Tue 26 May 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৪৭)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৪৭)

 শহরতলির ইতিকথা

       সময়ের কারসাজি বড় অদ্ভুত,তার চেয়ে বড় বিচিত্র মানুষের মন,একটা নতুন কিছু পেলে,পুরোনোটার কথা তার মনেই পড়ে না;কিন্ত কিছু মানুষের মনের কাছে, পুরোনোটা কখনোই পুরোনো হয় না,চোখের সামনে সব সময় ভাসে ,হয় আরো স্বচ্ছ,স্বচ্ছতর।হ্যাঁ,রাজীবেরও ঐ ধরনের মন,সে যত ভুলতে চায় অতীত, তত তার মন অস্থিরতায়, উদ্বেগে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে,সব স্মৃতি,বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে বেরিয়ে,চোখের সামনে কিলবিল করে।

        দাদা,অঞ্চলে ঢুকতে পারছে না,পরের ভাই আছে বিহারের মিথিলায়;তার মেজ সহোদরাকে অবশ্য শ্বশুর-বাড়িতে সম্মানের সংগেই গ্রহন করেছে,তবু উদ্বেগ তো রয়েই গেছে;প্রয়োজন পড়লে,এবাড়ি বিক্রি করে,সজীবের শ্বশুরবাড়ির কাছে,একটা জায়গা কিনে স্থানান্তরের কথা মাথায় ঘুরছে,লোকবল দরকার; আত্মীয়- স্বজনের পাশাপাশি থাকা খুব প্রয়োজন; চিন্তা মাত্র, তার কলেজের কাছে,আবার সজীবের শ্বশুরবাড়ির একটু দূরে, প্রায় দশকাঠা মত জায়গা কেনার কথা প্রায় স্থির করে ফেলেছে;রমনী-মোহনকে জিজ্ঞেস করায় বলে,"কেন,তিনভাই'র নামেই কেন"। রাজীব,ভাবে,তার জ্যেষ্ঠ

 সহোদরকেই বা কেন বাদ দেবে,সে,তার তিন সহোদর ও সজীবের ছেলের(নাবালক) নামে কিনলো; রমনীমোহনের সংগে কথা হয়েছিল,এ বাড়ি বিক্রি করে,ধীরে ধীরে ঐ কেনা জায়গায় বাড়ি হবে,সবাই পাশাপাশি থাকবে; দশ কাঠা জায়গায়,চারজনের পক্ষে পাশাপাশি ঘর করে থাকা

অসম্ভব কিছু না; কিন্ত,হাজরা-দম্পতির মনে তো রয়েছে অন্য প্যাঁচ;যেই,অবস্থা থিতিয়ে গেল,আবার,হৈমবতী,তার পূর্বাবস্থায় ফিরে গেছে,হাজরাও তার কথা বিস্মৃত হয়েছে। তার তিন নম্বর সহোদরা,বাড়িতে ফিরে এসেছে,স্কুল যাচ্ছে।আবার পড়ানো নিয়ে,শুরু হয়েছে অশান্তি। রাজীব বলে,"আমার কাছে যে পড়ার জন্য সাহায্য চাইবে,আমি করবো; তোমাদের মেয়ে,সিদ্ধান্ত তোমাদের"।সেজ সহোদরার সংগে পড়ার বিষয়ে হৈমবতীর সংগে তীব্রভাবে বাদানুবাদের পর ,তাদের মধ্যে বাক্যালাপ বন্ধ। হৈমবতীর বক্তব্য,"আমি,চা-ওয়ালা ছেলের সংগে বিয়ে দেব,তুই পড়ালে,তোকেই বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে"।হায় রে স্বর্গাদপি!

     রাজীবের মনে পড়ে, পাড়ার সরকারদের বাড়িতে ফুড-পয়জন(খাদ্যে-বিষক্রিয়া) হবার সময়, পাড়ার লোকেরা,কেমন পরস্পরের সমস্ত তিক্ততা ভুলে,ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে;একটার পর একটা কিশোর কিশোরীর মৃতদেহ এলে,কীভাবে পরিবারটাকে আবার সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে,এ পাড়ারই সব লোক;পাড়া সংস্কৃতির উদাহরণ তো এটাই,এটাই তো হয়ে এসেছে এতকাল।কিন্তু আজ,কী দেখলো! কোথায় গেল সেই পাড়া -সংস্কৃতি! প্রত্যকেটা পরিবার যেন অসীম জলাধারের মাঝে এক একটা বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগবিহীন স্বতন্ত্র দ্বীপ ।

        জনবিন্যাসের পরিবর্তনে, বিস্ময়করভাবে সামাজিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন ঘটেছে; গোদের উপর বিষফোড়া, লুটে-পুঠে খাওয়া,সর্বহারার, সব হারানোর সংস্কৃতির মারদাঙ্গায়, পঃ বাংলা আজ কলুষিত;পুব-বাংলার মানুষ,তাদের কষ্টের কারন হিসেবে,পঃবাংলার মানুষকে দেখছে, তাদের উপর দল বেঁধে চড়াও হয়ে পঃবাংলার মানুষের জীবন-জীবিকাকে পর্যুদস্ত করে তুলেছে;আবার, জীবনযাত্রা সুস্থপ্রবাহে ফিরবে কবে কে জানে! পাশের অঞ্চলের কৃষক,কৃষক- রমনীরা,মাথায় করে তাদের বাড়ির শস্য-সামগ্রী,বিক্রি করতে আসতো;সেই বিক্রয় করা অর্থে মুদিখানার সামগ্রি কিনে বাড়ি ফিরতো। কিন্ত আজ! বাজার আসার পথে, থামিয়ে জোর করে তাদের সামগ্রী কম দামে কিনে,বাজারে চড়া দামে বিক্রি করার জন্য তৈরি হয়েছে তো সিন্ডিকেট,আর তাদের অত্যাচার ক্রমশই অসহনীয় হবে উঠছে। রাজীব ভাবে,স্বাধীনতার শহিদেরা বোধহয় মানুষের এ অবনতির কথা অনুধাবন করতে পারেননি,করলে ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ বিসর্জন দেবার আগে,একবার ভাবতেন;তাঁরা হয়তো আজ অলক্ষ্যে প্রজন্মের অবনতিতে ক্ষুব্ধ, লজ্জিত হয়ে,ঈশ্বরের কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছেন।

      রাজীব,অর্থের অভাবে চাটার্ড অ্যাকাউন্টন্সি পড়তে পারেনি;সব ফার্মই তিন হাজার টাকা চেয়েছে;তাছাড়া,যা হয়েছে,তা ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলেই ভাবে,ঈশ্বরের কাছে প্রণাম জানায়। নিকটেই একটা পোড়ো বাড়ির একতলা ভাড়া নিয়ে,সে রাত আটটার পর সপ্তাহে তিনদিন চাটার্ড/কস্ট অ্যাকাউন্টান্সির ছাত্রদের পড়াচ্ছে;অঞ্চলে সে চাটার্ডও কস্ট-অ্যাকাউন্টান্ট তৈরি করে সে দাগ কেটে যাবে। ছেলেগুলো কোলকাতায় সারাদিন অফিস করে এসে বাড়িতে কিছু খেয়ে,ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে আসে। রাজীবও কলেজ থেকে বাড়ি আসবার পথে কিছু খেয়ে নিয়ে,ঐ ভাঙ্গাবাড়িতে

এসে ছাত্রদের সঙ্গে বসে,চা খায়,এভাবে রাত এগারোটা বারোটা পর্যন্তও পড়াশোনা চলে; কোনো, কোনোদিন আরো রাত হয়ে যায়। যা সঞ্চিত অর্থ ছিল তা তো খরচ হয়ে গেছে;বাড়ি করতে তো টাকা লাগবে;হাজরামশাই আর কত দিতে পারবে,প্রভিডেণ্ট ফাণ্ড-গ্রাটুইটিই তো শ্রমিকের অবসরকালে সম্বল। অবিমৃশ্যকারিতার উৎপাদন যে

হাজরামশাই'র মত লোকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে চলেছে,এতে আর আশ্চর্য কোথায়!পুত্র,তোমাদের উৎপাদনের জন্য দায়ী থাকবে কেন?তোমাদের প্রতি দায়বদ্ধ হতে পারে,যদি তোমরা দায়িত্ববান হও,কিন্ত তোমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য,তোমাদের ভোগলিপ্সার বলি কখনও পুত্রকে করতে পারো না;না,জন্মদাতা-দাত্রী,কখনও পিতা-মাতা হতে পারে না।

------------

চলবে

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register