- 11
- 0
টুলূ
প্রায় তিন হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত লেপচামা গ্রাম টি । ভুটানের খুব কাছে হলেও আদতে এটি পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত এই ছবির মতো সুন্দর এই গ্রামটি। বেশিরভাগ অধিবাসী ডুকপা সম্প্রদায়ের। সবুজে ঢাকা পাহাড়, দূরে দূরে পাহাড়ী ছোট ছোট গ্রাম, সোপান খেত,সারি সারি চা বাগান, নদীর ঝুরু ঝুরু জলের ধারা আর নানা ধরনের বাহারি গাছ।চারি দিক যেন ছবির মতো সুন্দর, গোছানো। কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি গুলি পাহাড়ের উপর দূর থেকে মনে হয় কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা দুর্দান্ত সুন্দর ছবি! বাড়ি গুলির উপর দিয়ে সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মতো যখন মেঘ উড়ে যায় বিকেলে পড়ন্ত সূর্যের লাল আলোয় সে এক মনো মুগ্ধকর দৃশ্য! সেই দৃশ্য হৃদয়ে গেঁথে যায়।
বেশ কিছুদিন আগে এখানে বেড়াতে এসে দেখা হয় একটি বাচ্চা মেয়ে টুলুর সঙ্গে। ওর নাম টুলু ডুকপা। বাবা ডুকপা সম্প্রদায়ের মানুষ।নাম চামা ডুকপা ।আর ওর মা বাঙালি,নাম মোনালী রায়।মোনালী আমাদের হাওড়ার শিবপুরের মেয়ে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে কফি খাচ্ছি লাম। একটি প্লাস্টিকের বল খটখট করে এসে পায়ের কাছে পড়লো। একটি ছোট্ট মেয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,ও দাদু,ও দাদু আমার বলটা দাও না। খুব আদুরে গলায় বলতে লাগলো। আমি তাকে ইশারা করে ডাকতে সে দৌড়ে কাছে এসে দাঁড়ায়।
সুন্দর রঙিন পোশাকে তাকে খুব সুন্দর লাগছিল। বছর পাঁচেক বা ছয় বছর বয়েস হবে। মাথায় ভর্তি কোঙড়ানো চুল। বিনুনি করে বাঁধা পিঠ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। ধবধবে ফর্সা। নাচতে নাচতে হাসি মুখে কাছে আসতেই তাকে কোলে টেনে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করলো। যেন সে এক নৃত্যরত এক ছোট্ট হরিনী। কিন্তু সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিঃসঙ্কোচে আমার কোলের কাছে এসে হাজির!
' দাদু,দাদু, তুমি কোথা থেকে এসেছ ?' হাওড়া না কলকাতা?
আমি বললাম, তুমি তো বেশ ভালো বাঙলা বলতে পারো ?
হা হা হাহা করে মিষ্টি হেসে বলল,আরে আমার মা তো বাঙালি। তাঁর নাম মোনালী রায়। এখন নাম মোনালী ডুকপা। বাবা ডুকপা কিনা তাই ।
তারপর ই আবার জিজ্ঞেস করল,কি হল,বললে না? হাওড়া না কলকাতা?
আমি বললাম, হাওড়ায়।
শুনে বলল,তা হাওড়ার কোথায়,শুনি?
ঠিক যেন একটি পাকা বুড়ি! মাথা নেড়ে,হাত পা নেড়ে নাচের ভঙ্গিমায় কথা বলে! আর মুখে মিষ্টি হাসি লেগেই রয়েছে! তাঁর কথা বলার ভঙ্গি দেখে তার সঙ্গে মিশে যেতে চাইলাম!
আমি বললাম, হাওড়ার শিবপুরে আমার বাড়ি।টুলু তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো,' আরে ওখানেই তো আমার মামার বাড়ি। শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের ঠিক তার পাশে। ওখানেই আমার দিদা থাকেন । একা থাকে। খুব চিন্তা হয়।'। কথাগুলো বলে যেন খেই হারিয়ে ফেলে । খানিক চূপ করে থাকে ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,কি হলো, চূপ করে গেলে কেন ? বেশ তো বকবক করছিলে। হেসে বললাম, খুব ভালো লাগছিল। তোমাকে চূপ করে থাকলে মানায় না।
সে হঠাৎ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল ,জানো আমার দিদা বেশি দিন আর বাঁচবে না । খুব ভারী অসুখ। কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত বের হয় । এই তো কয়েক দিন আগে ই গিয়ে ছিলাম। আবার যাব আসছে শনিবার, বাবা বলেছে।
জানো,দিদা আমাকে খুব ভালো বাসে । কতো কিছু কিনে দিয়েছে । কত্তো দারুন দারুন খেলনা। তোমাদের ঐ শিবপুর থেকে কেনা! ওখানে গেলে আর আসতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু কি করবো বলো, ইস্কুলে যেতে হয় যে। তাই চলে এসেছি।
জানো,দিদার জন্য আমার খুব মন কেমন করে! কথা গুলো বলে আমার কোলে মাথা লুকিয়ে ফেলে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, তুমি তো ভালো মেয়ে। ভালো মেয়ে কাঁদে না। তা তোমার দিদাকে তোমাদের বাড়িতে এনে রাখো না।
পাকা বুড়ি সাথে সাথে ই বলে উঠলো,তা হলেই হয়েছে!দিদা তার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। ওটা যে দাদুর বাড়ি। দাদুর বাড়ি ছেড়ে কোথাও নাকি যেতে নেই।
ভাবুন, সত্তরোর্ধ্ব একজন বৃদ্ধার স্বামী নেই। একটি মাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। একা একা কষ্ট করে রোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন । তবু ও স্বামীর ভিটা ছেড়ে এনারা যেতে চান না। এনাদের দাম্পত্য জীবন এতোই মধুর যে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরা তাঁদের অতীত জীবনের রোমন্থন করেই কাটিয়ে দেন ! হাজার কষ্ট পেলেও !
0 Comments.