- 98
- 0
শহরতলির উপন্যাস
কলেজ থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে রাজীব,নিউ-দিল্লিতে কস্ট ইনস্টিটিউটের কনফারেন্সে গেছে,অবশ্য রেজিষ্ট্রেশন ফি-টা কলেজের প্রিন্সিপালমশাই,কলেজ থেকেই দেবার ব্যবস্থা করেছেন। রাজীব,কনফারেন্স থেকে ফেরার পথে,বেশ কয়েকটা জায়গা,ঘুরে এলো;কনফারেন্স তো দু'দিনের,তারপর বেশ কয়েকজন মিলে আশেপাশের দ্রষ্টব্য দেখে ও আগ্রার তাজমহল,ফতেপুর সিক্রি ঘুরে,এলাহবাদের প্রয়াগ দেখে বাড়ি এসেই খবর পেল,তার সহোদরার (মেজ) বিয়ে ঠিক করা হয়েছে।
রাজীব, ওদের পড়ানোতে আগ্রহী,কিন্ত হৈমবতী ও রমণীমোহন পড়াতে চায় না,বেশি লেখাপড়া শিখলে,পাত্র পাওয়া মুশকিল; অতএব কন্যা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেয় করাই শ্রেয়;তাই, রমণীমোহনের দিক থেকে পুলিশ বিভাগে কর্মরত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে, পুলিশ বিভাগেই চাকরি করে,এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে স্থির করেছে; রাজীব,সহোদরাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে,সেও আর পড়াশোনায় আগ্রহী নয়,অতএব,রাজীবের আর কিছু বলার নেই,না বললেও,রাজীবের ফেরার অপেক্ষায় ছিল হাজরা দম্পতি।আর বছর তিনেক চাকরির মেয়াদ;এর মধ্যেই একটা পার করলেও,আরো রয়ে যাবে দু'টো।
পাত্রপক্ষকে নগদ পাঁচহাজার টাকা আগেই দিয়ে দিতে হবে,কিন্ত,টাকা তো হাজরার প্রভিডেণ্ট ফাণ্ডে আছে,লোনের জন্য দরখাস্ত করেছে,কবে পাওয়া যাবে,ঠিক নেই;টাকা ছাড়া আরও অনেক জিনিস কেনার আছে,বিয়ের খরচা আছে, দান-সামগ্রী আছে তো!মানে,রাজীব,তুমি মেটাও,পরে লোনের টাকা পেলে, তখন দেখা যাবে। রাজীব,সবশুনে, নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে পাঁচহাজার টাকা তুলে রমনীমোহনর হাতে দিল;সজীব সব শুনে বললো,"আমি পাঁচশো টাকা পরের মাসে, তোকে দিয়ে দোব"। না,সেটা মাসে একশো,একশো করে পাঁচমাসে , তা শোধ হয়েছে। হাজরা, প্রভিডেণ্ট ফাণ্ড থেকে লোনের পাঁচহাজার টাকা হাতে পেয়েছে;,সেই টাকায় চললো,অন্যান্য খরচা।
এলাকায় তো নক্সালাইটদের প্রভাব,তাই সজীব, এ অঞ্চলে সচরাচর পা রাখে না;রাজীবকেই পাত্রের আঙ্গুলের মাপ আনতে যেতে হল, কন্যাদানের সময় আংটি দিতে হয়; দান-সামগ্রী কেনার থেকে সবই করতে হল;বাড়িতে তো আর সবের এখনও নাকের পোঁটা পড়া বন্ধ হয়নি;রজতকে বাড়ির দোকান-বাজার সবই করতে হয়।
এই কিছুদিন আগেই,রাজীব সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে,নিজের ট্যুইশান করা জমানো অর্থে, রমনীমোহনের চোখের গ্লুকোমা- অপারেশন করিয়েছে; এখন দু'চোখেই তার দৃষ্টিশক্তি সামনের দিকে,অর্থাৎ পাশের জিনিস দেখার শক্তি সে হারিয়েছে; চোখের ডাক্তার,ডাঃ রনজিৎ সরকার,বলেই দিয়েছিলেন, যা নষ্ট হয়ে গেছে,তা তো আর ফিরে পাবেন না; ঐ শ্রীরামপুর স্টেশনের কাছে, জোটের নার্সিং হোমে,ডাঃ সরকার প্রথম যে চোখটা প্রায় অন্ধ হয়ে এসেছিল,তা অপারেশন করেন;পরের বছর,আবার মোটামুটি ভালো চোখটার ছানি অপারেশন হয়েছে : সব খরচাই তো রাজীবকে মেটাতে হয়েছে;সজীব তো অনেকদিন আগেই বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে দূরে আস্থানা গেড়েছে।রাজীব মধ্যম সন্তান, অতএব যত পারো,তাকে দুহে নাও; না,তার জীবন তৈরিতে সহায়তা করা বা উজ্জীবিত করা নয়,শুধু দিয়ে যাও,শুধু ভার বহন করে যাও। মধ্যম সন্তানেরা যেন জন্ম থেকেই সংসারের জন্য বলি প্রদত্ত;রাজীব সব বোঝে,কিন্ত তার শিক্ষা তার ক্রোধকে সংযত করে রাখে, শুধু তার মনে জাগে,'পিতা স্বর্গ,স্বর্গাদপি মাতা,'কথাটা কত ঠুনকো,শালা বামুনেরা,নিজেদের শারীরিক উৎপাদন
অব্যাহত রাখতেই এ সব কথাবার্তার আমদানি করেছে।
বিয়ের আগের দিন বেশ গণ্ডগোল; তলায়,তলায় ,মেজো যে আবার নক্সালাইটদের সঙ্গে একটা আঁতাত গড়ে তুলে ছিল,তা তো রাজীবের ছিল অজানা; ফলে বিয়ের আগের দিন সন্ধ্যার একটু পরে দেখে, পাড়ার মাঠের মধ্যে সজীবের সঙ্গে,কয়েকজন তথাকথিত নক্সালদের একটা তর্কাতর্কি হচ্ছে; রাজীব,অত্যন্ত কৌশলে সজীবকে সেখান থেকে বার করে আনে,ওদের সামনে,সজীবকে বেশ ধমকানিও দেয়;সে বুঝতে পারে,সজীবকে উত্তেজিত করে,একটা ভয়ানক কিছু ওরা করতে চায় ;আবার,পাত্র পুলিশ বিভাগে,স্বভাবতঃই বরযাত্রীও আসবে পুলিশের লোক,আর এ সুযোগে পুলিশ মেরে বিপ্লব করা যেতেই পারে,পুলিশ তো শ্রেণীশত্রু।
বিয়ের দিন,দুপুর-বেলা সজীবের শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন এসে,রাজীবের
সঙ্গে কথা বলে,সজীবের জীবনহানীর সম্ভাবনার কথা বলে,সজীবকে গার্ড দিয়ে নিয়ে চলে যায়।রমনীমোহন,রাজীবকে ,সজীবের কথা জিজ্ঞেস করলে, সে বলে,"ওকে মিষ্টির দোকানে পাঠিয়েছি,ও মিষ্টি নিয়ে সন্ধের আগেই চলে আসবে"; ওর বৌদি অর্থাৎ সজীবের স্ত্রীর কাছেই লৌকিকতা করতে আসা সজীবের শালা,মামারা,গত রাতের ঘটনা শুনে,সজীবকে নিয়ে যাবার কথা রাজীবের কাছে পাড়ে এবং রাজীব তা সমর্থন করে।হায় রে! প্রথম সন্তান,সব স্নেহ ভালোবাসা তো শুধু তোমার জন্য,মধ্যম শুধুই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে আকাশে,কারন,তার জন্মদাত্রীর ক্রোড়ে এসে গেছে তার ভবিষ্যতের ভায়াদ। রাজীব দাঁতে দাঁত চেপে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত,সঙ্গে কেবল তার কস্ট ইনস্টিটিউটের একজন বন্ধু,হ্যাঁ,বন্ধুই তো,যে বিপদের সময় পাসে থাকে,আর আছে তার শ্রদ্ধেয় জামাই-দা,কিন্ত,সে তো গ্রামের লোক,এ অঞ্চলের বিশেষ কিছুই জানে না,আর বহুদিন হাজরা দম্পতিও খোঁজ নেয়নি, কেবল রাজীব,তার ট্যুইশানির টাকা থেকে মাসে কুড়িটাকা করে,বড় ভাগনার জন্য পাঠিয়ে থাকে।হাজরা দম্পতি, হয়তো লজ্জার,কারনে মেয়ে- জামাই'র সঙ্গ এড়াতে চায়; মেয়ে- জামাই,তাদের সংসার সীমিত করলেও,হৈমবতী-রমনী-মোহন,সে পাঠশালায় পড়েনি; আর্থিক ক্ষমতা না থাক,কামশক্তিতে তারা দুর্বার,আর তার পরিণতি ফলতে চলেছে।
চলবে
0 Comments.