- 3
- 0
শহরতলির ইতিকতা
হাজরামশাই,চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে;এখন তাঁর কাজই হচ্ছে,ঘর-সংলগ্ন বাইরের খোলা বারান্দার মাঝের পিলারে ঠেশ দিয়ে বশে, সকাল-বিকেল চা খাওয়া,আর হৈমবতীর মুখ
নিঃসৃত বাণী শোনা।
নতুন বৌ'র বাবার ওদেশে চাষ-বাস, পল্ট্রি-ফার্ম আছে; সব সব্জি, জমিতেই বিক্রি করে দেয়; শহরের মাণ্ডির লোক এসে, যেমন যেমন প্রয়োজন মত তুলে নিয়ে যায়; কেবল বয়লার মুরগী-ও মুরগীর ডিম, সকাল- বিকেল ফার্মের রিক্সাতে, বাজারের আড়তে দিয়ে আসে,ফার্মের স্থায়ী কাজের লোক। বৌমার মুখ থেকেই এসব কথা শুনে,বৌমাকে নিকিরির বেটি বলে সম্বোধন করে,হাজরমশাই।নতুন বৌ'র কাছে ঐ শব্দের অর্থ অজানা,তাই চুপ করে থাকে।নতুনবৌ,সবার মনজয় করে চলার চেষ্টা করলেও রাজীবের যে বৌ মনোমত হয়নি,তা বুঝতে পেরে হাজরা-দম্পতি হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে;ওর সেজোবোনও কলেজে যাবার সময়,হাতের কাছে খাবারের থালা পাচ্ছে,সবাই আনন্দেতেই আছে। বড় বৌ'র ছবিতে সকাল বেলা ঝাড়ু মারার পর্বটা, হৈমবতীর বন্ধ হয়েছে। রাজীবের পয়সাতে, ওর দুই সহোদরার ভাই ফোঁটার বাহারটা বেশ বেড়েছে; ওদিকে, রমার ভাই ফোঁটার জৌলুষ কমেছে,ব্যস্ত এখন,দিদিমনি কি না!
হাজরামশাই,অবসর কালীন কত টাকা পেয়েছে,তা কিন্ত কাউকে জানায়নি।রাজীবের সেজভাই, উড়িষ্যার তালচিরের কাজ ছেড়ে,টিবি-হাসপাতালে থেকে, সুস্থ হয়ে এখন বাড়িতেই বসে আছে;এ ছাড়াও রয়েছে,ছোট সহোদর ও আর একজন সহোদরা।সংসারের সব আর্থিক দায়-দায়িত্ব এখন রাজীবের উপর।হাজরামশাই,একটা টাকাও সংসারের জন্য খরচা করে না।নিজের দেশের গ্রামে,বসবাস করার জন্য প্লান করছে।নতুন করে জমি কিনে,বাড়ি কিনে,গাঁয়ে বাস, কতটা সংগত,তা সুস্থ মানুষের কাছে বিস্ময় জাগালেও,হাজরা-দম্পতির তো মনে রয়েছে না, অন্য প্যাঁচ,বাবা! জিলিপিকেও বলবে, সড়ে দাঁড়া।
পাড়ার একজনের,শহরতলির মেন -রাস্তার উপর চালু মুদিখানা বিক্রির খবর পেয়ে,নতুনবৌ,শ্বশুরকে বলে,"বাবা,ঐ দোকানটা কেনার ব্যবস্থা করুন না,আপনার ছেলেও কিছু টাকা দেবে,তাহলে,সেজদার ও একটা হিল্লে হয়ে যাবে,সবাই একসঙ্গে থাকতে পারা যাবে,আপনিও ওখানে বসে,সময় কাটাতে পারবেন।রাজীবের সেজভাই,ভালো হিন্দি বলতে পারে,দেশের বাইরে অনেক জায়গায় কাজ করেছে,তাই,তার সঙ্গে নতুনবৌ'র যত কথাবার্তা; তার মুখ থেকেই ঐ সব বিক্রির সংবাদ পেয়ে শ্বশুরের কাছে,
এ প্রস্তাব পেড়েছে।
হাজরামশাই,সেজছেলেকে চাকরির ব্যবস্থাই করে দেয়নি;ওঁর সহকর্মীরা নিজেদের ছেলেদের হিল্লে করলেও,এ প্রস্তাব যে নাকচ হয়ে যাবে,তা বলাই বাহুল্য। হাজরামশাই'র বক্তব্য,"তোমরা সব খেয়েই,দোকান তুলে দেবে।"
বসে, বসে তাস সাজাচ্ছে;দূরে বাপের বাড়ি,বৌমা আর ,হুট করলেই বাপের বাড়ি যেতে পারবে না।অবসরকালীন যে টাকা পেয়েছে,তাই দিয়ে দেশে পাঁচবিঘে জমি কেনা হোল; ঐ গ্রামেই হৈমবতীর বাপের বাড়ির পাড়ায় একটা বাড়িও কিনে ওখানেই থাকার মতলব হয়েছে।সেজোছেলে,গিয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে এলো। বাড়িতে কলেজে পড়া আইবুড়ো মেয়ে,স্কুলে পড়া ছেলে ও স্কুলে পড়া মেয়েকে রাজীবের ঘাড়ে চাপিয়ে,হাজরা-দম্পতি গেল গ্রামে হনিমুন করতে,হ্যাঁ,হনিমুনই তো বটে;এ বয়সে আবার নতুন করে জীবন শুরুকে, এর চেয়ে ভালো আর, কী বলা যায়!
সেজোসহোদরা,বিএ অনার্স ফাইন্যাল পরীক্ষায় ভালো ফলই করেছে;ওদের প্রায় সবাই,কলেজের অধ্যাপকের কাছে ট্যুইশান নিচ্ছে শুনে, তা বলায়,রাজীব ,ওর স্কুলের মাষ্টারমশাই'র মেয়েকে একটা চিঠি লিখে,সেজোকে তার কাছে পাঠিয়েছিল; মেয়েটি এবার পোস্ট-গ্রাজুয়েশনে ঐ বিষয়ে ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়ে, বাড়িতেই আছে;গ্রাজুয়েশনে ঐ মেয়ে প্রথম স্থান পেয়ে গোল্ড মেডেল পেয়েছে, আবার পোস্ট-গ্রাজুয়েশনেও যে প্রথমই হবে,সে বিষয়ে রাজীবের সন্দেহ নেই। রাজীরদার বোনকে দেখাতে হবে;বিনা বাক্যব্যয়ে সে রাজি হয়েছে; রাজীব,একেবারে তিনমাসের
একশো পঞ্চাশ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে; একসঙ্গে টাকা পেলে,ওটা কাজে লাগবে;প্রথমে সে নেবেনা বললেও,জোর করার পর তা নিয়েছে;অতি যত্নের সঙ্গে সেজোর পড়ার বিষয়ের দুর্বল জায়গাগুলোকে, প্রাঞ্জল করে বুঝিয়েছে। হাতে মিষ্টির প্যাকেট ও কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখে,
সহোদরাকে মেয়েটির কাছ পাঠাতে,রাজীব ভোলেনি।
এবার সেজোর বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।হাজরা-দম্পতির একটাই বক্তব্য,যে পড়িয়েছে,বিয়ে দেবার দায়িত্ব তার,"আমরা চা'র দোকানের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতাম," সমস্ত দায় ঝেড়ে হাজরা,গ্রামে বসে থাকলো; অবশ্য,হৈমবতী,প্রায় প্রতি মাসেই,একবার করে হাওয়াবদলে এসেছে । হাজরা, শহরতলির মুখো আর হয়নি। সেজোসহোদর,ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে মাঝে মাঝেই দিয়ে আসে;টাকা তোলা বা চেকের কথা কখনও হাজরা,রাজীবের কাছে বলেনি। এদিকে,লোকমুখে শোনা যায়,গ্রামের লোকের কাছে বলছে,"আমি তো প্রতি মাসে ষাট টাকা করে দিই;চারটে ছেলে-মেয়ের রেশন কার্ড থেকে যে সামগ্রী পাওয়া যায়,তার বাজার দর ষাট টাকারও অধিক,সুতরাং, হাজরা-দম্পতির পুত্র-কন্যাদের পালনে, রাজীবকে কোনো দায় নিতে হচ্ছে না।" রাজীব, মনে মনে কষ্ট পেলেও,বুঝতে পারে,কী ভয়ানক ওরা;গ্রামের লোকের কাছে,সব ছেলে-মেয়েকে রাজীবের কাঁধে ফেলে রাখার একটা কেবল কূ-যুক্তি খাড়া করা,যাই হোক চুপ করেই থাকে,এদিকে নতুন বৌ'র পেটে বাংলার জল পড়েছে,নিজের গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল লাভ করেছে।ফলে রাজীবের টানা-পোড়েনের জীবন শুরু হল,সংসারের 'সং' শব্দের অর্থ সে বুঝতে শুরু করেছে।
0 Comments.