- 3
- 0
কাঁথা স্টিচ
শিলিগুড়ির সেপ্টেম্বর মানেই এক অনভ্যস্ত বিষাদ। আকাশে মেঘ আর রোদের খেলাটাকে লোকগাথায় যাই বলা হোক না কেন, তিস্তা নদীর পার ঘেঁষে চলা মহানন্দার হাওয়ায় যে গন্ধটা থাকে, তা আসলে পলি আর পচা ধানগাছের এক মিশ্র অবক্ষয়। সেই বাতাসে আর্দ্রতা থাকে, কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি থাকে না।
তিস্তার বয়স তিরিশের ঘরে থমকে আছে। বয়সটা কেবল জন্মসনদের একটা শুকনো বয়ান; তার গালের নিচে চেপে বসা হাড় আর চোখের কোটরের কৃষ্ণবর্ণ ছায়া বলে দেয়, সে একটা সম্পূর্ণ যুগ নিঃশব্দে পার করে এসেছে। পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির এই শীর্ণ শরীরটা যখন রান্নাঘরের পুরোনো প্লাইউডের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তার বড় বড় ডাগর চোখ দুটিতে কেবল একধরনের ধূসর, অলৌকিক স্থবিরতা ভেসে ওঠে।
তিস্তা—নামটার ভেতরে যে জলপ্রপাতের শব্দ বা খরস্রোতের উন্মাদনা ছিল, তা বহু আগেই শুকিয়ে শিলিগুড়ির সেবক রোডের বালি হয়ে গেছে। তার স্বামী অলক উত্তরবঙ্গের একজন পোড়খাওয়া রেলকর্মী, লোকোপাইলট। কাঞ্চনজঙ্ঘা Express-এর চাকার ঘর্ষণ আর ডিজেলের তীব্র গন্ধে অলকের গলাটা কাঁসার থালার মতো কর্কশ। অলকের সরকারি চাকরি আছে, প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দিনে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসে, কিন্তু সেই টাকায় কোনো শান্তি বা শ্রী ফিরে আসে না। জুয়া, দেশি মদের ঠেক আর এনজেপি ইয়ার্ডের ধারের খাতায় সেই অর্থ কপূরের মতো মিলিয়ে যায়।
ঘরে ফিরলেই অলকের মুখে এক বিষাক্ত ঔদ্ধত্য ফুটে ওঠে। সারাদিনের লোকোমোটিভের গর্জন আর লাইনের ঝাঁকুনি যেন সে ঘরের ভেতর এসে খালাস করে। চাবির রিংটা খটাশ করে টিপয়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলে বলত, "তোর কি মনে হয় তুই কোনো রাজবাড়ির বউ তিস্তা? মনে রাখিস, এই ট্রেনের ড্রাইভার আমি, আর তুই এই কোয়ার্টারের একটা পুরোনো আসবাব ছাড়া কিচ্ছু নোস! চাল-ডালের হিসাব চাস কিসের জন্য? আমি রোজগার করি, আমি ওড়াই। তোর বাপের ভিটে থেকে তো টাকা এনে দিসনি!"
ছোটবেলায় তিস্তা বিশ্বাস করত শাঁখা-সিঁদুরের একটা আধিভৌতিক ধর্ম আছে। মা বলতেন, লাল সিঁদুরে বাঙালি নারীর পূর্ণতা, আয়তি লক্ষণ। কিন্তু অলকের কাছে তা ছিল কেবল এক সামাজিক কৌতুক। মদ খেয়ে ফেরা নির্ঘুম রাতে অলক হিংস্র ভঙ্গিতে বলত, "তোর কপালে সিঁদুরের রক্ত সাজে না, তোর কপালে লাথির দাগটাই আসল।"
কোনো অনুভূতির আদান-প্রদান ছাড়া প্রতি রাতে যে যান্ত্রিক দেহাভিযান চলত, তাতে তিস্তার নিজের শরীরটাকেই একখণ্ড অচেনা মাংস ছাড়া আর কিছু মনে হতো না। রাতের পর রাত সে ঘরের সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দের দিকে তাকিয়ে থাকত আর ভাবত, মানুষের আত্মা কি শরীর থেকে আলাদা হতে পারে? যদি না পারে, তবে তার ভেতরের চালিকাশক্তিটা কেন কোনো ব্যথা অনুভব করে না?
এই সমস্ত পঙ্কিলতার মাঝে তার একমাত্র আশ্রয় ছিল ছেলে আবির। ক্লাস টেনে পড়া ছেলেটাকে অলকের পশুবৃত্তির আঁচ আর বিষাক্ত পরিবেশ থেকে বাঁচাতে তিস্তা নিজের বাপের বাড়ির সামান্য একজোড়া সোনার চুড়ি বন্ধক রেখে দক্ষিণ ভারতের এক দূরবর্তী বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। তিস্তার জেদ একটাই—ছেলে যেন বাবার ওই জং-ধরা মনস্তত্ত্বের উত্তরাধিকার কোনোভাবেই না পায়। সে নিজে শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আবিরকে এই নরক থেকে দূরে রাখবে।
কিন্তু এই নিরেট অন্ধকারের ভেতরেই একদিন অন্ধকার ঘরে মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলো জ্বেলে আবির্ভাব ঘটেছিল একটি অস্তিত্বের—‘অর্কপ্রভ রায়’।
কলকাতার সাহিত্য বৃত্তের এক জটিল, নিঃসঙ্গ ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষ অর্কপ্রভ। সে সামাজিক মাধ্যমে ‘নীল আকাশ’ ছদ্মনামে লিখত। ফেসবুকে কোনো এক নির্ঘুম মাঝরাতের দীর্ঘ মন্তব্যের সূত্র ধরে তাদের প্রথম পরিচয়। তিস্তা সেখানে নিজের বাস্তব পরিচয় লুকিয়ে রাখত এক কাব্যিক আবরণে… ‘নয়নিকা’।
তিস্তার সেই বিশাল, কাজলহীন, গভীর বিষণ্ণ চোখের ছবি দেখে অর্কপ্রভ প্রথম দিন ইনবক্সে লিখেছিল, "নয়নিকা, তোমার চোখ দুটো যেন বাংলা সাহিত্যের কোনো হারানো উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ। যেখানে গল্প শেষ হয় না, কেবল একটা দীর্ঘশ্বাসের সূচনা হয়।"
শিলিগুড়ির এই বদ্ধ কোয়ার্টারের গুমোট যন্ত্রণার মাঝে ফেসবুকে ফুটে ওঠা সেই নীল স্ক্রিনটাই তিস্তার জন্য এক সমান্তরাল পৃথিবীর মানচিত্র হয়ে উঠেছিল। অর্কপ্রভ বড়মাপের সাহিত্যিক; তার চারপাশে স্তাবক, অনুরাগী আর শহরের আভিজাত্যের ভিড়। অথচ সেই মানুষটাই গভীর রাতে কলকাতার পাঁচতারা ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতায় বসে শিলিগুড়ির এই অবহেলিত গৃহবধূর সাথে কথার সুতো বুুনত।
তিস্তার সেলাইয়ের প্রতি এক অদ্ভুত, বংশানুক্রমিক দক্ষতা ছিল। সে সুঁচের ডগায় রেশমি সুতো পরিয়ে কাপড়ের বুকে নিজের জীবনের সমস্ত ক্ষতগুলোকে গেঁথে রাখত। অর্কপ্রভ একদিন মেসেঞ্জারে বলেছিল, "নয়নিকা, তুমি কি আমাকে একটা কাঁথা স্টিচের কুর্তা বানিয়ে দেবে? আমি দেখতে চাই, মানুষের বিষাদ কীভাবে সুতোর আকৃতি নেয়।"
তিস্তা এক মাস ধরে রাতের পর রাত জেগে একটি সাধারণ সাদা সুতির কুর্তায় নিখুঁত কাঁথা স্টিচ ফুটিয়ে তুলেছিল। কাপড়ের প্রতিটা ফোঁড়ে যেন তার জমানো অপমান, অলকের কটু গালিগালাজ, সংসারের ক্লান্তি আর অর্কপ্রভর প্রতি না-বলতে পারা এক তীব্র মানসিক আসক্তি সেলাই করা ছিল। সেলাই মেশিনের চাকার শব্দ আর সুঁচের ওঠানামা ছিল তার মনস্তাত্ত্বিক মানসিক চাপ কমানোর একমাত্র মাধ্যম।
কুরিয়ারে সেই জামা কলকাতায় পৌঁছানোর পর অর্কপ্রভ যখন সেটা পরে একটি ছবি পাঠাল, তিস্তার মনে হলো—তার মানসী সত্তা যেন এই প্রথম রক্তমাংসের রূপ ছাপিয়ে এক বস্তুনিরপেক্ষ স্বীকৃতি পেল।
এই পুরো মানসিক আবর্তে তিস্তার একমাত্র বাচিক বন্ধু ছিল রিমি। রিমি ছিল পাশের স্কুলের শিক্ষিকা। সে মাঝে মাঝে এসে তিস্তার ছোট্ট রান্নাঘরে বসে ধোঁয়া ওঠা কফি খেতে খেতে বলত, "তিস্তা, অলক তোর শরীরটাকে দুমড়ে দিতে পারে, তোর যৌবন নষ্ট করতে পারে, কিন্তু তোর ভেতরের সূক্ষ্ম আত্মাকে ও স্পর্শও করতে পারেনি। অর্কপ্রভ তোর সেই সত্তাকে চেনে। এটাকে কেবল ইন্টারনেটের মোহ বলে উড়িয়ে দিস না, হয়তো ওটাই তোর বাঁচার একমাত্র সমান্তরাল বাস্তবতা।"
তিস্তা আনমনা হয়ে ব্যালকনির লোহার গ্রিল ধরে বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, "রিমি, ভার্চুয়াল শব্দগুলো কি সত্যি বাস্তবে টিকে থাকে? আমি তো এই ধুলোবালি, কেরোসিনের গন্ধ আর অলকের গালিগালাজের মধ্যে বন্দি। আর ও কলকাতার আলো-আঁধারির আভিজাত্যে ভরা সাহিত্যজগতে। ও যখন লেখায় বলে, একদিন তোর হাত ধরে উত্তর কলকাতার অলিগলি আর গঙ্গার শান্ত ঘাট ঘোরাব… তখন আমার মনে হয় আমি এক স্বপ্নিল মরীচিকার দিকে হেঁটে যাচ্ছি। ভয় হয় রিমি, আলো নিভে গেলে আমি কোথায় দাঁড়াব?"
রিমি মৃদু হেসে তিস্তার কাঁধে হাত রেখে বলত, "কারণ মানুষ তো শুধু রক্তমাংসের পিণ্ডে বাঁচে না রে তিস্তা, মানুষ বাঁচে সেই কল্পনায়, যা তাকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার শক্তি দেয়।"
অথচ কলকাতায় অর্কপ্রভর নিজস্ব জগতটাও কোনো স্বর্গের রূপকথা ছিল না। তার মার্বেল মোড়া আধুনিকতার নেপথ্যে ছিল এক সুগভীর, দীর্ঘমেয়াদী একাকিত্ব। তার স্ত্রী নিজস্ব কর্পোরেট কেরিয়ার আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বহুদূরে বিচ্ছিন্ন, ছেলেও নিজের বিলাসবহুল জীবন নিয়ে ব্যস্ত। হাজারটা অনুরাগীর প্রশংসা আর সস্তা স্তুতির মাঝেও অর্কপ্রভর হৃদয় জুড়ে এক হাহাকার ও শূন্যতা বিরাজ করত।
সেই শূন্যতার টানেই সে ডুব দিয়েছিল শিলিগুড়ির এই গৃহবধূর নির্জন ডাগর চোখের গভীরে। তিস্তার তৈরি কাঁথা স্টিচের সুতোয় সে খুঁজে পেয়েছিল এক আদিম, খাঁটি ও নিষ্কলঙ্ক মাটির গন্ধ—যা শহরের কৃত্রিম আলোয় পাওয়া যায় না। অর্কপ্রভ অনুভব করেছিল, নয়নিকা কোনো ক্ষণিকের আকর্ষণ নয়, নয়নিকা তার সাহিত্যের সেই মূল চরিত্র, যাকে সে আজীবন খুঁজে এসেছে।
শারদোৎসবের দিনগুলোতে শিলিগুড়িতে যখন উৎসবের আলো জ্বলত, অলকের মদ্যপানের মাত্রা তখন হিংস্রতায় রূপ নিত। সপ্তমীর রাতে সে অতিরিক্ত মাতাল হয়ে ঘরে ঢুকে তিস্তার ব্লাউজের কলার ধরে ঝাঁকিয়ে উঠেছিল।
"কী রে! নতুন শাড়ি কেনার শখ হয়েছে? তোর বাপের কি তালুক আছে? বাজারে আমার লাখ টাকা ধার! তুই ভেবেছিস আমি ট্রেন চালাবো আর তুই রাজরানি হয়ে বসে থাকবি?"
সেই অন্ধকার রাতে অলকের পাশবিক আচরণের পর তিস্তা যখন বাথরুমে গিয়ে বেসিনের ঠান্ডা জলে নিজের মুখ আর চোখের রক্তাভ দাগ ধুচ্ছিল, তখন শোবার ঘরে বালিশের নিচে রাখা ফোনটা সাইলেন্ট মোডে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অর্কপ্রভর সদ্য লেখা কবিতা—
"যেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া ধূসর হয়ে আসে,
নয়নিকা একা বসে থাকে ভাঙা জানালার পাশে...
জানি দূরত্ব অনেক, তবু তোর চোখের ওই নিবিড় চাওয়া,
আমার মরুপথে একমাত্র ভিজে বাতাস পাওয়া।"
অষ্টমীর সকালে ভিডিও কলে অর্কপ্রভ দেখেছিল তিস্তার লাল হয়ে যাওয়া চোখের কোণ আর থুতনির নিচে চাপা রক্তের দাগ। অর্কপ্রভ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্ক্রিনের ওপারে। তারপর শান্ত ও গভীর কণ্ঠে বলেছিল, "নয়নিকা, রক্তমাংসের গায়ে দামি জামাকাপড় না থাকলেও চলে। আমাদের এই বন্ধনটা কোনো বাহ্যিক পোশাকে বা সামাজিক আচারে আটকে নেই, তা রয়েছে আমাদের আত্মিক নিবিড়তায়। তুমি শুধু নিজের ভেতরের আলোটাকে নিভতে দিও না।"
নবমীর রাতে অলক বাজার থেকে আনা একটা সস্তা, কটু গন্ধওয়ালা কৃত্রিম শাড়ি ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে বলেছিল, "নে, তোর ওই কলকাতার সাহিত্যিক বাবু তোকে শাড়ি পাঠায়নি, আমি দিলাম। পর দেখি তোর কত শখ!"
অপমান আর কান্নায় তিস্তার বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করল না। সে নীরব নিস্তব্ধতায় কেবল ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে এনজেপি ইয়ার্ডের ট্রেনের হুইসেলের শব্দ কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছিল।
শিলিগুড়ির সেবক রোডের সরু গলির ভেতরে তিস্তার বাপের বাড়ি—‘অন্নপূর্ণা স্টোর’। চাল-ডালের বস্তার গন্ধ, কেরোসিনের টিন আর লাল কালির হিসাবের পাতায় তিস্তার বৃদ্ধ বাবা বিভূতিভূষণের সারা জীবন কেটেছে। অভাবের সংসার হলেও মেয়েকে বড্ড ভালোবাসতেন তিনি। তিস্তার ওই শীর্ণ মুখটার দিকে তাকালেই বিভূতিভূষণের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হতো, "তোকে কোন নরকে পাঠালাম রে মা! আমি যে আর সইতে পারি না।"
অলকের অত্যাচার যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যেত, তিস্তা মাঝে মাঝে বাপের বাড়ি ছুটে যেত। মায়ের কোলে মাথা গুঁজে কত দিন সে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। মা চুলে হাত বুলিয়ে বলতেন, "সংসার করতে গেলে একটু সহা শিখতে হয় রে তিস্তা! লোকোপাইলট স্বামী... সমাজটাকে তো দেখতে হবে। একটু মানিয়ে নে মা।"
কিন্তু তিস্তার ছোট ভাই শুভঙ্কর ছিল অন্য ধাতুতে গড়া। বাপের ওই জীর্ণ দোকান কিংবা বোনের যন্ত্রণার প্রতি তার কোনো সহানুভূতি ছিল না। শহরের দিশাহীন যুবকদের মতো সে কেবল বাইক আর বন্ধুদের আড্ডা নিয়েই মেতে থাকত। বাবা যখন বলতেন, "শুভ, বোনের দিকে একটু তাকা!", শুভঙ্কর ঠান্ডা গলায় উত্তর দিত, "আমি কারোর ঠিকা নিইনি। যার যার কপাল তার তার। ও কেন সহ্য করে বসে আছে?"
বাস্তব জীবনের এই নির্মম নিঃসঙ্গতা আর চারপাশের উদাসীনতা তিস্তাকে ভেতরে ভেতরে এক অবিচল পাথরে পরিণত করছিল। অলকের প্রতিদিনের সেই চেনা হুমকি, "তোকে তাড়িয়ে দেব, ডিভোর্স দেব!" শুনতে শুনতে তিস্তার মনের সমস্ত ভয় কেটে গিয়েছিল। সে মনে মনে ভাবত, অলক যদি সত্যি তাকে একদিন তাড়িয়ে দেয়, তবে সে অন্তত এই যান্ত্রিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবে।
বাপের বাড়ির ছোট্ট মুদির দোকানের পেছনে একটা অবহেলিত, ঘাসজমে থাকা পৈতৃক জমি ছিল। সেই জমিটার ছবি তিস্তা কতবার মোবাইলে তুলে পাঠিয়েছে অর্কপ্রভকে।
"দেখো আকাশদা, এই জমিতে আমি একদিন একটা ছোট্ট লাল ইঁটের ঘর তুলব। চারপাশে রজনীগন্ধা পুঁতব। আমার ছেলে আবির বড় হয়ে ডাক্তার বা অন্য কিছু হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ালে আমি এই মেকি সংসার ছেড়ে ওখানেই একা থাকব। নিজের হাতে সেলাই করব, আর নিজের মতো নিঃশ্বাস নেব।"
অর্কপ্রভ স্ক্রিনের ওপার থেকে পরম মমতায় বলত, "নয়নিকা, কলকাতার এই অভিজাত ফ্ল্যাটের মার্বেল মোড়া মেঝের চেয়েও তোমার ওই ঘাসজমে থাকা জমিটা আমার কাছে অনেক বেশি খাঁটি। তুমি সেখানে একরঙা সুতির শাড়ি পরে কাঠের মোড়ায় বসে চা খাবে, আর আমি তোমার জানালার বাইরে এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে দাঁড়াব। আমাদের এই ভার্চুয়াল সংযোগ কোনো সাময়িক মোহ নয় নয়নিকা, এ আমাদের আত্মিক আশ্রয়।"
এই কল্পনার সমান্তরাল জগতটাই ছিল তিস্তার দৈনন্দিন নরকযন্ত্রণার মাঝে বেঁচে থাকার একমাত্র সঞ্জীবনী রসদ।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একদিন তিস্তার সেলাই মেশিনের চাকাটা স্তব্ধ হয়ে বসেছিল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। অর্কপ্রভর মেসেজ এল, "নয়নিকা, কলকাতার বাতাস আজ বড় ভারি। আমার খুব নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমাদের সেই লাল ইঁটের ঘরের স্বপ্নটা আজও জীবন্ত আছে তো?"
তিস্তার চোখের জল ঝরে পড়েছিল সেলাইয়ের সুতির কাপড়ের ওপর। সে টাইপ করল, "হ্যাঁ আকাশদা, ওটাই তো আমার একমাত্র সত্যি।"
কিন্তু এর ঠিক দু’দিন পরেই ঘটল সেই অনভিপ্রেত ঘটনা। রিমি একদিন হাঁপাতে হাঁপাতে তিস্তার ঘরে ঢুকে বলল, "তিস্তা! কলকাতার একটা নামী দৈনিকে অর্কপ্রভর একটা সাক্ষাৎকার বেরিয়েছে... সেখানে তোকে আর তোর কাঁথা স্টিচ নিয়ে ইঙ্গিত করেই লেখা হয়েছে। কিন্তু তিন দিন ধরে ওনার ফোন বন্ধ! সাহিত্যপাড়ায় গুঞ্জন... ওনাকে নাকি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, অবস্থা আশঙ্কাজনক!"
তিস্তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। যে মানুষটা তার ভার্চুয়াল অস্তিত্বের একমাত্র আলো, সে কি তবে তাকে কোনো কিছু না জানিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে?
তার পরদিনই এল সেই আইসিইউ-এর ডাক্তারবাবুর ফোন।
"আপনি কি তিস্তা দেবী? অর্কপ্রভ রায় গত দু’বছর ধরে ম্যালিগন্যান্সিতে (ফুসফুসের ক্যানসার) আক্রান্ত হয়ে আমাদের এখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি আপনাকে এই সংবাদটা দিতে বলেছিলেন এবং আপনার ঠিকানায় একটা রেজিস্ট্রি ডাক পাঠাতে বলে গেছেন..."
বিজয়া দশমীর সকালে সারা শিলিগুড়িতে যখন বিসর্জনের বিষাদ ঘন বাজনা বাজছিল, তিস্তার কোয়ার্টারে তখন এক চিরন্তন নিস্তব্ধতা। বিকেলের দিকে কুরিয়ার বয় এসে দিয়ে গেল একটা ভারী খাম।
খাম খুলতেই বেরিয়ে এল কাঁথা স্টিচের সেই কুর্তির এক ফালি লাল সুতো, একটি পুরোনো চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি আর এক টুকরো চিরকুট।
"প্রিয় নয়নিকা,
তুমি হয়তো ভাবছ আমি তোমার কাছে সত্যিটা লুকোলাম। ক্যানসারের কথা বলিনি কারণ, আমি চেয়েছিলাম তুমি আমার রচনার ভেতরে একটা জীবন্ত মানুষকে খুঁজে পাও—যে তোমার দুঃখটা বুঝতে পারে, কোনো করুণা না দেখিয়ে। আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে তোমার অলকের অত্যাচার, বাপের বাড়ির অবহেলা আর ওই ঘাসজমে থাকা জমির প্রতিটি ধূলিকণা অনুভব করেছি। তোমায় বাস্তবে হয়তো গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যেতে পারিনি, কিন্তু আমার প্রতিটি উপন্যাসের প্রধান চরিত্রে আমি তোমাকেই রেখেছি। আমার এই শেষ ডায়েরিটা তোমার রইল। আবিরকে মানুষ করো। আমাদের মানসিক ভালোবাসা কোনো নশ্বর শরীরের খাঁচায় বন্দি ছিল না, তা মুক্ত।
অর্কপ্রভর প্রয়াণের পর তিস্তার জগতটা প্রথমে এক নির্জন শ্মশান হয়ে গিয়েছিল। সে দিনরাত শুধু অর্কপ্রভর রেখে যাওয়া ডায়েরির পাতাগুলো ওল্টাত আর বুকের মধ্যে চেপে ধরে বসে থাকত। ডায়েরির পাতায় পাতায় লেখা ছিল তিস্তার প্রতি তার গভীর আবেগ, সহানুভূতির অনুচ্ছেদ আর জীবনের শেষ মুহূর্তের যন্ত্রণার কথা।
এদিকে বাস্তব জীবন তার নিজস্ব নির্দয় নিয়মে এগিয়ে চলল। অলকের মদের নেশা এতটাই বাড়ে যে, লং রুটের ট্রেন চালাতে চালাতে একদিন এনজেপি ইয়ার্ডে শান্টিংয়ের সময় সে চরম অসাবধানতার পরিচয় দেয়। লোকোমোটিভের নিচে চাপা পড়ে তার দুটো পা-ই পাকাপাকিভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। যে লোকোপাইলট একদিন ক্ষমতার অহংকারে তিস্তাকে পদে পদে লাঞ্ছিত করত, কপালে লাথির দাগ দেওয়ার কথা বলত, আজ সে নিজে একখানা হুইলচেয়ারের কোণে বসে অসহায় প্রাণীর মতো দিন গুজরান করতে লাগল।
কিন্তু তিস্তা আর ভাঙল না। তার ভেতরের সমস্ত ভয় আর ভীতি মরে গিয়ে সেখানে দানা বেঁধেছিল এক অদ্ভুত, পাথুরে শান্তি। সে অলককে ছেড়ে চলে গেল না; আবার অলকের প্রতি কোনো বিষোদ্গারও দেখাল না। সে এক পঙ্গু মানুষকে নিছক মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে সেবা করে যেতে লাগল—যে সেবার ভেতরে কোনো অনুরাগ ছিল না, ছিল কেবল এক অপরিসীম বৈরাগ্য।
বছর চারেক পর, আবির দক্ষিণ ভারত থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রি নিয়ে একজন আত্মবিশ্বাসী, মার্জিত তরুণ ডাক্তার হয়ে শিলিগুড়িতে ফিরে এল। সে তার মায়ের জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা নীরব প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বুঝেছিল। বাপের সেই অবহেলিত পৈতৃক ভিটের জমিটায় আবির নিজের উপার্জনে দাঁড় করিয়ে দিল একটি সুন্দর, ছোট লাল ইঁটের ঘর। চারদিকে রজনীগন্ধা আর বেলফুলের গাছে সাজানো হলো সেই শান্ত উঠান।
বিজয়া দশমীর এক নতুন সকালে সেই নতুন লাল ইঁটের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিস্তা। তার পরনে একখানা হালকা সুতির শাড়ি, গায়ে জড়ানো গেরুয়া চাদর। কপালে লাল সিঁদুরের এক উজ্জ্বল ফোঁটা, আর হাতে শাঁখা-পলার মৃদু আওয়াজ। অলক আজ বহু দূরে এক অন্ধকার ঘরের কোণে হুইলচেয়ারে বসে নিজের নিঃসঙ্গ কর্মফলের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। আর তিস্তা? তিস্তা আজ আর কোনো যান্ত্রিক সংসারের পেষাই হওয়া বস্তু নয়।
সেলাইয়ের ফ্রেমটা কোলে নিয়ে তিস্তা সুঁচের ডগায় লাল সুতো পরিয়ে কাপড়ের বুকে নতুন ফোঁড় দিতে লাগল।
হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল অলকের পুরোনো কোয়ার্টারের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা—যেখানে রাখা ছিল একটা ভাঙা স্ক্রিনের স্মার্টফোন, আর তার ভেতরে আটকে থাকা অজস্র নীল বার্তা।
তিস্তা বুঝতে পারল, অর্কপ্রভ রায় আসলে কোনো সাধারণ রক্তমাংসের পুরুষ ছিলেন না; অর্কপ্রভ ছিলেন তিস্তার নিজেরই মনের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সেই সৃজনশীল সত্তা ও আত্মবিশ্বাস, যা তাকে ওই নরককুণ্ডে নিঃশ্বাস নেওয়ার শক্তি দিয়েছিল। ভার্চুয়াল দুনিয়ার সেই মায়াজাল আজ কেটে গেছে, স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু তার সুবাদে তিস্তা খুঁজে পেয়েছে তার নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব।
বাতাসে তখন উত্তরবঙ্গের শীতের প্রথম হিমেল স্পর্শ নামছে। দূরে নদীর স্রোত কুয়াশায় হারিয়ে গেছে, আর সেই স্রোতের টানে ধুয়েমুছে গেছে সমস্ত কৃত্রিম আলো ও ছায়ার মরীচিকা। জীবন তার আপন, নির্মম ও সুন্দর সত্য নিয়ে নদীর মতো বয়ে চলেছে অনন্তের দিকে—যেখানে কোনো কৃত্রিম সংযোগ নেই, কেবলই নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক পরম ও নীরব মুক্তি।
0 Comments.