- 11
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
কিভাবে চলবে ঘোতনের? পড়ুন ১৫তম পর্বে…
বিট্টু দেখল, তার ঘোতনকাকার ঘোর বিপদ। সে বেঘোরে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। বিষধর সাপটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। বিট্টু বুদ্ধি করে একটা কাঠের তক্তা ছুড়ে দিল সাপটার দিকে। মাটিতে পড়ে কাঠের তক্তার আওয়াজে ঘোতন ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। দেখল একটা সাপ। ঘোতনের পিলে চমকে যাবার অবস্থা। ঘুমের ঘোর কেটে গেল। সাক্ষাৎ যমরাজ যেন সামনে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। আজ বিট্টুর জন্য প্রাণে বেঁচে গেল সে। ধাতস্থ হতে বেশী সময় না নিয়ে ঘোতন একটা লম্বা লাঠি জোগাড় করে সাপটাকে ঘর থেকে বের করে দিল। ঘরে এসে বিট্টুর দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বিট্টু ভাবছে, ঘোতনকাকার মনে আবার কি এল… সে এখন ওকে কি করবে বা বলবে? কিন্তু ঘোতন সব প্রশ্নকে নস্যাৎ করে বিট্টুকে জড়িয়ে ধরল,
“বিট্টুসোনা, সত্যিই তুই আমার মাণিক রে। তোর এই ঘোতনকাকার প্রতিজ্ঞা, তোকে কথা দিলাম, তোর কোনো ক্ষতি আমি করব না। এমনকি তোর কোনও ক্ষতি হোক, তাও চাইব না। কেউ যদি তোর ক্ষতি করতে আসে, তাকে আমি দেখে নেব। তুই যতদিন পারিস, থাক আমার কাছে আর এই কাকুটা তোর কোনো উপকারে লাগলে অবশ্যই বলিস”
ঘোতন আবেগপ্রবণ হয়ে গেল বিট্টুর প্রতি। বিট্টুকে খুব আদর করে দিল। বিট্টুও ঘোতনের আদর পেয়ে কেঁদে ফেলল। এইভাবে আদর ওর মা ওকে করত। এমনকি হরিদাদুও যতদিন ওর কাছে ছিল ওকে ভীষণ আদর করত। আর হ্যাঁ, বাবাও করত, কিন্তু নতুন মা’র (রত্না নামে মেয়েটার) আগমনে বাবা আর ভালোবাসে না। বিট্টু এবার বলল,
“তোমার আদর খেয়ে আমার বাবা-মা’র কথা খুব মনে পড়ে গেল ঘোতনকাকা। তুমি আমার বাড়ির ঠিকানা ও বাবার মোবাইল নাম্বার চেয়েছিলে। যতটুকু মনে আছে। আমি তাই দিচ্ছি”
বিট্টু এবার ঘোতনকে ওর বাড়ির ঠিকানা এবং বাড়ির ল্যান্ডলাইন নাম্বার দিল। কারণ এই নম্বরটাই ওর মুখস্থ ছিল। বাবার মোবাইল নাম্বারটা ওর মনে নেই। আর একটা নাম্বার ওর মুখস্থ ছিল। সেটা হরিদাদুর নাম্বার। বিট্টু সেই নাম্বারটা ঘোতনকে দিল না। পরে দেওয়া যাবে। ঘোতন বিট্টুকে বলল,
“তোর নাম্বারটা পেলাম। এবার তুই আমাকে বলতো বিট্টুসোনা! রাতের অন্ধকারে তুই পার্কের মধ্যে কেন এসেছিস? বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস। তোর বাবা-মা নিশ্চয়ই চিন্তা করছে। আমি আগামীকালই তোকে বাড়ি দিয়ে আসব। কারণ এখানে থাকাও নিরাপদ নয়। গ্রামের কিছু লোক সত্যিই ভাবছে, তোকে আমি কিডন্যাপ করে এখানে রেখেছি। কিছু বাড়াবাড়ি হওয়ার আগেই তোকে আমি তোর বাবা-মা’র কাছে রেখে আসি। আমার আর টাকার দরকার নেই”
ঘোতনের কথা শুনে বিট্টু মনমড়া হয়ে বসে রইল। সে কি বলবে ঘোতনকে? এই ঘোতন কিছুতেই বিট্টুর মানসিকতা বুঝতে চাইছে না। প্রথমদিন থেকেই শুধু বলে যাচ্ছে, বাবা-মা’র কাছে রেখে আসবে। বিট্টু বেশ বিরক্ত সহকারে বলল,
“আমাকে বাড়িতে রেখে আসলে তোমার খুব আনন্দ হবে বুঝতে পারছি। ওই বাড়িতে একটা দুষ্টু মেয়ে আছে। যে আমার বাবাকে মিথ্যে কথা বলে, আমাকে মার খাওয়ায়। আমার কেউ নেই। আমার মা নেই গো, ঘোতনকাকা। বাড়িতে গেলেই আমাকে মেরে ফেলবে দুষ্টু মেয়েটা”
“মানে? কি বলছিস তুই?”
বিট্টু এবার ঘোতনকে ওর মা-বাবা-দাদু ও ঠাম্মার সাথে কাটানো দিনগুলোর কথা বলল। ওর মা-দাদু ও ঠাম্মার এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার কথা, এর জন্য দুষ্টু রত্নার কারসাজি আছে সে কথাও বলল। এই রত্না ওর জীবন নাজেহাল করে দিয়েছে, হরিদাদু এসে ওর সাথে থেকে তার জাহাজে চাকরিজীবনের কথা গল্প করেছে। সব কথা বিট্টু ঘোতনের কাছে সবিস্তারে জানাল। বিট্টুর জীবনে ঘটে যাওয়া সব কিছু জানার পর ঘোতন বিট্টুকে কথা দিল,
“আজ থেকে এই ঘোতনকাকু তোর জন্য জান দিয়ে দেবে। কথা দিলাম বিট্টু, তোর নায্য অধিকার তোকে ফিরিয়ে দেব”
কিভাবে বিট্টুকে ওর বাবার কাছে ওর অধিকার নিয়ে ফিরিয়ে দেবে, ঘোতন জানেনা। কিন্তু বিট্টুর ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের মনে প্রতিজ্ঞা করল,
“সারাজীবন অনেক অন্যায় কাজ করেছি। কিন্তু এই ছোট্ট ছেলেটাকে আমি ওর নায্য অধিকার সমেত ফিরিয়ে দেব। এর জন্য যা যা করার আমি তাই করব”
ঘোতনের এই চিন্তার মাঝেই কে যেন বাড়ির দরজায় কড়া নেড়ে জোর গলায় বলল,
“এই ঘোতন ঘরে আছিস। বাইরে বেরিয়ে আয়, হতভাগা। একটা বাচ্চা ছেলেকে তোর কাছে আটকে রেখেছিস আমরা খবর পেয়েছি”
কথাটা শুনে ঘোতন বেশ অবাক হয়ে গেল। এ কার গলা? সে অতি সন্তর্পনে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই দেখল, গ্রামের ধনী লোকেদের মধ্যে একজন মাধব, যার জুয়েলারীর ব্যবসা আছে। ঘোতন একবার ওদের বাড়িতে ডাকাতি করার জন্য ওর গ্যাং-দের বলেছিল। সেই মাধব হল ঘোতনের শত্রু। শুধু মাধব নয়, বাকি দু’জন, স্কুল মাস্টার সুবোধ এবং মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী নরেনও ঘোতনের চিরশত্রু। তারা ঘোতনের বাড়িটা নিজেদের দখল করার জন্য পরিকল্পনা করেছিল। যখন পুলিশের হাত থেকে বাঁচবার জন্য ঘোতন তিনবছরের জন্য ঝাড়খণ্ডে চলে গিয়েছিল। গ্রামের লোকেদের ক্ষেপিয়ে এরা ঘোতনের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল। ওর মা’কে আশ্রয়হীন করে দিয়েছিল। ওরা ঠিক করেছিল, ঘোতন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। ওদের বাড়িটাকে নিজেদের হস্তগত করে এখানে একটা গেস্ট হাউস করে রাখবে। শহর থেকে লোকেরা পিকনিক করতে আসলে এই জায়গাটা গেস্ট হাউস করে ভাড়া খাটিয়ে ভালো রোজগার করবে। কিন্তু পরে ঘোতন ফিরে এসে ঘরটিকে আশ্রয়ের উপযুক্ত করতেই ওদের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়। তবুও ওরা তালে ছিল কিভাবে ঘোতনকে এই গ্রাম থেকে তাড়িয়ে এই জায়গাটা জবরদখল করা যায়। তাদের কাছে একটা সুযোগ এসেছে। দীর্ঘদিন বাদ ঘোতনের সাথে বাচ্চাটাকে দেখে ওরা ভেবে নিয়েছে, ঘোতন নিশ্চয়ই কিছু একটা খিচুড়ি পাকিয়েছে। মাধব এসে ঘোতনকে জিজ্ঞাসা করছে,
“এই বাচ্চাটা কে? আবার নতুন করে কি করতে চাইছিস? তোর জন্য গ্রামে আবার পুলিশ আসবে। এ মেনে নেওয়া যায় না। আমরা লোকাল থানায় খবর দিচ্ছি। সত্যি করে বল”
“এই বাচ্চাটা আমার আত্মীয়। আমি শহরে একটা বাড়িতে কাজ করি। সেই বাড়ির কর্তা আমার দাদা। বাচ্চাটার পরীক্ষা হয়ে গেছে। তাই আমাদের গ্রামে ঘুরতে এসেছে”
“এই সব গপ্প অন্য কাউকে শোনাবি। আমি পুলিশকে নিয়ে আসছি। পুলিশ দুই ঘা দিলেই সব সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে”
বিট্টু সব কথা শুনেছে। সে এবার নিজে থেকে বেরিয়ে এসে বলল,
“কেন তোমরা আমার ঘোতনকাকাকে ডিস্টার্ব করছ? সত্যি কথা বলাতে বিশ্বাস হচ্ছে না? এই গ্রামটা সত্যিই খুব সুন্দর। আমি তোমাদের গ্রামে ঘুরতে এসেছি”
বিট্টুর কথা শুনে মাধব বেশ চমকে গেল। তবুও হাল ছাড়ার পাত্র নয় সে।
“নিশ্চয়ই তোকে শিখিয়ে দিয়েছে। যাক গে, আমি পুলিশ নিয়ে আসছি। তারপর সব ব্যবস্থা করছি”
মাধবরা চলে গেল। ঘোতন বিপাকে পড়ে গেল। বিট্টুকে নির্ভাবনায় বাড়িতে পৌঁছানোর কথাই সে চিন্তা করছিল। হঠাৎ করেই পাড়ার লোকেরা এমন অশান্তি বয়ে আনতে চলেছে। কি করবে সে? বিট্টুর কি হবে? না, সে কিছু ভাবতে পারছে না। বিট্টুকে এইভাবে ছেড়ে দিলে হবে না। বিট্টুর সামনে মহাবিপদ অপেক্ষা করে আছে। সে বাড়ি ফিরে গেলেও নিরাপদ নয়। সেখানে সেই দুষ্টু মেয়ে অর্থাৎ রত্না আছে, যে বিট্টুর ক্ষতি চায়। এই মুহূর্তে বিট্টুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। ঘোতনের মনে অজানা আশংকা চলে এল।
বিট্টু বলল,
“ঘোতনকাকা আমি একজনের কথা তোমাকে বলতে পারি। যে আমাকে বলেছিল, দরকার হলে ওনাকে কল করে যোগাযোগ করতে”
“কে সে?”
“আমার হরিদাদু গো”
“তার বাড়ি কোথায়?”
“কলকাতার যাদবপুরের দিকে থাকে। আমাকে ঠিকানা দিয়েছে। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে সেখানে?”
“ঠিক বলছিস তো বিট্টুসোনা”
এরই মধ্যে ঘোতনের এক পরিচিত বন্ধু এসে বলল,
“ঘোতন, এক্ষুণি এখান থেকে পালিয়ে যা”
-------------------
সামনে এল নতুন বিপদ। ঘোতন কি করবে? পড়ুন পরের ১৬তম পর্বে…
0 Comments.