- 30
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
কিভাবে চলবে ঘোতনের? পড়ুন ১৪তম পর্বে…
ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে দীর্ঘদিন বাস করেছে ঘোতন। নেতা হত্যার কেসে জড়িয়ে তাকে গ্রাম, তথা জেলা তথা রাজ্য ছাড়া হতে হয়েছিল। যে নেতার কথায় ঘোতনের গ্যাং এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে গিয়েছিল সেই নেতাই নিজেকে বাঁচাবার জন্য ওদেরকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেবার সবরকম বন্দোব্যস্ত করেছিল। ভাগ্যিস, গ্যাং-এর কোনও এক এক সদস্য সমস্ত ব্যাপারটা সময় মত খবর পেয়ে সকলকে সতর্ক করে দেয়। ঘোতন তথা ওদের গ্যাং-এর প্রত্যেকেই এক পরিচিত ডাকাতের সহায়তায় ঝাড়খণ্ডের এক জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। পুলিশ চিরুনী তল্লাশি চালিয়েও ঘোতনদের কোনও ভাবেই খোঁজ পায়নি। কারণ ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে যে ডাকাতের আশ্রয়ে ঘোতনরা ছিল। সেখানে পুলিশদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাছাড়া কেউ যদি ওই জঙ্গলে প্রবেশ করত, তার কোনও খোঁজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা। এক্ষেত্রে ঘোতনরা এখানে আশ্রয় নেওয়ার পর ওদের কোনও খবর কেউ পায়নি। পুলিশ দু’সপ্তাহ খুঁজে ঘোতনদের ধরতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, ঘোতনদের দেখলেই যেন শুট এন সাইট করা হয়।
কেটে যায় প্রায় তিনবছর। নেতা হত্যার কেসও স্তিমিত হয়ে যায়, তার একটা প্রধাণ কারণ হল, যে নেতার আদেশে ঘোতনদের গ্যাং নারকীয় হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। সিবিআই তদন্তে সেই নেতা পরবর্তীকালে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে। এই কেসের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার জন্য নেতাকেই প্রধান অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করে পুলিশ কাস্টডিতে নিয়েছে। হত্যাকান্ডের সাথে যুক্ত ঘোতনদের গ্যাং-কে নিরুদ্দেশ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোতনরা সেই জঙ্গলে থাকার সৌজন্যে এই খবরটা জানতে পারেনি। কালক্রমে জঙ্গলের মধ্যেই তিনবছর কাটিয়ে দেয়।
ঝাড়খণ্ডে তিন বছর কাটানোর পর ঘোতন ছদ্মবেশে নিজের গ্রামে ফিরে সবকিছু জানতে পারে। গ্রামের পুলিশ আসার পর পাড়ার লোকেরা তাদের বাড়ি ভেঙে দিয়েছে, তার মা সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন ও না খেতে পেয়ে এই দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে পরলোকে পাড়ি দিয়েছে। বোনেরা যে যার শ্বশুরবাড়ী গিয়ে তাদের মা, দাদাকে ভুলে গেছে। তবে স্বার্থপর বোনদের কথা ভেবে ঘোতনের চোখের জল ফেলবার ইচ্ছাও হল না। একরাশ ঘৃণা নিয়ে সে নিজের গ্রামে নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘরেই ফিরে আসে। সেখানেই বাস করতে থাকে। কিন্তু পেট চালাতে হবে, কখনো কখনো বিভিন্ন উৎসবে যোগদান করে সেখানে কাজ করত, ড্রাইভারের কাজও করত। আবার মাঝে মাঝে তার গ্যাং-এর লোকেদের সাথে মিলিত হয়ে টুকটাক চুরি করত। ছোটখাটো কিডন্যাপও করে অর্থ উপার্জন করত। তবে পুলিশের হাতে পড়ার মত কোনো বড় কাজ করত না। যদি কোনও ঝামেলার সম্ভাবনা দেখা দিত, তখনই তারা নিজে থেকেই সতর্ক হয়ে সমাধান করে নিত। তবে ওরা কলকাতার বুকে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
ঘোতন তার মায়ের কথা ভেবে ভীষণ মন খারাপ করে। তার বোনেদের কাছে গিয়ে আশাহত হয়ে ফিরে এসেছে। যে বোনদের ঘোতন বিয়ে দিয়েছে। তারা ঘোতনকে নিজের ভাবতে অস্বীকার করে। এইভাবে কেটে যায় বছর দুই। একদিন ঘোতন ঘুরতে গিয়েছিল কলকাতায়। সেখানে পার্কে দেখতে পায় ছোট্ট বিট্টুকে। বিট্টুর চেহারা ও পোশাক দেখে ঘোতন ওকে কিডন্যাপ করার পরিকল্পনা করে। কারণ দীর্ঘদিন তার হাতে কোনও কাজ নেই। অভাবের তাড়নায় সে গ্রাম থেকে বাধ্য হয়ে কলকাতায় আসে। বিট্টুকে দেখে বিরাট অংকের টাকা প্রাপ্তির আশায় ওর দুটি চোখ লোভে চকচক করে।
------------
বিট্টু, ঘোতনের সাথে সারাদিন গ্রামে ঘুরল। গ্রামের মধ্যে আজ সে দারুণ উপভোগ করেছে। ঘোতনের বাড়ি ফিরে এসে বিট্টু বন্দুক দিয়ে বেলুন হিট করে যে রিমোট চালিত গাড়িটি পেয়েছে, সেটা হাতে নিয়ে বেশ খুশি মনে সে গাড়িটি চালাতে লাগল। গাড়িটির আওয়াজে ঘোতন বেশ বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই ছোড়া তুই গাড়ি চালানো বন্ধ কর। এই আওয়াজ শুনে গ্রামের লোক চলে আসবে। আমাকে হাজার কৈফিয়ত দিতে হবে। একটা কাজ কর, তুই তোর বাবার মোবাইল ও ঠিকানাটা আমাকে বল। আমি তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব”
ঘোতনের কথায় বিট্টু পাত্তা না দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ঘোতন কাকু, তুমি খুব ভালো। তোমার জন্য আজ গ্রামের মধ্যে কত কি দেখলাম! যা আগে আমি দেখিনি। কি সুন্দর। আমি এখান থেকে আর কখনও যাবো না। তোমার কাছেই থাকব”
“মামার বাড়ির আবদার! একেবারে নবাব পুত্তুর। পড়াশোনা করবি না? তাছাড়া, তোর খরচ কে চালাবে শুনি?”
“সে বাবার থেকে চেয়ে নেবে তুমি, আর বাবাকে বলবে, আমি থাকব তোমার কাছে। আর বাড়ি ফিরব না”
ঘোতন যত ভাবে বিট্টুর সাথে খারাপ ব্যবহার করবে এবং ওর বাবার থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা আদায় করবে। কিন্তু বিট্টুর কথায় বারবার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ঘোতন মনে মনে ভাবল,
“না, ছেলেটার সাথে বাজে ব্যবহার করলে চলবে না। ওর সাথে নানা ছলা কলায় আসল কাজটা অর্থাৎ ওর বাবা মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে নিতে হবে। ওকে আটকে রেখে অনেক টাকা হাতিয়ে নিতে হবে”
একমাত্র মিষ্টি ব্যবহার করে উদ্দেশ্য সাধন করবে। ঘোতনের সাথে বিট্টু দারুণ ভাবে মিশে গেছে। তাই বিট্টুর মত করে চলাই ভালো। বিট্টু ওর বাড়ির ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার এখনো পর্যন্ত বলেনি। ওকে চটিয়ে লাভ নেই। পরক্ষণেই ঘোতন ভাবতে থাকে, গ্রামের বেশ কিছু লোক বিট্টুকে ঘোতনের সাথে দেখেছে। যদি গ্রামের লোক সন্দেহ করে, বিট্টুর খোঁজ করতে চলে আসে। লোকাল থানায় যদি জানিয়ে দেয়। তাহলে কি হবে? বিট্টু যত তাড়াতাড়ি জানাবে ততই মঙ্গল। বেশী সময় দেওয়া যাবে না। একপ্রকার বাধ্য হয়ে ঘোতন বিট্টুকে জোর করল,
“এই বিচ্ছু ছেলে। তুই আগে তোর বাবার নাম্বারটা দে। আমার কাছে তোর খাবারের টাকা নেই। না খেতে পেয়ে একেবারে মরে যাবি তো”
“সে তুমি আমাকে যা খাওয়াবে আমি তাই খেয়ে নেব, কিন্তু আমি বাবার কাছে একদম যাব না”
ঘোতন খুব বিরক্ত হয়ে বিট্টুর কান ধরে জোর টান দিল। বিট্টু ককিয়ে উঠল। বেশ জোরে কাঁদতে লাগল। ঘোতন ওর কান্নার আওয়াজে বিভ্রান্ত হয়ে বিট্টুকে জোর হাতে বলল,
“চুপ কর লক্ষী ছেলে আমার। এখন কাঁদিস না। গ্রামের লোক এক্ষুণি চলে আসবে। বিপদে পড়ে যাব”
ঘোতনের কথা শুনে বিট্টু চুপ করে গেল। কিন্তু ঘোতনের চিন্তা হতে লাগল, কি করবে সে কিছুই বুঝতে পারে না…
দু’দিন কোনওরকম ভাবে কেটে গেল। ঘোতনের কাছে জমানো টাকা কমে আসছে। বিট্টুকে নিজের হাতে সামান্য কিছু রান্না করে নিজে অভুক্ত থেকেছে। একদিন ওর গ্যাং-এর কিছু পুরনো সাথীদের থেকে সামান্য টাকা ধার করে দুপুরের রান্না সম্পন্ন করে ঘোতন আর বিট্টু একসাথে খেয়ে উঠে বিশ্রাম নিচ্ছিল। নানা চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে ঘোতনের চোখ দুটো লেগে গেল। সে পুরোপুরি ঘুমে আচ্ছন্ন। বিট্টুর চোখে ঘুম আসেনি। সে তার রিমোট গাড়িটা নিয়ে খেলছিল। হঠাৎ কি একটা হিস হিস শব্দ পেল। শব্দটা শুনেই বিট্টু চঞ্চল হয়ে উঠল। হঠাৎ নজরে এল, একটা বিষধর সাপ কোথা থেকে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, ধেয়ে আসছে ঘোতনের দিকে। বেশ ভয় পেয়ে গেল সে। চিৎকার করতে যাবে, মনে পড়ল বইতে সে পড়েছিল। সাপ এমনিতে কিছু দেখতে পায়না। তবে ওর সামনে কেউ নড়াচড়া করলে ছোবল দেবার চেষ্টা করে। ঘোতনকাকা ঘুমোচ্ছে। এখন চিৎকার করলেই ঘোতনকাকার ঘুম ভেঙে যাবে। তাই সে ভাবতে লাগল, কি করা যায়… সাপটা ক্রমাগত ঘোতনকাকার দিকে এগিয়ে আসছে। কিছু একটা উপায়ে সাপটাকে আটকাতে হবে। ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল একটা কাঠের ছোট তক্তা ছিল। ভাবামাত্রই সে ছুটে গেল তক্তার দিকে। সাপটা ঘোতনকাকার কাছে আসার আগেই কিছু একটা করতে হবে। ভাবনার সাথে সাথেই বিট্টু, কাঠের তক্তাটা ছুড়ে দিল সাপটার দিকে। আওয়াজ শুনে ঘোতন ধরফর করে উঠে পড়ল…
-----------
এরপর কি হবে?... পরের ১৫তম পর্বের অপেক্ষায় থাকুন…
0 Comments.