগ পেয়ে গেল অন্য লোকটিকে ঘায়েল করার। তার দুই পা দিয়ে লোকটির তলপেটে সপাটে লাথি মারল। চলন্ত গাড়ির দরজা ভেঙে লোকটি রাস্তার মধ্যে পড়েই অজ্ঞান হয়ে গেল। গাড়ি থামিয়ে বাকি দুই জন হরিকে মারবার জন্য উদ্যত হতেই হঠাৎ সর্দারজি বেশ কিছু সাথীকে নিয়ে আর একটা গাড়িতে সেখানে উপস্থিত হয়ে বাকি দুজনকে চেপে ধরল। জানতে পারল ওদের সকলকে মি.বোস হরিকে কিডন্যাপ করার জন্য টাকা দিয়েছে। সেই রাতেই হরি হোটেলে ফিরে না গিয়ে সর্দারজীকে নিয়ে মি.বোসের বাড়ি চলে গেল।
“মি.বোস, হতে পারে এই ব্যাংকক আপনার চেনা শহর। শুনেছি এই শহরে এইসব গুণ্ডামী, স্মাগলিং চলে। কিন্তু আমার ভাবতে খারাপ লাগছে যে, একজন বাঙালী হয়ে এমন জঘন্য কাজ করছেন। ছিঃ আপনি বাঙালীর নাম ডোবালেন। আপনাকে কোনওভাবেই ক্ষমা করা যাবে না। দেখুন সর্দারজী নিজের দেশের লোকের প্রাণরক্ষা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন। সর্দারজী আমার প্রকৃত ভাই। আমার গর্ব হচ্ছে যে, সর্দারজী একজন প্রকৃত ভারতীয়”
বাংকক পুলিশ মি.বোসকে এরেস্ট করল। হরি, সর্দারজীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হোটেলে ফিরে এল।
বেশ কিছুদিন ব্যাংককে কাটাবার পর হরির জাহাজ এবার যাত্রা শুরু করল। এবারের গন্তব্য ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায়...
পরের দিন হরির জাহাজ ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। জাহাজের ব্রিটিশ অফিসাররা হরির বাহাদুরীর জন্য ওকে সম্মান জানিয়েছে। হরিকে হীরো ভাবতে শুরু করেছে। হরিকে সম্মান জানিয়ে নতুন পোস্টে উত্তীর্ণ করল। আর বাঙালী অফিসার মি.গাঙ্গুলি হরিকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন,
“আমি এতদিনে যে পোস্ট অর্জন করেছি, তুমি ভাই এই অল্পদিনেই আমার সমান পোস্ট অর্জন করে নিয়েছ। তোমার প্রতি আমার হিংসা হচ্ছে ভাই। তবে এই হিংসা আনন্দের… অনেক অভিনন্দন”
হরির জাহাজ ম্যানিলা পৌঁছে গেল। ম্যানিলা শহর পরিচ্ছন্ন আমেরিকান কায়দায় সজ্জিত শহর। সমুদ্রের পাড়েই "ম্যানিলা পার্ক" এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম পার্ক। সুন্দর সুন্দর উদ্যান। উদ্যানের ভেতর দিয়ে বড় বড় রাস্তা এবং বার রেস্টুরেন্ট। ঐ সব রেষ্টুরেন্টে সুন্দরী যুবতীরা রয়েছে বিদেশী পর্যটকদের আপ্যায়ন করার জন্য। জাহাজ থেকে অবতরন করার পরই একটু দূরে ম্যানিলা পার্ক। পার্কের ভেতর দিয়ে সোজা হেঁটে গেলেই ম্যানিলা বড় পোষ্ট অফিস। ওখান থেকে হাঁটাপথ গেলেই ন্যাশানাল লাইব্রেরী। সুন্দর অট্টালিকার দেশে ইংরাজী ভাষার প্রচলন আছে। প্রায় সকলের সংগেই ইংরেজীতে কথা বলা য়ায়। লাইব্রেরী থেকে একটু এগিয়ে গেলেই উত্তর দক্ষিণে সজ্জিত মনোরম অট্রালিকা পরিচ্ছন্ন সুন্দর শহর। শহরের ভিতর অসংখ্য নাইট ক্লাব। তবে এ দেশে শাসন ব্যবস্থা ভালো না। অল্প টাকা দিলেই লাইসেন্স ছাড়া রিভলবার কিনতে পাওয়া যায়।
রাত্রে হরি শহরটি ভালো ভাবে ঘুরে দুজন ভারতীয় সঙ্গী নিয়ে ম্যানিলা পার্কের ভিতর দিয়ে জাহাজে ফিরছিল, হঠাৎ দুটি ফিলিপিনস্ যুবক রিভালবার উঁচিয়ে তাদের হাতঘড়ি ছিনতাই করে পালিয়ে গেল। হরিও ছাড়ার পাত্র নয়। সে সাহসে বলিয়ান হয়ে যুবকদুটির পেছন ছুটল। ক্যারাটে জানার সুবাদে হরি ওদের ধরে ফেলে এবং মুহূর্তের মধ্যে ধরাশায়ী করে যুবকদুটির থেকে নিজের ঘড়ি উদ্ধার করে, পুলিশের হাতে দিয়ে জাহাজে ফিরে আসে। দিন তিনেক পরে জাহাজ ম্যানিলা ছেড়ে হংকং-এর পথে চলল। জাহাজে দূর থেকে হংকং দ্বীপকে খুব সুন্দর দেখায়। সমতলে হংকং-এর বড় শপিং সেন্টার এবং অফিস পাড়া। সমতলে সমুদ্রপারে অসংখ্য ফেরী বোট, ফ্রাইং বোটও দেখতে পাওয়া যায়। শহরে ইলেকট্রিক চালিত বাস ও অনেক দোতালা বাসও দেখতে পাওয়া গেল। বাসের মাথায় ট্রামের মত ইলেকট্রিক কানেক্টর। সিঙ্গাপুরের মত পৃথিবীর সব দেশের সব রকম সুন্দর সুন্দর জিনিস সস্তায় এবং 'ট্যাক্সফ্রি" পাওয়া যায়। ফুটপাতে সস্তায় মেকী সুন্দর সুন্দর জিনিসও পাওয়া যায়। হংকং বাসীরা অধিকাংশই চীনা; তবে অনেক ভারতীয়, পাকিস্থানী এবং বৃটিশ নাগরিকও আছে। বহু ভারতীয়, চীনা পরিবার এখানে বসবাস করে। মেনল্যান্ড কাউলুনও হংকং এর অন্তর্ভুক্ত। মাটির নীচে বড় টানেল পথে হংকং-এর অর্ন্তভুক্ত। মাটির নীচে বড় টানেল পথে হংকং কাউলুন বাস গাড়ী যাতায়াত করে। কাউলুন ও হংকং এ বহু আকাশছোঁয়া বড় বড় বিল্ডিং দেখা যায়। কাউলুন শহরে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল শপিং আছে। হরি শপিং-এ বেশ কিছু নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিল। এখানকার শাসনব্যবস্থা বেশ কড়া। শহরের নিরাপত্তা ব্যাবস্থাও চমৎকার। হরি হংকং-এ দিব্যি বেশ কয়েকদিন কাটানোর পর জাহাজের অফিসাররা চিনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তারা হরিকে জানাল, চিন হচ্ছে সবচেয়ে শয়তান দেশ। ওখানে পোঁছে শুধুমাত্র নিজের জাহাজে কাটাতে হবে। চিনের রাস্তায় স্বাধীনভাবে ঘোরা ভীষণ বিপজ্জনক। হরি মনে মনে ভাবল,
“চিনের মত একটা শক্তিশালী দেশে আসব, অথচ এখানকার সবকিছু দেখব না, এই সুযোগ সে কখনই হাতছাড়া করবে না”
বিট্টু যেন তার হরিদাদুর সাথে মানসভ্রমণ করছে। ঘুম তার ভেঙে গেল। তার মাথাটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। ঘুম ভাঙতেই সে নিজেকে একটা পরিত্যক্ত ঘরে পড়ে থাকতে দেখল। খড়ের বিছানায় সে শুয়ে ছিল… অবাক হয়ে গেল বিট্টু।
-------------------
বিট্টু কি করবে? সে অবাক হয়েছে, এইভাবে একটা পরিত্যক্ত ঘরে নিজেকে একা পেয়ে… পড়ুন পরের পর্বে।
এরপর পরের সপ্তাহে, একাদশ পর্বের অপেক্ষায়…
0 Comments.