Wed 04 November 2026
Cluster Coding Blog

T3 - বিজয়া সংখ্যায় অর্পিতা চ্যাটার্জি

maro news
T3 - বিজয়া সংখ্যায় অর্পিতা চ্যাটার্জি

স্মৃতির পাতায়।

আজ সকালের আলোয় সোনালি রোদ নেই। আছে ভেজা দিনের অনুসঙ্গ। 

বৃষ্টি ভেজা দিন যেন আসে স্মৃতি-বিস্মৃতির প্রদোষে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। 

সেবার পূজোর ছুটির আগে চারিদিকে বিজ্ঞাপন পড়েছিল - "দুটাকার বাড়ি আর দশটাকার গাড়ি, কিনলে ভাব না কিনলে আড়ি"। কি চমক। সেবার আমাদের দোকানের নাম হয়েছিল "জগঝম্প"। আমরাও নানান ছড়ায় পোস্টার দিয়েছিলাম। আনন্দবাজারের দোকানের বিজ্ঞাপন তখন ছিল আবশ্যক। শিক্ষকরাও সাহায্য করতেন। দোকানের নাম নিয়ে ছোটখাট কুরুক্ষেত্র হতেও দেখেছি। কি করে শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠা যাবে সমবেত চিন্তায় এ ছিল তার প্রথম পাঠ। দোকানের নামগুলো আগে থেকেই ঘুরত মুখে মুখে। একবার তো সবাইকে চমকে দিতে আমরা মেয়েরা পাইপ বেয়ে উঠে শান্তিনিকেতন বাড়ির মাথায় সেই গম্বুজের গায়ে সেঁটে দিলাম আমাদের সারা রাত ধরে হাতে লেখা সেই বিজ্ঞাপন। সবার চোখে পড়েছে । সবাই চমকাচ্ছে। সবচেয়ে বেশী চমকালেন সুপ্রিয়দা। ডেকে পাঠালেন। আমরা আনন্দে উৎফুল্ল। সুপ্রিয়দা আমাদের এত স্নেহ করতেন বকতে চাইতেননা। শুরু করছিলেন খুব নরম করে -

কিভাবে উঠলে? আমরা বললাম- কেন পাইপ দিয়ে, পায়রার বাসা অবধি। তারপর ছাদের পাঁচিল পেয়ে গেলাম। ওটা টপকালাম। তারপর তো ঐ সিঁড়িটা ছিল। সুপ্রিয়দা অস্ফুটে বললেন- ঐ ভাঙা সিঁড়ি। তালা দিয়েও কোনো লাভ নেই। তারপর ওনার চমক কাটলো আমাদের চমক শুরু হল। বিপুল বকলেন। বারবার একটা কথাই বললেন কারুর যদি কিছু হত আনন্দ করতে পারতে? এখন শান্তিনিকেতন বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটলে ভয় করে কি করেছি। কি নির্ভিক ছিলাম। বকাঝকা মনখারাপের পরেও পুরো উদ্যমে দোকান কিন্তু হয়েছিল।


আর একবার মনে আছে আমরা তখন উত্তর শিক্ষা। আমি G.S.। না নির্বাচন আমাদের সময় হয়নি। আমাদের সহপাঠিরা নির্বাচনের প্রয়োজন অনুভব করেনি। আমাদের মনোনীত করেছিল। প্রসেনজিৎদা দুটো option দিয়েছিলেন কিন্তু বাস্কেটবল কোর্টে বসে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল আমার বেশ মনে আছে। নাটকের রিহার্সাল নিয়ে সেবার এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম কিছুই তেমন হাতে বানানো হয়নি। ক্লাসে শিক্ষকরা যা করিয়েছিলেন ঐটুকুই। সেবার আমাদের নাটক খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। "বিশ্বনাথের আজব কল"। দোকান বানাতে গিয়ে সবাই মিলে কথা হল কি করা যায় । বিশ্বপতি বলেছিল আমাকে একটু বেশী করে মশলামুড়ি মেখে দিস। আর একটা লাল গামছা হস্টেল থেকে নিয়ে আসিস। ও ছিল cultural এর দায়িত্ব। খুব সাধারণ ভাবে ভাবত অার বারবার তা অসাধারণ হয়ে উঠত। বিশ্বপতি একটা খোল নিয়ে এল সাড়ে তিনটে নাগাদ। এক গুচ্ছ কাগজের ঠোঙা আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের মগ। সে মগ দেখেই তো আমার শরীর খারাপ হল। বললাম এটা কেন? বলল যা বলব তাই করবি। ভরসা রাখ ভালো হবে। ছোট্টবেলার বন্ধু। বললাম ঠিকআছে। খোল নিয়ে বেরোল বিশ্বপতি আর আমরা পেছন পেছন মাখা মুড়ি আর মগ নিয়ে চললাম। দোকান রইল পড়ে । বিশ্বপতি মাথায় লাল গামছা বাঁধলো। আর খোলে চাটি মেরে ধরল সেই নাটকের গান। সে এমন জমজমাট ব্যাপার। মুড়ির জোগান দিতে গিয়ে আমরা হাঁপিয়ে উঠি। হাতের কাজ ও ছিল কিন্তু মুড়ি বেচেই সেবার সব থেকে বেশী টাকা দিয়েছিলাম আমরা।


আমার দেওর আজ আর নেই। মারা গেছে। ভারি মজা করে গল্প বলত আমায় ওর যৌবনের। ওর কাছে শোনা একটা গল্প বলি। একবার তো সারা শান্তিনিকেতনে poster পড়ল "বিবেকানন্দ দর্শন দেবেন"। poster-এ লেখা ছিল ক্ষন টা। আটটা বাজতে পাঁচে। সে কি টিকিট বিক্রি। আটটা বাজতে পাঁচে একটি মায়েদের ছাপা শাড়ি দিয়ে ঘেরা মঞ্চে দেখা দিয়েছিল তিনটি ছেলে বিবেকানন্দের সাজে - স্বামী, বিবেক, আনন্দ। জনতার গর্জন মুহুর্তে পরিণত হয়েছিল হর্ষের উচ্ছাসে । 


ছোট থেকেই তো আমরা জানি- নিজে যে যা পারি তা নিজে হাতে বানিয়ে , নিজের সখকে সুন্দর করে সৃজন করে তা লোকের কাছে তুলে ধরতে হবে। বিক্রী করতেই হবে। সেবা শাখায় আমরা যেন একটু বেশী টাকা দিতে পারি। ব্যাস। 

এই ভয়ংকর বাজার অর্থনীতিকে এখানকার ছেলেমেয়েরা যেন বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে তার সামনে তারা যেন তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সম্মুখিন হতে পারে তার যে পাঠ রবীন্দ্রনাথ এই "আনন্দ বাজারে"র মধ্যে বুনেছেন তা আমায় মুগ্ধ করে বারবার । প্রণত হই। 

তাই যে সাজ সাজব বলে ঠিক থাকত যত বৃষ্টিই হোক না কেন সে সাজ বদল হত না। ভেজার ভয় আমাদের ছিল না। আমরা সুন্দর হয়ে উঠতাম নিজেদের কাজকে সুন্দর করে বাজারে তুলে ধরব বলে।কেউ নিজে না দোকানে আসলে তাদের ডেকে ডেকে আনতাম। ইগোর অসুখ আমাদের ছিল না। কতজন আসতো না। এড়িয়ে যেত। আবার কেউ কেউ আসত। দাদাদিদিরাও হাসতে হাসতে আসতেন দেখতেন প্রশংসা করতেন। সব সময় যে কিনতেন তাও না। মাঝে মাঝে কিনতেন । সব মিলিয়েই আমাদের তৃপ্তি ছিল। বিক্রি করতে পারতেই হবে এই ছিল মোটো । কবি কোনে বসত কবিরা। আঁকত মানুষের চাহিদা মত। শিল্পী কোনে বসত শিল্পীরা লিখত মানুষের চাহিদা মত।টিকিট বিক্রি করে নাটক হত সিংহসদনে।পাগলের মত হাসতে হাসতে সব দর্শকরা বেরোতো। আর পত্র পত্রিকা,খাবার, হাতের কাজ তো আছেই। কি আনন্দ। আহা।


এত কথা ভাবতে ভাবতে বৃষ্টি এল ঝমঝমিয়ে। ঈশ্বরের কাছে শুধু মনে মনে বলছি বাজারটা যেন বসে ঠাকুর। কত মন যে কত আশা নিয়ে বসে আছে। আমিও । যেভাবেই হোক। আজ যদি না হয় অন্যদিন।




Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register