- 6
- 0
শান্তিনিকেতন
সলিলবাবু কলকাতায় ফিরছেন। শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে উঠে বসেছেন। নিজের কর্মস্থল বিশ্বভারতীতে কিছু কাজ ছিল। পেনশনের পেপারে সই , লাইফ সার্টিফিকেট জমা করা, ব্যাঙ্কের কে ওয়াই সি আপডেট ও পোস্ট অফিসের কাজ সব সেরেই ফিরছেন। অবসর নিয়েছেন অনেক বছর হয়ে গেল। মাঝে-মধ্যে এসব ছোট ছোট কাজগুলো নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসতে হয় কলকাতার গড়িয়ার বাড়ি থেকে। এলে ভালোও লাগে। সবার সাথে দেখা হয়। গল্প-কথা হয়। তারপর সময় বের করে একটু কোপাইয়ের ধারে, খোয়াই বনে, ময়ূরাক্ষী ক্যানেল ধরে শাল-সোনাঝুরির জঙ্গলে, ঘোষালডাঙার রাঙা পথে ঘুরেও নেন। এবারও সব কাজ সেরে সময় বের করে একটা টোটো নিয়ে ঠিক টোটো কোম্পানির মত না হলেও খানিকটা ঘুরে নিয়েছেন। বনেরপুকুর ডাঙার বন্ধুর বাড়িতেও গিয়ে দেখা করে এসেছেন। বন্ধু ভালো নেই। ক্যানসারে আক্রান্ত। কেমো চলছে।
ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এল। আজ যেন মনে হয় কলকাতায় ফেরার লোক কম। কম্পার্টমেন্ট বেশ ফাঁকা। সলিলবাবু আপনমনে জানালার ধারে নিরিবিলিতে বসে রয়েছেন। মাস্টার্সের ছাত্র অতনু এসে স্যারকে বোলপুর স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে গেছে। সলিলবাবু খুব নিষেধ করেছিলেন, "আরে তোমাকে আসতে হবে না। আমি ঠিক সময় মত চলে যাব।" কিন্তু অতনু নিজে টোটো নিয়ে এসে স্যারকে গেস্ট হাউস থেকে তুলে বোলপুর স্টেশনে দিয়ে গেছে। ছাত্রদের এই অনাবিল শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসা মনকে বড় ছুঁয়ে যায়।
ট্রেন ছাড়ার ঠিক প্রাকমুহূর্তে হুড়মুড় করে কয়েকজন যাত্রী এসে উঠে পড়ল কম্পার্টমেন্টে। ট্রেন ধীর গতিতে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শেষমুহুর্তের যাত্রীরা হাঁফাতে হাঁফাতে এসে সলিলবাবুর কাছের উল্টোদিকের সিটটায় বসে পড়লেন। সকলেই বেশ পরিশ্রান্ত। সংখ্যায় তাঁরা মধ্যবয়সী পাঁচজন। তিনজন পুরুষ, দুজন মহিলা যাত্রী। সকলেই বেশ সুবেশে ফিটফাট। সিটে বসে একটু ধাতস্থ হয়ে নিয়ে একজন পুরুষ সহযাত্রী অল্প হেসে বললেন, "আর একটু দেরী হলে ট্রেন মিস হয়ে যেত! "
"আমি ঐ জন্যই বলেছিলাম, আজ লাঞ্চ রেলের ক্যান্টিনে করে নিতে। তাহলে খেতে গিয়ে সময় নষ্ট হত না!" একজন মহিলা সহযাত্রী কথাগুলো বলে বোতল খুলে জল খেতে শুরু করলেন।
"কিংশুকের যত বায়না, 'না, আজ আমরা সোনার হরিণেই খাব।' খেলি তো!.. সোনার হরিণ একটা ঢপের কেত্তন বুঝলি তো!..তারচেয়ে রংমশাল অনেক ভালো ছিল সেদিন। সোনার হরিণ পদ্মপাতায় খাইয়ে পকেটটা কেমন কেটে ফাঁক করে দিল বল। তাও যদি খেতাম সব ডেলিশিয়াস মেনু। খেলাম তো 'বাংলার থালি'! লাল নটে শাক কইটুকু দিয়েছিল ভাব!" অন্য একজন মাল গোছাতে গোছাতে রাগে গড় গড় করে বললেন কথাগুলো।
ট্রেন গতি নিয়েছে। দু'পাশের মাঠ, জলাশয়, ধানক্ষেত, খেজুর গাছ, তালগাছ, গ্রামের ঘর - বাড়ি সব পিছনে সরে সরে যাচ্ছে। ট্রেনের জানালায় বসে বাইরের এই দৃশ্যদেখার সুখ কোনওদিন যেন পুরোনো হয় না। সলিলবাবু আপনমনে দেখতে দেখতে চলেছেন। একটা আলতো ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে রয়েছেন। শুধু নেই সেই কাঙ্খিত নির্জনতা। কলকাকলিতে ট্রেনের কামরা গমগম করছে। ওরা পাঁচজনই সমানে কথা বলে চলেছে। একদম যেন বকম বকম পায়রা। ঘুরে ফিরে কেবলই শান্তিনিকেতনে এসে লাভ-লোকসান ও জিতে যাওয়া-হেরে যাওয়ার গল্প।
একজন এবার শুরু করল, "পরের বার এসে কিন্তু আগেই কংকালিতলায় পুজো দিয়ে ভোগের টিকিট কেটে নেব। কোনওবার ভোগ খাই নি কংকালিতলার।"
"ঠিক বলেছিস।" অন্য একজন এর সাথে জুড়ে দিল," হাটের খাবারের দোকানগুলো ডাকাত। মাটির থালা, পদ্মপাতা, নতুন গামছা, তালপাতা ঝুলিয়ে ডেকোরেশন করে সত্যি মাইরি আমাদের বটু করে ছেড়ে দেয়।"
"বটু"মানে কিরে?" কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল একজন।
"সে কিরে এতদিন শান্তিনিকেতনে আসছিস,বটু মানে জানিস না!" বেশ মজা করে হেসে বুঝিয়ে দিল সে এবার, " আরে বটু মানে বোকা ট্যুরিস্ট!"
"মানে! আমরা সবাই বটু!."
"ইয়েস! আমরা সবাই বটু!.. শান্তিনিকেতনের টোটোওয়ালা থেকে হোটেল রেস্টুরেন্টের সবাই মনে মনে আমাদের তাই বলে!"
"এমা!.. ছিঃ ছিঃ!.."
সলিলবাবু মনে মনে হাসছেন এসব কথাবার্তা শুনে। উনি যে শুনতে চাইছেন তা নয়, কথাগুলো যেন ভেসে ভেসেই কানে চলে আসছে। কান তো আর বন্ধ করে রাখার উপায় নেই।
ট্রেন ভেদিয়ে ছেড়ে এগিয়ে যেতেই সলিলবাবু কাঁধের ঝোলাব্যাগ থেকে প্রুফগুলো বের করলেন। আসন্ন কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হবে এক লিটিল ম্যাগাজিনের জন্য লেখা তাঁর প্রবন্ধের প্রুফ। মন দিয়ে প্রুফ দেখতে শুরু করলেন। কিন্তু পারলেন না মন বসাতে। পাঁচ সহযাত্রী অনর্গল শান্তিনিকেতন নিয়ে। এবার একজন বললেন, " দিন দিন শান্তিনিকেতনটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। ভাগ্যিস মাইরি খোয়াইয়ের হাটটা আবিস্কার হয়েছিল। না হলে কি হোত বল তো!"
"কি আবার হোত! হাট ছাড়া কি শান্তিনিকেতন আসত না লোক!"
"কটা লোক আসে বলতো রবীন্দ্রনাথকে জানতে, দেখতে!.. কি দেখবে!.. আসল নোবেলটাও নেই!.."
"আচ্ছা খোয়াই হাট এর আবিস্কর্তা কে জানিস?"
"হবে কোনও উপাচার্য!"
"পরেরবার হাট থেকে কয়েকটা কাঁথাস্টিচের শাড়ি ও চাদর নেবই নেব। খেস এর বেড কভারগুলো কি চোখ টানে বল!.." একজন মহিলা কথাটা যেন ইঙ্গিতে কাউকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
কথা পড়ল সভার মাঝে, যার কথা তার গায়ে বাজে!.. সে এবার চিড়বিড় করে মুখর হলেন, "সোমা, প্লিজ তুমি আর শাড়ি, চাদর কিনে আমাকে ঝামেলায় ফেলো না। তার আগে দুটো আলমারি কেনো!.."
"বেশ। তাহলে তো আরও ভালো।" একমুখ হাসি সোমার মুখে। "এবার তাহলে বাড়ি গিয়ে তুমি দুটো আলমারি কিনে দাও সোনামন!"
"কিংশুক শোন, তুই যেখানে সেখানে যাকে তাকে বলবি না জমি পাওয়া যাবে গো? আমি একটু জমি কিনব।"
"দেখ আমার বহুদিনের সখ শান্তিনিকেতনে একটা জমি কেনার। ছোট্ট জমি। ছোট্ট একটা বাড়ি করব। একটু বাগান থাকবে। মাঝে মাঝে আসব। হাওয়াবদল করব। সন্ধেরাতে একপেগ দু'পেগ খাব। হাল্কা করে রবিঠাকুরের গান শুনব। কুল লাইফ স্টাইল যাকে বলে!.."
"আমাদের আসতে বলবি তো? থাকতে দিবি তো দোলে, পৌষ মেলায়?"
"ধুস, দোলে এসে কি করবি, এখন তো গৌরপ্রাঙ্গনে আর ঢুকতে দেয় না বাইরের লোককে!.."
"গৌরপ্রাঙ্গনটা কি রে?"
ওমা! সেটাও জানিস না! এতদিন শান্তিনিকেতনে আসছিস, কিছুই তো জানিস না দেখছি।"
"কি করে জানব বল, যে কবার শান্তিনিকেতনে এসেছি খালি খোয়াই হাট, কংকালিতলা, ফুল্লরা, তারাপীঠ, ভুবনডাঙ্গায় কেনাকাটা আর আজ সোনার হরিণে লাঞ্চ, কাল অরণ্যদেবে ডিনার! পরশু রংমশালে..."
"তোরা একবারও কোপাই নদী দেখিস নি?"
"না তো।"
"গোয়ালপাড়া দিয়ে ওদিকে যাস নি?"
"নারে!"
"খোয়াই দেখেছিস?"
"খোয়াই কি রে বল তো আমাকে?"
"আরে সে এক আশ্চর্য জিনিস। লালমাটির ভাস্কর্য। কাঁকুড়ে লাল মাটিতে বৃষ্টির জল ঢুকে দারুণ সুন্দর একটা দেখার জিনিস হল খোয়াই।"
সলিলবাবু লাল চায়ের কথা ভাবছিলেন মনে মনে। এমন সময় লাল চা এসে হাজির। গরম এক কাপ লাল চা নিয়ে সলিলবাবু পুরনোদিনের শান্তিনিকেতনের কথা ভাবছেন। সত্যি কি অপূর্ব ছিল সে সব দিন যাপনের আনন্দ। ক্লাস শেষ হলেই ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে আড্ডা, গান, গল্প কত হোত। তারপর নিজের খেয়ালে ঘুরেও বেড়াতেন চারপাশে। গোয়ালপাড়া দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কেমন পৌঁছে যেতেন কোপাইয়ের ধারে। সে সময়ের শান্তিনিকেতন খুব শান্ত ছিল। নিরিবিলি ছিল। প্রকৃতি কত উদার ছিল। এত কোলাহল ছিল না। পর্যটকরা আসতেন, কিন্তু এত দলে দলে নয়। সারাবছর ধরে নয়। কোথায় তখন এত হোটেল, রিসর্ট, বাগানবাড়ি! সেই শান্তিনিকেতনকে খুব মিস করেন সলিলবাবু এখন এলে।
লাল চা ওরাও নিল। চা খেতে খেতে আবার পাঁচজন পঞ্চমুখে মুখরিত হলো। একজন বলল, "বীরভূমে কতগুলো পীঠস্থান আছে জানিস?"
"দেখ আমার ওসব পীঠস্থান, ধর্মস্থানে যেতে ভালো লাগে না। "
"বোলপুরে নতুন নতুন কত রেস্টুরেন্ট হয়েছে বলতো?"
"এখন তো শপিংমলও হয়ে গেছে।"
"বোলপুর এখন আর রবিঠাকুরের জন্য বিখ্যাত নয়। পাক্কা টুরিস্ট স্পট ফর এনজয়। রিল্যাক্স! বিউটিফুল উইকেন্ড ডেস্টিনেশন। "
সলিলবাবু আবার প্রুফে মন বসাবার চেষ্টা করলেন। ট্রেন শক্তিগড় পেরিয়ে কর্ড লাইন ধরে ছুটছে। শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস শান্তিনিকেতনে আসা যাওয়ার সেরা ট্রেন। দলে দলে মানুষ আসা যাওয়া করেন। "সব হতে আপন আমাদের শান্তিনিকেতন".. সেই শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে যাচ্ছেন এমন যাত্রীদের মাঝে আজ পড়ে গিয়ে সলিলবাবু বড় কাতর ও দ্বিধায় আক্রান্ত। রবিঠাকুর আজ বড় কোণঠাসা শান্তিনিকেতনেই। কেউ আর তোমার জন্য আসে না!.. তোমার কথা ভাবে না!.. তোমায় দেখতে যায় না!.. নোবেলও আজ তাই চুরি হয়ে যায়! তুমিই তো লিখেছিলে একদিন এক হাট কবিতা !..সেই হাট আর আজকের খোয়াইয়ের হাট এক নয়!.. সে ছিল তোমার হাট বসেছে শুক্রবারে, বক্সীগঞ্জের পদ্মাপাড়ে " আর এখন হাট বসে শনিবারে, সোনাঝুরি বনের ধারে!..এখন আর এ হাট নয়, হাট- বাজার! মেগা মার্কেট। এক ওপেন শপিং মল!..
"হ্যালো, স্যার আপনি কিংশুকদা বলছেন তো?"
"হ্যাঁ বলছি।"
"স্যার, আমি রতন, শ্যামবাটির রতন। চিনতে পারছেন তো? জমি..."
"হ্যাঁ, হ্যাঁ চিনতে পেরেছি রতন। "
"স্যার একটা ভালো জমির সন্ধান পেয়েছি। এখনই পেলাম। একদম আপনার মনের মত হবে।"
"তাই নাকি!"
"কোথায়? ক'কাটা? দাম কত বলছে? পেপার্স সব ওকে তো?.."
কামারকুন্ডুতে ট্রেন থেমেছে। সলিলবাবু উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন বাইরের দিকে। পাশের পাঁচজন আবার খুব কথার মজায় মেতে গেছে জমি কেনার গল্পে। শান্তিনিকেতনের পাঁচকাটা মাটি কলকাতা শহরের আরও এক বাবু কিনে নেবেন। সেখানে সৌখিন অট্টালিকা হবে। বিলাসীবাগান হবে। বাবুর বাড়ি খোয়াই হাটের জিনিস দিয়ে সাজানো হবে। আরও কত কত কত কিছু হবে। রবিঠাকুরের একটা ছবিও শেষ পর্যন্ত টাঙানো হবে বারান্দার এককোণায়। তারপর... তারপর...তার...
সলিলবাবু আর ভাবতে পারেন না। না ভাবতে পারার অক্ষমতা নিয়ে বসে থাকেন ট্রেনের এক কোণায়। এ যেন নিজেরই মুদ্রাদোষে আমি হতেছি আলাদা!...ট্রেন বেগমপুর পার হচ্ছে। আর কয়েকটা স্টেশন। হাওড়ায় এলেই যেন বাঁচবেন সলিলবাবু এই শান্তিনিকেতনের গল্প আর না শোনার যন্ত্রণা থেকে!..
0 Comments.