- 20
- 0
ডাকঘরে খোলাচিঠি
শ্রদ্ধেয় কবি আল্ মাহমুদ /
শরতের প্রসণ্ন এক সকালে আমাদের খুলনার বর্ষীয়ান কবি, কবি বিষ্ণুপদ সিংহ তাঁর সার্বক্ষণিকের সঙ্গী দ্বিচক্রযান রথের চাকা থামিয়ে অত্যন্ত নীচুস্বরে ফিসফিস করে বলে গেলো, "তোমার চলে যাওয়ার চিঠি এসে গেছে!"
শুনে কবি ফরিদ আহমেদের রংঘরে সাজিয়ে রাখা কৌটার মতন বসে থাকা কয়েকসার কবিদের ছত্রিশ ইঞ্চি ব্যসার্ধের হৃৎপিণ্ড থেকে ছলকে উঠলো একরাশ তাজা রক্ত। কৌটার রঙের মতন টকটকে লাল!
আমার প্রসণ্ন সকালটা সাদা জুঁইফুলের শুভ্র সুবাসিত মৌতাত নিয়ে সকালের সোনারোদ্দুর গায়ে মেখে ফুল মার্কেটের ফুল দোকানীদের তরতাজা ফুলে বসা সব রঙিন প্রজাপতির মত ডানা মেলতে উন্মুখ হয়ে ছিলো।
কেন জানি সহসা মরা বিকেলের বিষণ্নতায় ভরে গেলো
ডাঙায় তোলা সদ্য ধরা মাছের মতন খাবি খেতে শুরু করলাম। সে কোন অজানা সুতোর অচেনা বাঁধনে বেঁধেছিলাম দু'জনে বলেই বুঝি এমন হলো।
প্রিয় আল্ মাহমুদ /
তোমার কি মনে পড়ে , সেই যে সেবার- আমার কিশোর
তখন আমার কিশোর বয়সেের বেলা ; তুমি এসেছিলে কবিতার ছন্দ তুলে। বলেছিলে, ''তোমার মায়ের নাকের নোলক হারিয়ে গেছে তিতাস নদীর বাঁকে!!"
তোমার সেই আর্তনাদ মাখা আকুতি শুনে আমার কিশোর হৃদয় কেঁদে উঠেছিলো। সে কোন অজানা বেদনায় আমার দু'চোখ হয়েছিলো সিক্ত। তখন থেকে আমি ইছামতী, বেত্রবতী, কপোতাক্ষ, পদ্মা আর ভৈরব থেকে শুরু করে আমাদের রূপসা নদীর আঠারো বেকীঁ'র বাঁকে বাঁকে আজও খুঁজে বেড়াই ; যদি তোমার মায়ের সেই নোলকটা পাওয়া যায়!
বন্ধু রূপা, অতশী, পিয়া, মিতু আর বয়সী কবি সুন্দরী দুলুখালার মতন সমস্ত বাঙালী নারী, এমনকি আমার প্রিয় সোনাবউ রুখমিনার নাকেও খুঁজে দেখেছি। যদি ওরা সেই নোলকটা কুড়িয়ে পেয়ে নিজেদের নাকে পরে ফেলে। বেশ ভালো করে চেয়ে দেখেছি! নাহ্, ওরা কেউ খুঁজে পায় নি তোমার মায়ের নাকের নোলক!
পদ্মার রূপোলী ইলিশের কাছে শুধাবো বলে আমি ঘোলা জল ভেঙে ভেঙে পশুর, কালীগঙ্গা আর শিবসা নদী পেরিয়ে আমার ভালোবাসার নদী শিপ্রার কাছে গিয়েছি। অসময়ে আমাকে দেখে শিপ্রা তার ভরা বুকে জোয়ারের ঢেউ তুলে, মুখে সলাজ হাসি ছড়িয়ে দিয়ে, আঁচল টেনে অভিমানের ঠোঁট ফুলিয়ে বললে, "সেই তো এলে বন্ধু! তবে এতদিন পরে!"
শিপ্রার ছল বুঝতে পেরে তাকে খুলে বললাম তার কাছে আসবার প্রকৃত কারণ। শুনে আহত শিপ্রা থতমত খেয়ে একরাশ জল ভেঙে মৃদু হেসে জানালো, "নদীর জলে এখন নিত্যই চলে কারেন্ট জালের দৌরাত্ম্য! ভয় পেয়ে তাই মাছেরা চলে গেছে মাঝ সাগরের জলে। নোলক পরার সময় তো এখন আর মাছেদের নেই। নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই মাছেরা এখন হিমসিম খাচ্ছে গো বন্ধু!"
শিপ্রা আমায় ফিরিয়ে দিলো শূণ্য হাতে। তবু আজও আমি আশা ছাড়িনি। আমি আজও খুঁজে ফিরি হাজার নদীর বাঁকে বাঁকে, তোমার মায়ের অমূল্য সেই নোলক!
প্রিয় আল্ মাহমুদ /
আমি অখ্যাত এক অজ পাড়া গাঁয়ে থাকি বলে তোমার সাথে ভালো করে কথা বলার সুযোগই হয়নি আমার।
ভেবেছিলাম এবারের বইমেলায় তোমাকে পেলে আমি আমার সকল কাজের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে নেবো! সে সুযোগ টা তুমি বুঝি দেবে না আমাকে আর; তার আগেই চলে যাবে তুমি তোমার প্রিয় গুরু শামসুর রাহমানের কাছে। তাঁর সাহিত্য সভায়,কবিতার আসরে। যেখানে ভীড়সম জমিয়ে অনেক আগে থেকেই বসে আছেন-: দান্তে, বায়বণ, বাল্মিকী, রবীবাবু, নজরুল, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আর সমুদ্রের মতন গুণীজনেরা।
জানি আল্ মাহমুদ /
তোমার মনে আনমনে আক্ষেপ ছিলো, শামসুর রাহমানের সাথে গুরুশিষ্য সখ্যতা গড়ে ওঠেনি বলে। উনিশ কোটি বাঙালী তোমার সে ব্যথায় দুঃখে সামিল হয়েছে। ওরা ভাগ করে নিয়েছে তোমার সব কষ্টগাঁথা।
আফসোস কোরো না গো কবি! এবার দেখো ঠিক ঠিক তুমি পৌছে যাবে বন্ধুত্বের দোরগোড়ায়। তোমরা দু'জনে হাত ধরে ঘুরবে। ফুলবনের ঝরাফুল কুড়িয়ে নিয়ে মালা গাঁথবে। শুকনো ফুলের মালাগুলো ফেলে দিও না, সাজিয়ে রেখে দিও আমার মত অসংখ্য অজস্র অচেনা অজানা গুণমুগ্ধ ভক্তদের বরণ করে নেবে বলে।
প্রিয় আল্ মাহমুদ /
আগামী দিনের কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে সকালের সোনারোদ্দুর গায়ে মেখে, শরতের ঘাসের ডগায় জমা।শিশিরবিন্দু দু'পায়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে ; গঙ্গা-ফড়িংয়ের সবুজ স্বপ্ন নিয়ে, কাশফুলের শুভ্র-সাদা মেঘের ডানায় ভর করে আমরাও পৌঁছে যাবো তোমাদের ভালোবাসা পেয়ে ধন্য হতে। হার মানা হারের সেই জলসাতে।
শোষণ শাসন প্রবঞ্চনার বেড়াজাল ডিঙিয়ে আমরা সবাই কাতারে সামিল হবো। বিভোর হবো নতুন স্বপ্নে!
ভালো থেকো সুন্দর থেকো।
ইতি
তোমারই গুণমুগ্ধ ভক্তজন
সিরাজুল ইসলাম।
ফুলমার্কেট, খুলনা।
তারিখঃ ৩১ জুলাই ২০২৫
0 Comments.