- 67
- 0
শহরতলির ইতিকথা
নকশাল দমন চলছে;তাদের দলের মধ্যে পুলিশ, চুপিসারে খেঁকশাল ঢুকিয়েছে ,তারা খোচর বৃত্তিতে ওস্তাদ,মানে পুলিশের চর;ওদেরই খবরের জেরে,হংশ্বেশ্বরী মন্দিরের দোতলা থেকে পাইপ-গান সমেত, কয়েকজন নক্সাল ধরা পড়লো,এদের মধ্যে দু'জন ঐ বিয়ের দিনের রাতে বোম ফেলে,বিপ্লবের ধ্বজা ওড়াতে চেয়েছিল,অবশ্য,হাজরামশাইকে , পুলিশের সিকিউরিটি তোলার জন্য যে খেঁকশাল, হুমকি দিয়েছিল,সে বা তার ভাই,পুলিশের খপ্পরের বাইরে; ওরা আবার রমার স্নেহধন্য ;রমার এক ইশারায় তারা বোধহয়, অনেক কিছুই করতে পারে ; ওদের আদর্শ, শ্রেণীশত্রু খতম করে,বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করা না!
শিক্ষাক্ষেত্রে তো চলছে অরাজকতা;বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ছেলেখেলায় পর্য্যুবসিত হয়েছে; কী নক্সাল,কী বাম,কী ডানের সব ছাত্র-সংগঠনই টোকাটুকি,বইখুলে লেখার বিষয়ে সাম্যের বিপ্লবীপনায় সহমত।এরকম সময়ে,তো পরীক্ষায় বসলেই পাস;রমাও বিএ পরীক্ষায় একবার বসেই গ্রাজুয়েট হয়ে গেল;এবার প্রায়ই ভাইস- চেয়ারম্যান মশাই,পাড়ায় ওদের বাড়িতে চা খেতে আসছেন;আমন্ত্রণ, যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত,তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না; একটু আধটু ছোঁয়াছুঁয়িতে যদি উদ্দেশ্য পূরে, তবে না হয়,কয়েকদিন চলুক,এ অবস্থা;প্রাইমারী স্কুলে চাকরি হয়ে গেলে,তো একেবারে স্থায়ী চাকরি,সময় মতো প্রমোশন, অবসরকালে পেনশন,তবে! এতো ছ্যুৎমার্গ হলে কী সাফল্য আসে,কাজ হয়ে যাবার পর তো রয়েছে,পতিত-পাবনি গঙ্গা,আহা! সধবার আবার একাদশী!
হাজরামশাই'র ছোটছেলে ও পাড়ার অন্যান্য সমবয়সীদের মধ্যে খেলার সময়,হাতাহাতি হয়েছে;আর তার জেরে,ওদেরই একজনের বাবা,ঐ ছেলেদের একজনকে মেরেছে থাপ্পড়; ব্যস,এবার জমে গেছে পাড়ায় নক্সাল রঙ্গমঞ্চের নাটক;ছেলেদের,'হয়লদা' বলে একজন খেঁকশাল এসে ,ঐ একজন ছেলেটার বাবাকে দিল উল্টো চড়- থাপ্পড়; লোকটি তখন মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্স কলেকশনের ডিউটিতে ছিল; ফল হলো কী,মিউনিসিপ্যালিটির কর্মরত অবস্থায় কর্মীর গায়ে হাত,তো চেয়ারম্যানসাহেব করেছেন নিকটবর্তী থানা, মগরায় ওদের বিরুদ্ধে, এফ-আই-আর। চেয়ারম্যান,অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। রাজরোষ বলে কথা,চোর চাই-ই(শ্যামা গীতিনাট্য,রবি কবি); অতএব,পরের দিন,পাড়ার সব ঐ ছোটো ছোটো ছেলেকে ধরে নিয়ে গিয়ে,পুলিশ নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করেছে;না, ঐ ওদের হয়লদাকে ধরেনি, ধরেছে ঐ ন-দশবছরের ছেলেদের দলকে ;ভোর রাতে পুলিশ-পুঙ্গবেরা এসে বলে,"রাজীববাবু,ভাইকে বার করে দেন" ,পাশের বাড়ি থেকেও রাজীবের সহোদরের খেলার সাথীর আর্তনাদ শুনতে পেয়ে,মায়ের কোলের মধ্যে সেঁধিয়ে থাকা সহোদরকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে পুলিশের জিম্মায় দিয়ে বলে,"যা এখন, ন'টা-সাড়ে ন'টায় থানা থেকে ছাড়িয়ে আনবো;রাজীবও মনে মনে,সহোদরের মনের মধ্যে পুলিশ ভীতিটা চাইছিল,নক্সালদের প্রভাব থেকে ছেলেগুলোকে মুক্তির একটা সুযোগ এসে গেল।
সাড়ে নটার সময় রাজীব থানায় পৌঁছে, ব্যক্তিগত বণ্ডে সহোদরকে ছেড়ে দেবার কথা বললে,ওসি সাহেব বললেন,"জানেন তো,আমাদের চাকরি করতে হয়,আপনি কোর্ট থেকে ভাই'র জামিনের ব্যবস্থা করুন।"
রাজীব বলে,"বেশ,আপনারা ঐ ছেলেদের কোর্টে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন;আসল কালপ্রিটকে তো ধরেননি,সব ন-দশ বছরের ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ছাত্র,এখনো,ভালো করে নিজেদের নাম-সই করতে সেখেনি;যাই হোক, আমি কোর্টেই যাচ্ছি,আপনারা ছেলেদের কোর্টে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।"
না,ঘড়ির কাঁটা ঘুরে গেলেও, ঐ ছোট ছোট ছেলেগুলোকে নিয়ে পুলিশের গাড়ি সময়মত কোর্টে না আসায়,রাজীব,এবার পুলিশের উচ্চপদস্থ অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে গেল; অতিরিক্ত এসপির সঙ্গে দেখা করতে গেলে, বলেন," বসুন স্যার,বলুন,আমার পুলিশ কী করেছে।"
সব শুনে,কোর্ট-ইনস্পেক্টরকে ডেকে পাঠালেন। ইন্সপেক্টর মশাই ঘরে ঢুকেই স্যালুট করে বলেন,"হ্যাঁ,স্যার,আসামী এলেই কোর্টে প্রডিউস করা হবে"; অতিরিক্ত এসপি,তা শুনে রাজীবের দিকে তাকাতেই,রাজীব বলে,"আজ শনিবার,বারোটার পর কোর্ট তো বন্ধ হয়ে গেছে, কী করে কোর্টে প্রডিউস হবে?"এবার ইন্সপেক্টর বলে"হ্যাঁ স্যার,বারোটার পর এলে আর হবে না;ঘড়িতে তখন বেলা 2টো বেজে গেছে।অতিরিক্ত এসপি মশাই,ইন্সপেক্টরকে চলে যেতে বলে, বলেন,"এদের লেফ্ট-রাইট করতে করতে,মাথার ঘিলু শুকিয়ে গেছে।"
এরপর,স্লিপের উপর পার্সোনাল বণ্ড দিয়ে ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। রাজীব ও অন্যান্য ছেলেদের গার্জেন, বেলা চারটের সময় নিকটবর্তী থানা থেকে পি-আর-ও বণ্ড দিয়ে সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে।না,আসল কালপ্রিট ওদের 'হয়লদা' পাড়াতে দিব্যি ঘুরে বেড়িয়ে পুলিশি-আইনকে, ফাঁকা আওয়াজ বলে ঘোষনা করে,বিপ্লবী বুলি ছোটাচ্ছে।জয় হো,শাসন-যন্ত্র!
0 Comments.