- 22
- 0
জানালার ওপারের পৃথিবী
শহরের একমাত্র হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগ আলাদা একটি বিল্ডিংয়ে। ওয়ার্ডটির নাম "আশার কক্ষ"। নামটি যতটা উজ্জ্বল, ভেতরের পরিবেশ ঠিক তার বিপরীত—নিস্তব্ধ, ভারাক্রান্ত। এখানে যাঁরা ভর্তি হন, তাঁদের অধিকাংশই জানেন, জীবনের সঙ্গে শেষ লড়াই বোধহয় এই ঘরেই হবে।
ঘরটিতে ছয়টি বেড, কিন্তু জানালা একটিই। সেই জানালার পাশের বেডটি ভাগ্যক্রমে পেয়েছিলেন একজন—অমল কৃষ্ণ রায়। সংক্ষেপে অমলবাবু।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক অমলবাবু। কর্কটরোগে শরীর প্রায় ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু মুখে লেগে থাকত হাসি। প্রতিদিন বিকেলে কষ্ট করে তিনি জানালার পাশে বসতেন। তারপর শুরু হতো তাঁর গল্প।
"দেখো, ওই দূরের রাস্তা দিয়ে একটা ছোট্ট ছেলে লাল বেলুন কিনে বাবার হাত ধরে হাঁটছে। কী সুন্দর দৃশ্য!"
কোনদিন বলতেন, "ওই কচি আমগাছটার নিচে দুটো কুকুরছানা খেলছে।"
কখনো বলতেন, "আজ মাঠে মেলা বসেছে, সবাই আনন্দ করছে।"
ঘরের অন্য রোগীরা চোখ বন্ধ করে গল্প শুনতেন। কারো চোখে জল আসত, কারো ঠোঁটে ফুটে উঠত কল্পনার হাসি। সারাদিনের যন্ত্রণা সহ্য করার পর এই এক ঘণ্টাটুকুই যেন সবার বেঁচে থাকার রসদ হয়ে উঠত।
অলকা দি, রোগীদের একজন, একদিন বললেন, "অমলদা, আজ ফুলের বাগানের কথা বলুন না। কোনো ফুল কি ফোটেনি?"
অমলবাবু হাসলেন। তারপর বললেন, "হ্যাঁ, আজ গোলাপ ফুটেছে। ওই দেখো, একটা ছোট্ট মেয়ে গোলাপের গন্ধ শুঁকে মাকে বলছে—মা, এই ফুলটা কোথা থেকে এল? স্বর্গ থেকে? কী সুন্দর দেখো!"
সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনত। কেউ কোনদিন সন্দেহ করেনি এই গল্পগুলোকে। বরং তা থেকেই তারা বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে নিত, বিশ্বাস করত জানালার ওপারে সত্যিই একটা সুন্দর পৃথিবী আছে।
এমনই করে দিন কাটছিল। কিন্তু ক্যান্সার তো গল্প শুনে থামে না।
অমলবাবুর শরীর দিন দিন আরও খারাপ হতে লাগল। তবু তিনি গল্প বলা বন্ধ করলেন না।
শেষ দিনেও বলেছিলেন, "আজ সূর্যাস্তটা খুব সুন্দর হয়েছে। আকাশটা আগুনে লাল। একটা সারস পাখি পশ্চিমের আকাশে উড়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে তার কাছে কোনো সুখবর আছে, সেই বার্তা নিয়েই ছুটে চলেছে সে।"
সেই রাতেই, নিঃশব্দে, অমলবাবু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
হাসপাতালের নিয়ম অনুসারে কয়েকদিন পর তাঁর বেড পরিষ্কার করে নতুন চাদর পেতে সেখানে আনা হলো ওই ঘরেরই আরেক রোগী, রক্তিম সেনকে।
রক্তিমবাবু দীর্ঘদিন এই ঘরে আছেন, তিনিও প্রতিদিন অমলবাবুর গল্প শুনতেন। মনে মনে ভাবতেন, "জানি, আমিও বোধহয় অন্তিম যাত্রার পথেই আছি। তবু একদিন যদি জানালার পাশের বেডটা পেতাম!"
সেই বেড পেয়ে মনে মনে আনন্দিত হয়েছিলেন রক্তিমবাবু। নার্স তাঁকে জানালার পাশে বসিয়ে দিলেন। কাঁপা হাতে জানালার গরাদ ধরে তিনি বাইরে তাকালেন।
তারপর হঠাৎ তাঁর বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি।
ঘরের সবাই অবাক হয়ে গেল। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করল, "কী হয়েছে?" কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।
অবশেষে প্রশান্তবাবু নামে আরেকজন রোগী, যিনি সদ্য একটু হাঁটতে পারছেন, কষ্ট করে উঠে জানালার কাছে গেলেন। বাইরে তাকালেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
কোথায় রাস্তা? কোথায় ফুলের বাগান? কোথায় বাচ্চার হাসি? কোথায় মেলা?
কিছুই নেই। শুধু দূর পর্যন্ত ধু-ধু ঘাসে ঢাকা ফাঁকা জমি। একটা ভাঙা বেড়া। কয়েকটা শুকনো ঝোপ। আর গভীর, নিস্তব্ধ নীরবতা।
প্রশান্তবাবু ধীরে ধীরে ফিরে এলেন। ঘরের সবাই অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "কিছুই নেই..."
ঘরে নেমে এলো আরও গভীর এক নীরবতা।
রক্তিমবাবু চোখ মুছতে মুছতে বললেন, "আজ বুঝলাম, অমলদা জানালার বাইরের পৃথিবী আমাদের দেখাননি। তিনি আমাদের ভেতরের পৃথিবীটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।"
তিনি আবার বলতে লাগলেন, "মানুষটা জানতেন, তিনি আর কোনদিন বাড়ি ফিরবেন না। অথচ সেই মানুষটাই প্রতিদিন আমাদের সবাইকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন। যিনি নিজের যন্ত্রণার কথা একদিনও বলেননি, অথচ প্রতিদিন আমাদের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিতেন অসাধারণ গল্প বলে। যিনি মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছিলেন, সেই মানুষটাই আমাদের প্রতিদিন শুনিয়েছেন বেঁচে থাকার গল্প, জীবনের গল্প।"
পরের দিন বিকেল। ঘরে আবার সেই নীরবতা।
সেই নীরবতা ভাঙলেন রক্তিমবাবু নিজেই। জানালার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, "আরে দেখুন, আজ একটা ছোট্ট মেয়ে বাবার হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরছে, হাতে নীল রঙের ছাতা।"
আবার বললেন, "ওই রাস্তার ধারে একটা বুড়ো মানুষ আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছে। একটা কুকুর তার পাশে বসে লেজ নাড়ছে। আকাশে আজ মেঘের ভেলা ভাসছে, মনে হচ্ছে তুলোর পাহাড় তৈরি হয়েছে।"
সবাই চোখ বন্ধ করল। আবার সেই গল্প শুনল। আবার সেই স্বপ্ন দেখল।
সেদিন থেকে অমলবাবুর গল্প বলার দায়িত্ব নিলেন রক্তিমবাবু। তিনি মারা গেলে তাঁর জায়গায় এলো আরেকজন। তারপর আরও একজন। এভাবেই জানালার ধারে বসা মানুষটি বদলাতে লাগল। কেবল বদলাল না সেই গল্প বলা।
রোগী কেবল ওষুধে বাঁচে না। বাঁচে আশা নিয়ে। কখনো কখনো একটা মিথ্যেও পাপ হয় না—যদি সেই মিথ্যে কারো মৃত্যুপথযাত্রার একাকীত্ব একটু কমায়, কারো চোখে শেষবারের মতো জীবনের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়, তবে সেই মিথ্যে কখনো পাপ নয়।
হাসপাতালের জানালার বাইরে আজও কোনো রাস্তা নেই, কোনো মেলা নেই, কোনো ফুলের বাগান নেই। তবু প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ফুল ফোটে, শিশুরা খেলে, পাখিরা গান গায়।
কারণ এই সবকিছুর জন্ম বাইরের জগতে নয়—জন্ম মানুষের কল্পনায়, ভালোবাসায়। আর সেই এক নিঃস্বার্থ হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন অমলদা, যিনি নিজের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অন্যকে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছিলেন।
0 Comments.