- 27
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
ঘোতনের কাজকর্ম কেমন ধরণের, সেটা জানতে পড়ুন ১৩তম পর্বে
ঘোতনের দল কলকাতার এক প্রভাবশালী নেতার সংস্পর্শে আসে। সেই নেতার পরামর্শ মত বিভিন্ন অসামাজিক কাজকর্ম কাজে লিপ্ত হয়েছিল। নেতার অধীনে থেকে ঘোতনের দলের কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পায়। কলকাতায় মাঝে মাঝেই বড়লোকদের বাড়িতে ডাকাতির খবর বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। ঘোতনের গাং-য়ের মূল কাজকর্মই হল শহর তথা গ্রামের বিত্তশালী পরিবারে গিয়ে ডাকাতি করা। এছাড়াও রাস্তাঘাটে ছিনতাই, পকেটমারী তো ছিলই। হয়তো ওদের দলের কেউ পুলিশের জালে ধরা পড়ত। কিন্তু নেতার হাত থাকায় অন্যায় করেও ছাড়া পেয়ে যেত। দিন দিন ঘোতনদের অসামাজিক কাজকর্ম বৃদ্ধি পেতে থাকল। ঘোতনের পরিবারও বেশ আর্থিকভাবে সক্ষম হয়ে উঠেছিল। ঘোতন নিজের দায়িত্বে দুই বোনের বিয়ে দিয়েছিল। বাড়ির সবাই জানে, ঘোতন কলকাতায় কোনও ভালো কাজকর্ম করে। দুই বোনের বিয়ে হওয়াতে ঘোতনের মাও অনেকটা নিশ্চিন্ত হল।
পাড়ায় ঘোতন যখন ফিরে আসত, সকলেই সমীহ করত বটে, কিন্তু ওর কাজকর্মের ব্যাপারে নানা লোকের নানা মত ছিল। পাড়ার বৃদ্ধের দল বলত,
“বাবা যেমন চুরি করত। ছেলেও তাই করে”
প্রত্যুত্তরে কোনও একজন বলত,
“আরে ওর বাবা চুরি করে কি ইনকাম করত? সেই তো অভাবেই থাকত। কিন্তু ঘোতনের জন্যই ওর দুই বোনের ভালো জায়গায় বিয়ে হয়েছে। সেটা নিশ্চয়ই দেখেছ। তাছাড়া এখানে একটি মুক্তস্কুল খুলেছে। শুনলাম, সেখানে নাকি ঘোতন বেশ কিছু টাকা অনুদান করেছে”
“রাখতো, ঐ সব অনুদান অনেক দেখেছি। মোদ্দা কথা, চোরের ব্যাটা চোরই হবে”
অতএব, ঘোতন যাই করুক না কেন, বাবার সূত্রে সেও চোরের ব্যাটা চোর। ছোট থেকে এই অপবাদ শুনে আসছে। সে নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, চুরি না করেই ছোট্ট থেকে চোরের অপবাদ পেয়েছি। সেই অপবাদ না হয় চুরি করেই হোক। তবে যারা ওকে চোর অপবাদ দিয়েছে, তাদের বাড়িতেই সে চুরি করবে। ঘোতনের রাগ হত। কাউকে কিছু বলত না। গ্যাং-এর মধ্যে ও সেই সব পাবলিকদের বিস্তারিত জানিয়ে দিল। ঘোতনের গ্যাং সুযোগ বুঝে সেই সকল বাড়িতে হানা দিয়ে যাবতীয় জিনিস ও টাকা চুরি করে নিয়ে আসত। এইসব চুরির পেছনে ঘোতনের হাত রয়েছে, পাড়ার কেউ ঘূণাক্ষরেও টের পেতনা। পাড়ার সেইসব পাবলিকদের বাড়িতে চুরি করে গোপনে ঘোতনের উপার্জন হয়ে যেত। পরবর্তীকালে ঘোতন ওর গ্যাং-এর সাথে মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় কলকাতায় নানা দুষ্কর্মে জড়িয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। কলকাতায় থাকাকালীন ঘোতন মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতে আসত। বেশীরভাগ সময়েই বাড়িতে এসে মায়ের সাথে গল্প করত। মায়ের সাথে সুখ-দুঃখের কথা শুনত। বোনেদের বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। পাড়ায় ঘোতন বেরিয়ে গেলে অনেকেই ওর সাথে যেচে কথা বলতে আসে। সে অল্পকথায় উত্তর দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যেত। ঘোতন পাড়ার কাউকে দেখতে পারে না। যতটুকু সম্ভব ও কম কথা বলে। বহুদিন পর পাড়ায় এসে নিজের গ্যাং-এর সদস্যদের সাথে আলোচনা করে স্থির করল, নিজের পাড়ায় সবচেয়ে ধনী পাবলিক কে কে আছে? সেই সব বাড়িতে চুরি করবে।
ঘোতনের তিনজনের কথা খুব মনে পড়ে। যাদের জন্য ছোটবেলায় ওর বাবার মৃত্যু ঘটেছিল। বাবাকে মিথ্যে বদনাম দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। ওর বাবা চুরি করত ঠিক কথা। কিন্তু পাড়ার মধ্যে কখনোই নয়। ওর বেশ মনে আছে, বাবা নেশা করে বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়েছিল। সেই সময় তিন মূর্তি, যারা পাড়ার মাথা ছিল, দলবদ্ধভাবে এসে ওর বাবাকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে বেধরক মারধোর করে। বাবা তৎক্ষনাৎ মারা যায়। পাড়ায় সব্বাই ওর বাবাকে চোর অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলে। কেউ প্রতিবাদটুকু করেনি। সেই তিন মূর্তি অর্থাৎ মাধব, সুবোধ ও নরেনের বাড়িতেই ডাকাতি করার পরিকল্পনা করে। ঘোতন একে একে সবার খবর জোগাড় করে ওর গ্যাং-এর কাছে সরবরাহ করে। প্রত্যেকের বাড়িতে ডাকাতি করার পরিকল্পনা করে। পাড়ায় বেশ কিছুদিন থেকে সমস্ত খবরাখবর নিয়ে সে কলকাতায় ফিরে যায়। মাধবের জুয়েলারী ব্যবসা। প্রচুর টাকা উপার্জন করেছিল। গ্রামের মধ্যে তিনটে বড় বাড়ির মধ্যে ওর একটা। ঘোতনের গ্যাং-এর পাবলিকরা একদিন সেই বাড়িতে রাতের বেলায় হানা দেয়। বাড়ির মহিলাদের একটা ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। মাধবকে একটা চেয়ারে বেঁধে রেখে ওকে ভয় দেখিয়ে আলমারি থেকে বেশ কিছু গহনা ও বিশাল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে কলকাতায় চলে যায়। পরের দিন পুলিশ আসে। কিন্তু কিছু সুরাহা হয় না। ডাকাতির কোনও কুল কিনারা খুঁজে পাইনি। ঘোতন কলকাতায় নিজের হিস্যা বুঝে নিয়েছিল। এরপর বেশ কিছুদিন অন্তর একে একে স্কুলের মাস্টারমশাই সুবোধ এবং মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী নরেনের বাড়িতেও ডাকাতি করে। প্রত্যেকেই জানতে পারেনি এই ডাকাতির পেছনে ঘোতনের হাত রয়েছে।
কিন্তু ঘোতনের অর্থ প্রাপ্তির সুখ সহ্য হল না। একদিন হঠাৎ বাড়িতে পুলিশ এল। তবে স্থানীয় এলাকার পুলিশ না। একেবারে কলকাতা থেকে খোদ পুলিশের বড় কর্তারা এবার এসেছে ঘোতনের বাড়িতে…
কি হয়েছে? সেই ঘটনায় যাওয়া যাক…
যে নেতার ছত্রছায়ায় ছিল ঘোতনরা। সেই নেতা তার বিরোধী পক্ষের নেতাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। তার ভার পড়ে ঘোতনের গ্যাং-এর ওপর। ঘোতন প্রাথমিকভাবে সেই হত্যা করার পরিকল্পনায় রাজি হয়নি, সে নেতাকে বলেছিল,
“আমরা খুন করিনা। মাঝে মাঝে টুকটাক মারপিট, দাঙ্গা হলে ঠিক আছে। কিন্তু কাউকে খুন করার কথা ভাবতে পারি না”
“আমি আছি যখন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমি আগামী ভোটে জিতে মন্ত্রী হব। বিরোধী নেতা বড্ড বেশী বাড়াবাড়ি করছে। তাকে সরিয়ে দিতে পারলেই আমার মন্ত্রী হওয়া আটকাবে না। তাছাড়া তোদের অবস্থারও উন্নতি হবে”
ঘোতন রাজি না হলেও ওর গ্যাং-এর অনেকের এই পরিকল্পনায় সামিল হবার ইচ্ছা ছিল। ওর গ্যাং-এর অধিকাংশর ইচ্ছায় ঘোতন বাধ্য হল। বিরোধী নেতার বাড়িতে ঘোতনরা ছয়-সাতজন চড়াও হল। সেই নেতাকে গুলি করে খুন করা হল। ঘোতনদের যে নেতা খুন করার পরিকল্পনা করেছিল সেই শেষপর্যন্ত ডিগবাজি খেয়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ঘোতনদের নাম পুলিশের কাছে বলে দিল। খুন করে ঘোতনরা যে যার বাড়ি চলে এসেছিল। কিন্তু দরকারি কাজে ঘোতন বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যায়। ঘোতনের বাড়িতে কলকাতার পুলিশের কর্তারা এসে খোঁজখবর শুরু করে। সেই সময় বাড়িতে ওর মা শুধু ছিল। ওর মা কিছুই বলতে পারেনি। গ্রামে এসে পুলিশের দল ঘোতনকে তন্ন তন্ন করে খোঁজে। শেষপর্যন্ত খুঁজে না পেয়ে ওর মাকে একপ্রকার শাসিয়ে চলে যায়।
ঘোতন সেই সময় ওর গ্যাং-এর এক সদস্যের বোনের বিয়েতে বর্ধমান জেলায় ছিল। সেখানেই সে খবর পায় নেতা পালটি খেয়ে ওদের নাম পুলিশের কাছে বলেছে। নিজের পলিটিক্যাল কেরিয়ার বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই সেই নেতা এই কাজটি করেছে। ঘোতন ও ওর গ্যাং-এর লোকেরা বিয়েবাড়ি ছেড়ে ঝাড়খণ্ডের দিকে পালিয়ে যায়। পুলিশ সারা জায়গায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু ঘোতনদের কাউকে খুঁজে পায়না। শেষমেশ সেই নেতার কারসাজিতে সরকার থেকে অর্ডার দেওয়া হয়, ঘোতনদের গ্যাং-এর কাউকে দেখতে পেলেই যেন গুলি করে মেরে দেওয়া হয়। দীর্ঘ তিন বছর ঘোতন বাড়ি তথা রাজ্য ছাড়া হয়ে ঝাড়খণ্ডে বাস করে।
এদিকে পুলিশ চলে যাওয়ার পর ঘোতনের বাড়িতে পাড়ার লোকেরা জমায়েত হয়ে ওদের বাড়ি ভেঙে দেয়। ওর মা আশ্রয়হীন হয়ে যায়। ঘোতনের বোনেরা ওর মাকেও আশ্রয় দেয়নি। আশ্রয়হীন হয়ে, দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে ঘোতনের মা একদিন ইহলোক ত্যাগ করে। ঘোতন, ঝাড়খণ্ডে ড্রাইভারের কাজ করত। মুটে মজুরের কাজ করত। দীর্ঘ তিনবছর পর ঘোতন ছদ্মবেশ ধারণ করে ফিরে আসে নিজের গ্রামে। এসে দেখে সবকিছু শেষ। ওদের বসতবাড়ি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। গ্রামের এককোণে ওদের বাড়িটা ছিল। সেখানে সে লুকিয়ে থাকে। এমনকি ঘোতন নিজের বোনেদের কাছেও লুকিয়ে যায়। কিন্তু বোনেরা ঘোতনকে চিনতে অস্বীকার করে। মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে,
“বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরোনোর সুযোগ হয়নি। তাছাড়া মায়ের খোঁজ নিয়ে কি হবে? যে আমাদের ভালোভাবে খেতে দেয়নি, তাকে দেখে কোনো লাভ নেই”
--------------------
এরপর অপেক্ষায় থাকুন ১৪তম পর্বের...
0 Comments.