- 3
- 0
ফাগুনের গল্প
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় অবস্থিত অযোধ্যা পাহাড় ছোট নাগপুর মালভূমির পূর্বতম প্রান্ত এবং ডালমা পাহাড় ও পূর্বঘাট পর্বত মালার একটি অংশ। ৭২০ মিটার বা ২০০০ ফুটের ও বেশি উচ্চতার চামতাবুরু সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
অযোধ্যা পাহাড়ী অঞ্চলে শাল, সেগুন, শিমুল, মহুয়া গাছের অরন্য এবং শীতের শেষে পলাশের লাল টকটকে রঙে পুরো পাহাড় যেন আগুন রাঙা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টরের বেশি দুর্গম ঘন পাহাড়ী বনাঞ্চল দিয়ে দিয়ে ঘেরা অযোধ্যা পাহাড়। এই বনাঞ্চল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে বহু আদিবাসী মহিলা।
শীতের এক দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বাহা, মিরু আর ডুলার তিন সাঁওতালি মেয়ে মিলে অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন বনে কাঠ সংগ্রহ করতে গেল। প্রত্যেকের হাতে ছিল ছোট কুড়ুল ও শক্ত দড়ি। কাঠ কাটার ও বাঁধার জন্য। এই তিন সাঁওতালি আদি বাসী মেয়ে প্রত্যেকে বিধবা, স্বামী হারা ও খেটে খাওয়া সাধারণ গৃহবধু ।
মিরু আর ডুলার কখন যে গল্প করতে করতে গভীর বনে হারিয়ে গেছে বাহা তা খেয়াল করে নি। সে আজ কেমন যেন মনমরা। আসলে আজকের দিনে ই সে তার মরদকে হারিয়েছিল। তার মরদটা খুব ই ভালো ছিল। নেশা করতো না, আজেবাজে খরচ ও করতো না। একটি ইটের ঘর টালির চাল করেছিল ছিটেবেড়া ভেঙে। তাঁরা বেশ ভালো ই ছিল। পুরুলিয়া শহর থেকে ফেরার পথে পথে দুর্ঘটনায় মারা যায়। তাঁদের একটি ফুটফুটে ছেলে রয়েছে। তার নাম সুরজ হাঁসদা। ছেলেটাকে ঘুম পাড়িয়ে শাশুড়ির কাছে রেখে এসেছে। তাঁরা থাকে অযোধ্যা পাহাড়ের সর্বোচ্চ একটি গ্রামে । গ্রামের নাম ছাতনী।
ছাতনী গ্রামটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে চারপাশের উপত্যকা ও ঘন জঙ্গলের অপরূপ দৃশ্য সকলকে মুগ্ধ করে।এটি সম্পূর্ণ আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ী এলাকা। এখানে মানুষজন সহজ সরল ও সাধাসিধে।
বাহা কাঠ সংগ্রহ করতে করতে বেশ ঘন জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করে ছিল। হঠাৎ একটা বাচ্চা হরিনের ক্ষীণ ডাক তার কানে এসে পৌঁছায়। বুনো ঝোঁপের মধ্যে লতাপাতা জরিয়ে হরিনের বাচ্চা টি পড়ে রয়েছে।সে দেরি না করে ঐ বাচ্চা হরিনের ছানাটিকে কোলে তুলে নিল। বাচ্চা টি তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে নেতিয়ে পড়লো। তাঁর সঙ্গে সেই দিন জলের বোতল ও ছিল না। তার মাথায় দ্রুত বুদ্ধি খেলে গেল।সে তার গায়ের জামার ওপরের দুটো বোতাম খুলে দিল । তার বুকের মধ্যে হরিনের বাচ্চা টির মুখ ঢুকিয়ে দিল। দুই এক মিনিটের মধ্যেই হরিণের ছানাটি তাঁর বুকের দুধ চুষতে লাগলো। কিছু সময়ের পর হরিণের ছানাটি সুস্থ হয়ে ওঠে।বাহার মনেও মাতৃত্বের নুতন তৃপ্তি বোধ অনুভূত হলো । হরিণ শাবক কে আদর করতে করতে বাড়ি ফিরলো ।ওই দিন তার আর কাঠ সংগ্রহ করা হলো না।
মায়ের কোলে হরিণের ছানাটিকে দেখে সুরজ দৌড়ে এসে কেড়ে নিয়ে আদর করতে লাগল।বাহা হরিণ ছানা টির নাম দিলো ফাগুন।এমন একটি জলজ্যান্ত খেলনা পেয়ে সুরজ খুব খুশি। প্রতিদিন রাতে তার বুকের দুই পাশে একটি হরিণ শিশু আর একটি মানব শিশু দুধ খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়তো।
কি সুন্দর দৃশ্য! যাবেন নাকি পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড়ের উপর ঐ ছাতনী গ্রাম ! ঐ অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে!
0 Comments.