- 3
- 0
নিজের বাচ্ছার কোচিং-এ নতুন জীবন
আমাদের একান্নবর্তীতা যত ভাঙছে শিশুদের তত স্বাধীন বিকাশের প্রবণতা লোপ পাচ্ছে। আমরা শিশুর একাকীত্ব ঘোচাবার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি খেলনা কিনে দিই,এখন তো শিশুর হাতে মোবাইল খুলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই শিশুরাও সামাজিক জীব, তাদের সামাজিক শিক্ষার সূচনা মাতৃগর্ভ থেকে। সামাজিক শিক্ষার বেশিরভাগ সিলেবাস তারা শৈশবে পারিবারিক সীমার মধ্যেই পেয়ে যায় । আগে পেয়ে যেতো। ফলে তাদের মধ্যে সামাজিক ও মানবিক গুণগুলো বিকশিত হবার মতো পরিবেশ পেতো,সুযোগ পেতো । বর্তমান নিউক্লিও পরিবারগুলোর এমন অবস্থা যে শিশুর সঙ্গে বসে খাবার মতো সময় নেই,ইচ্ছাও নেই। বেশিরভাগ জন বাইরে খেয়ে নিতে চায়, নয়তো শিশুকে ছাড়াই নিজেদের সময় মতো খায় । শিশুদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করার ফলে শিশুরাই দূরে সরে যায়, তাদের মধ্যে সংঘবদ্ধতার অভ্যাস, আনন্দ, দায়িত্ব ,কর্তব্য ,উপকারিতার কোনো অনুভূতিই সৃষ্টি হবার সুযোগ পায় না বলেই তারা আবেগহীন স্বার্থপর হয়ে ওঠে। তাছাড়া শিশুদের সঙ্গে দূরত্ব প্রাকৃতিক নিয়ম বিরুদ্ধ। শিশুরা তাদের সামাজিক মৌলিক জ্ঞানগুলো বাবা মা ও পরিবারের অন্যজনেদের থেকে গ্রহণ করে। স্কুলের কৃত্রিম পরিবেশে সব সামাজিক শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়, উচিতও নয়। বাবার হাত আর মায়ের বুকের বিকল্প হয় না । তাদের জন্য খুব দরকার একান্ত ঘনিষ্ঠ নিবিড় আপনজনের সঙ্গ, যাকে সে ভয় পায় না, ভালোবাসে, নিজের থেকে ছোট মনে করে -সেই তার প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠতে পারে।
প্রত্যেক শিশু কল্পনাপ্রবণ, অনুকরণ প্রিয়, সৃজনশীল এবং শেখাতে ভালোবাসে। তার পুতুলের সংসার বা সংঘবদ্ধ স্বাধীন খেলার পরিবেশ লক্ষ করলে দেখা যাবে সে তার বাড়িতে, স্কুলে,বা চারপাশে যা একান্ত নিবিড় ঘনিষ্ঠ ভাবে যা দেখে, ভয় পায় বা মজা পায় , তার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চায় অপেক্ষাকৃত ছোট মনে করে যাদেরকে, তাদের কাছে। সাধারণত বড়দের সামনে ছোটরা কিছু করে দেখাতে বা বড়দের হারাতে খুব পছন্দ করে এবং আনন্দ পায়। এও দেখা গেছে কোনো সিনেমার অভিনয়, গান বা ডায়লগ বড়দের সামনে নকল করে উপস্থাপন করতেও মজা পায় । তার মধ্যে কখনো কখনো নিজের জিনিসও পরিবেশন করে থাকে।
আজকাল সব কিছুতেই কোচিং একটা সামাজিক বদ্অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এতে করে শিক্ষাটা যান্ত্রিক কৃত্রিম হয়ে যায়। শিক্ষার্থীর আন্তরিকতা ও একশভাগ সক্রিয়তা না থাকলে কোনো শিক্ষা প্রক্রিয়া সফল হতে পারে না । ছোটদের কাছে একশভাগ সক্রিয়তা একেবারেই অসম্ভব বলে এখনো অনেক শিক্ষক, শিক্ষিকা,বাবা মা লাঠিকে উত্তম দাওয়াই মনে করেন । হয়তো শাসন ও মারধরের আংশিক প্রয়োজন আছে,তা একমাত্র বাবা-মার এক্তিয়ার ভুক্ত। কিন্তু ঠিক তার উল্টোটাই দেখি কোচিং সেন্টারগুলোতে। সামরিক শিক্ষার মতো কঠোর ডিসিপ্লিন মানার জন্য প্রহার শিশুমন ভেঙে চুরমার করে ফেলে। ভয় পেয়ে শিক্ষা,আর ভালোবেসে শিক্ষার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। শিশুরা ভয় পেয়ে কখনো একশভাগ মনোসংযোগ ও সক্রিয় হয় না। পরিবর্তে ভালোবেসে অপরকে শিখিয়ে তারা কেবল আনন্দ পায় না, একশভাগ মনোযোগী ও সক্রিয় হয় ।
আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি শিশুর হাতে ছড়ার বই তুলে দিলে সে পড়ে না,সে শুনতে চায়। শুনে শুনে বলতে চায় । বলতে বলতে, শুনতে শুনতে একসময় সে বইটা তুলে নেয় । কিম্বা যে বাড়িতে মা ঘুরতে ফিরতে গান গাইছেন,সে বাড়ির শিশুটাও নিজের মতো গান গাইতে থাকে । এই আন্তরিক পরিবেশ ও সান্নিধ্য শিশুরা চায় , কিন্তু আজকাল আমরা দিতে পারি না । আমাদের নানান অজুহাত থাকে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, যে শিশুর পিছনে তার বাবা - মা বেশি আন্তরিক সময় ব্যয় করেছেন, তাদের শিক্ষা ও লেখাপড়ার সঙ্গে জড়িত থেকেছেন - সেইসব শিশুরা সাফল্যের চূড়ান্ত সীমা ছুঁতে পেরেছেন। তাই দেখে বেশিরভাগ বাবা-মা টিউশনি বাড়ানো আর বাচ্ছা ওপর সদাসতর্ক দৃষ্টি রাখছেন - সে ফাঁকি দিচ্ছে কিনা , বা বাজে কিছু করছে কিনা। কেউ কেউ এমন লেপ্টে থাকেন যে শিশুটা স্বাধীনভাবে ওয়াসরুম ব্যবহার করতে পারে না । স্কুল , টিউশনি,বাড়ি, পার্ক সর্বত্র লেপ্টে থাকার ফল কখনোই ভালো হয় না , কোনো না কোনো দিকে খারাপ হবেই।
আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ বাবা-মার একটাই অভিযোগ তাঁর ছেলে অথবা মেয়ে একদম পড়ে না। যে ছেলেটা বা মেয়েটা রাতদিন পড়ছে, ভালো রেজাল্ট করছে - তার বাবা- মার মনে হচ্ছে পড়ছে না,পড়া ঠিক হচ্ছে না । এটা এক প্রকার মানসিক ব্যাধি। বেশিরভাগ বাবা- মা কিন্তু যে ছেলে অথবা মেয়ে বেশি পড়ছে, তার কাছে গিয়ে বলে না - অনেক পড়েছিস, আয় তো একটু ঘুরে আসি বা আয় তো একটু খেলি। মজার ব্যাপার হলো, যারা বলে তাদের সেই বাচ্ছাটা আরো বেশি বই আঁকড়ে ধরে ।
শিশুদের শিক্ষা নিয়ে এ পর্যন্ত বহু ভাবনা চিন্তা হয়েছে, কিন্তু ষাট ভাগ শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষনীয় বিষয় একশভাগ মনোযোগী ও সক্রিয় করা যায়নি। কেননা সব শিক্ষা পদ্ধতি ওপর থেকে বা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া। শিশুকে তার ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে টেনে বের করে আনা সম্ভব হয়নি । খেলা ভিত্তিক শিক্ষায় শিশু কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে নিজে বের করে আনে , কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না। তাই এবার থেকে শিক্ষক দিবসটা অন্যভাবে পালন করলে কেমন হয়? শিশুরা যা শেখে বা আমরা তাকে যা বিশেষভাবে শেখাতে চাই ,সেই বিষয়ে আমরা বাবা - মায়েরা তাদের ছাত্র হয়ে গেলে কেমন হয়? আমরা তাকে বলবো তুই আমাকে এটা শিখিয়ে দে তো। এক্ষেত্রে কখনোই আমি জানি বা বাচ্ছা ভুল করছে আমি ধরিয়ে দিই - ভাবা যাবে না । ভুলটাই শিখতে হবে,ভুল করতে হবে এবং একনিষ্ঠ ছাত্রের মতো এবার কি করবো, এবার কি করতে হবে, এইভাবে কি করবো ( বেশিরভাগ ভুল হতে হবে ) - এইভাবে প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত একটা ঘণ্টা আমরা তাদের ছাত্র অথবা ছাত্রী হবো। দেখি না কি হয় ?
আমি নিজে এই পঁয়ষট্টি বছরে নাচ শিখবো বলে মেয়েকে বলেছি। সারাক্ষণ বসে বসে কাজ করে হাঁটতে চলতে অসুবিধা হয় । শরীর ভারী হয়ে যাচ্ছে। আমার মতো অনেকের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তাদের কাবু করে ফেলছে। আমাদের সকলের চাই আনন্দ, সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার মতো একটা কিছু । আমার প্রস্তাব শুনে মেয়ে হাসলো,বললো - তুমি বরং কারো কাছে গান শেখো। এই নাচ শেখার প্রস্তাব বাচ্ছাদের কাছে রাখতে, তাদের খুব উৎসাহ। প্রতিদিন তাড়া দেয় ,কবে থেকে শিখবে আঙ্কেল? কেউ বলে আমি এই নাচ তোলাবো,কেউ বলে ওই নাচ । কেউ বলে আমি গান শেখাবো,কেউ বলে আবৃত্তি । এই শিক্ষক দিবসে আমি কটা কি করতে পারবো বুঝতে পারছি না । তাদের বাবা -মাকে বলেছি, আপনারাও কিছু কিছু শিখুন। সবাই মিলে এবারে বাচ্ছাদেরকে শিক্ষকের আসনে বসিয়ে আমরা প্রণাম করবো, তাদের সামনে নেচে, গেয়ে, আবৃত্তি ও অভিনয় করে দেখাবো , যা তারা আমাদের শেখাবে । শিক্ষক দিবসটা অন্যভাবে পালন করেই দেখা যাক না !
0 Comments.