- 54
- 0
বিয়ে শেষ হয়েছে;বরযাত্রীরা চলে গেছে,সশস্ত্র পুলিশের দলও চলে গেছে;পুলিশের উপস্থিতি ও নক্সালাইটদের হুমকির ভয়ে,অনেক অতিথিই আসেনি।বর-কনে,বিয়ের আসর থেকে ঘরে ঢুকে গেছে,রাস্তার দিকে ঘরটার দরজা খুলে রাখতে হয়েছে;পাত্রের দু'জন গ্রামের বয়স্ক আত্মীয় রয়েছেন ; ঘর সংলগ্ন রাস্তার দিকের উঁচু খোলা রোয়াকের পথ বেয়ে তাঁরা আসা-যাওয়া করছেন,তাই রাজীব ঐ রোয়াকে মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায়, লক্ষ্য রাখে, কারা রাস্তায় চলাফেরা করছে। পাড়ার লোকও বিনি পয়সায় সিনেমার হিন্দি ছবির প্রতিরূপ দেখতে আগ্রহী,কেউই কিন্ত রাজীবের পাসে এসে সেদিন এসে দাঁড়ালো না। হাজরামশাই বা হৈমবতীর মুখে কোনো কথা নেই;তারা একটা অজানা আশঙ্কায় যে ভুগছে,মুখ-চোখের অভিব্যক্তিতে তা স্পষ্ট।রাজীবের সঙ্গে আছে তার কস্ট-ইনস্টিটিউটের বন্ধু,হ্যাঁ,বন্ধু তো বটেই,যে বিপদের দিনে পাসে থাকে,সাহস যোগায়, সে তো আত্মার আত্মীয় তো বটেই। না,স্কুলের সহপাঠী বা পাড়ার খেলার সাথী বা যার ঘরে বসে পড়াশোনা করেছে,সবাই নিমন্ত্রিত ছিল,কেউই আসেনি; বিপদ-আপদেই বন্ধু চেনা যায়;কোথায় গেল হাজরা-হৈমবতীর সেই সব লোক,যাদের কাছে পেট খুলে,সংসারের সব যাবতীয় কথা না বললে,ছেলে-বৌমার কুৎসা না করতে পারলে, নিজেকে হাল্কা বোধ করতো না,তারা কোথায়!
রাত গভীর হতেই শুরু হোল বোমা বৃষ্টি;বাড়ির মধ্যে থেকেই হাজরামশাই'র আত্মীয় চেঁচিয়ে বলছে আয়,"ছ'ঘরা রিভলবার নিয়ে বসে আছি।" বাসরের ঘরের দিকে,ওদের প্রতিক্রিয়া জানতে এগুতেই রাজীব শুনতে পেল,ওর মেজ সহোদরা বলছে,"ঐ একটা,আবার একটা পররে",শুনেই গা রির রির করতে করতে সে ঐ বাইরের ঘরের রোয়াকের দরজা খুলে দাঁড়িয়েছ; ওকে না মেরে কেউ এ বাড়ির ভেতর ঢুকতে পারবে না ,মনে মনে বলে,'হা ঈশ্বর! তার জীবনের পরিশ্রম,নিজেকে গড়ে তোলার অদম্য প্রচেষ্টা,তার সততা,তার নিষ্ঠা, কী এভাবে অবদলিত হবে, এভাবে অসম্মানিত হবে!তার দাদা,সজীব,আপন সহোদর, একবারও ভাই 'র কথা ভাবলো না।
পরের দিন,বর-কনে বিদায় হবে; হৈমবতীর দিক থেকে আত্মীয়রা তাড়াতাডি বিদায়ের পক্ষপাতী,কিন্ত,ঐ পুলিশ আত্মীয় তো নক্সালাইটদের টার্গেট;কন্যা বিদায় হলেই ওরা নাকি জোর করে বাড়িতে ঢুকবে,একজন প্রতিবেশী চুপি চুপি এসে বলে গেছে। না,রাজীব তা পারবে না,কিছুতেই না,চোখের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের মৃত্যু দেখতে পারবে না,কন্যা বিদায়ের ব্যবস্থা সে কিছুতেই করতে দেবে না। ঐ আত্মীয় ,কিন্ত তড়পিয়ে যাচ্ছে;ওনার স্ত্রী বা ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে না;খুব চিন্তার ব্যাপার,আবার,বাড়ির বাইরে গিয়ে এ সময় খোঁজ করাও যাচ্ছে না।বেলা সাড়ে-দশটার সময় দেখা গেল প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ জন সশস্ত্র পুলিশ,টিয়ার-গ্যাস ইত্যাদি নিয়ে জেলা পুলিশের লোক হাজির হয়ে,ঐ আত্মীয়কে সম্বোধন করে বলছেন",--মশাই,আসুন,"
এবার বোঝা গেল,কেন তিনি এতক্ষণ তড়পাচ্ছিলেন।ওনার স্ত্রী ও ছেলে,ভোরে,কাজের লোকের পোশাকে বেরিয়ে গিয়ে, লোকাল ফাঁড়ির ফোন থেকে জেলার এসপিকে সব ঘটনা জানিয়েছেন,আর এরই ফলশ্রুতি এই বিশাল বাহিনী;বর-কনে,ওদের সাথেই বিদায় হয়েছে;রাজীব,ওর বৌদির রিক্সাতেই,সেজ বোনকে পাঠিয়ে দিয়েছে;রজতকেও ওদের সঙ্গে এলাকা ছাড়া হবার উপদেশ দিয়ে ওর হাতে টাকা দিয়েছে, বলেছে সম্ভব হলে বিহারের এক মাসতূতো দিদির বাড়িতে যেন আশ্রয় নেয়।
বাড়ি ফাঁকা।হৈমবতী হাউ-মাউ করতে করতে এসে বরকনে বসার ফাঁকা ঘরের এক কোনে বসে বললো,"এই বসলাম,তুই যা বলবি,তাই করবো,আমি আর কোথাও যাবো না,এই বসলাম"।হায় রে জন্মদাতা-জন্মদাত্রী! বাবা-মা আর হতে পারলে না। তাদের জামাই-দা, মুখকাঁচু করে রাজীবকে এই বিপদের সময় একলা ফেলে যেতে হচ্ছে বললে,রাজীব বলে,"তুমি তো দেবতা আমাদের কাছে, তোমার ঋণ অশোধ্য, আমি ঠিক অবস্থা মানিয়ে নেব,আর বাকি দুটোর তো এখন সবে নাকের পোঁটা সরেছে;তুমি এসো,চিন্তা করবে না,আমি সব সামলে নেব।"জামাইদা চলে গেল,ওদের মামা তো আগেই চলে গেছে।এখন শুধু চিন্তা,ছেলের বাড়িতে কীভাবে,ওদের ঐ সহোদরাকে গ্রহন করে। খবরের কাগজের শিরোনাম হয়েছে,' বিয়ে বাড়িতেও প্রয়োজন হচ্ছে পুলিশের উপস্থিতি'। লোকে রসিয়ে রসিয়ে পড়ছে,যেমন করে হোক,রাজীবের ক্রমোন্নতিতে ঈর্ষিত, একটু কালি ছিটিয়ে,যেটুকু আনন্দ উপভোগ করা যায়। হাজরামশাই'র আত্মীয়,বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের ব্যবস্থা করেছে;পাড়ার লোকের আপত্তিতে,রাজীব লিখিতভাবে তা তুলে নেবার জন্য এসপির কাছে আবেদন করেছে;পাড়ার লোকে মর্মাহত,কিছু ঘটলো না তো,কোনো অ্যাকসন না হওয়ায়,সিনেমার ছবিটা ম্যারমেরে হয়ে গেল,সেরকম জমলো না, বলতে গেলে ফ্লপ হয়ে গেল।
রাজীব,তার আজন্ম লালিত-পালিত পরিবেশ বা অঞ্চলকে বুঝে গেল; এ কী মানসিকতা! জনবিন্যাসের পরিবর্তন, ভেঙ্গে ফেল,গুড়িয়ে দাও শ্লোগান ও নঞর্থক রাজনৈতিক প্রভাবে পঃ বাংলায় তাণ্ডবলীলা চলছে,এ অধোগতির ধারা রুধিবে কে!
চলবে
0 Comments.