Fri 23 October 2026
Cluster Coding Blog

T3 - বিজয়া সংখ্যায় স্বপ্ননীল বিশ্বাস

maro news
T3 - বিজয়া সংখ্যায় স্বপ্ননীল বিশ্বাস

একচালা থেকে ‘বাংলার বদলে যাওয়া দূর্গার গল্প 

দুর্গার রূপে বদলে যাওয়া বাঙালির ইতিহাস  

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস আসলে কেবল একটি প্রতিমার ইতিহাস নয়। এটি বাঙালির রুচি, নন্দনচেতনা, সমাজভাবনা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আখ্যান। যে বাংলায় একদিন একই চালচিত্রের নিচে দেবী দুর্গা তাঁর চার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরতেন, সেই বাংলাতেই আজ তিনি কখনও মৃৎশিল্পের নিপুণ শরীরী ভাষায়, কখনও লোকশিল্পের অনুষঙ্গে, কখনও সমকালীন শিল্পের বিমূর্ততায়, আবার কখনও আধুনিক পোশাক ও ফ্যাশনের ছোঁয়ায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হন।


সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রতিমার কাঠামো, মুখের আদল, চোখের ভাষা, পোশাক, অলংকার, চালচিত্র, মণ্ডপ এবং এমনকি দর্শকের দেখার চোখটিও। অথচ এত পরিবর্তনের পরেও একটি জায়গায় আশ্চর্য স্থিরতা রয়ে গেছে—বাঙালির দুর্গাকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।


দুর্গা তাই বাংলায় শুধু পুরাণের দেবী নন। তিনি একই সঙ্গে উমা, কন্যা, জননী, শক্তি, উৎসব এবং শিল্পের কেন্দ্র। তাঁকে ঘিরে বাঙালি শুধু পূজা করেনি; নিজের সময়, নিজের সমাজ এবং নিজের সৌন্দর্যবোধকেও বারবার নতুন করে প্রকাশ করেছে।


একচালার নিচে যে সংসার


সাবেকি বাংলার দুর্গাপ্রতিমার দিকে তাকালেই প্রথমে চোখে পড়ে তার পারিবারিক বিন্যাস। মাঝখানে দুর্গা, তাঁর দুই পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী, নিচে বা পাশে কার্তিক ও গণেশ—সবাই যেন একই সংসারের মানুষ, একই ছাদের তলায়। এই একচালা বিন্যাস বাংলার প্রতিমাশিল্পের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্য।


কিন্তু এই একচালা কেবল একটি নির্মাণপ্রণালী নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালির এক গভীর সাংস্কৃতিক কল্পনা।


পুরাণের মহিষাসুরমর্দিনী যেখানে অসুরবিনাশী শক্তির প্রতীক, বাঙালির কল্পনায় সেই দেবীই আবার হয়ে উঠেছেন বাপের বাড়ি আসা মেয়ে। তাঁর সঙ্গে এসেছে তাঁর সন্তানরা। ফলে যুদ্ধরত দশভুজা আর ঘরের মেয়ে উমা—দুটি পৃথক অনুভূতি এসে মিশেছে একই প্রতিমার শরীরে।


এই কারণেই একচালা দুর্গার দিকে তাকালে শুধু দেবীমূর্তি চোখে পড়ে না; চোখে পড়ে একটি সংসার।


দেবী এখানে দূরের আকাশের কোনো অলৌকিক শক্তি নন। তিনি ঘরের মানুষ। তিনি আসেন, কয়েকটা দিন থাকেন, ঘর ভরিয়ে দেন, তারপর আবার চলে যান। তাঁর আসা-যাওয়ার সঙ্গে বাঙালির নিজের ঘর, নিজের মেয়ে, নিজের মায়ের স্মৃতিও যেন কোথাও মিশে থাকে।


দুর্গার বাংলায় আসা


বাংলায় দুর্গাপূজার সূচনা নিয়ে ইতিহাসে একাধিক মত রয়েছে। তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ, নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদার কিংবা সাবর্ণ পরিবারের লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের নাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক বয়ানে পাওয়া যায়। কিন্তু কে প্রথম—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট, সর্বসম্মত উত্তর ইতিহাস এখনও দেয়নি।


এই অনিশ্চয়তাই বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে আমাদের নিয়ে যায়। বাংলার দুর্গাপূজা কোনও একটি পরিবার, কোনও একটি রাজবাড়ি, কোনও একটি বছর কিংবা কোনও একটি অঞ্চলের একক সৃষ্টি নয়। বিভিন্ন সময়ের রাজপরিবার, জমিদার, গৃহস্থ, পুরোহিত, কারিগর এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই বাংলার মাটিতে দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ পেয়েছে।


অর্থাৎ দুর্গা বাংলায় এসেছিলেন শুধু দেবী হয়ে নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিরও একটি অংশ।


রাজবাড়ির আঙিনা থেকে কলকাতার বাবুসমাজ


অষ্টাদশ শতকে কলকাতার উত্থানের সঙ্গে দুর্গাপূজার সামাজিক চরিত্রেও পরিবর্তন আসে। শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ।


নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপূজাকে ঘিরে নানা কাহিনি প্রচলিত। ক্লাইভের উপস্থিতি, কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক, বিপুল আড়ম্বর—সব মিলিয়ে এই পূজা ঔপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এইসব কাহিনির সব অংশের সমান ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই; কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে সেই সময় দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচারকে ছাড়িয়ে সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ এবং ক্ষমতার প্রকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।


কার বাড়িতে কত বড় আয়োজন, কত মানুষ এলেন, কী সাজসজ্জা হল—এসবও ধীরে ধীরে সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে থাকে।


দুর্গা তখন শুধু পূজিত হচ্ছেন না; তাঁকে ঘিরে নির্মিত হচ্ছে সামাজিক প্রতিপত্তির এক মঞ্চ।


তারপর এল বারোয়ারি


কিন্তু ইতিহাসের চাকা এক জায়গায় থেমে থাকে না।


রাজবাড়ির অন্দরমহল পেরিয়ে দুর্গা ধীরে ধীরে চলে এলেন মানুষের পাড়ায়। ব্যক্তিগত পূজা থেকে জন্ম নিল সমষ্টিগত আয়োজন। গুপ্তিপাড়ার সঙ্গে বারোয়ারি পূজার যে প্রচলিত কাহিনি জড়িয়ে আছে, সেখানে কয়েকজন মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলা হয়। এই কাহিনির ঐতিহাসিক বিবরণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও ‘বারোয়ারি’ ধারণার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না।


কারণ এখানেই পূজার মালিকানা বদলাতে শুরু করল।


দুর্গা আর শুধু কোনও একটি পরিবারের দেবী রইলেন না। তিনি হয়ে উঠলেন বহু মানুষের দেবী।


কলকাতায় বিংশ শতকের গোড়ায় সর্বজনীন পূজার সংগঠিত বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও শক্তিশালী করে। ১৯১০ সালের ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডের পূজাকে কলকাতার সর্বজনীন দুর্গাপূজার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে বাগবাজারসহ শহরের নানা প্রান্তে এই ধারার বিস্তার ঘটে।


দুর্গা তখন রাজবাড়ির মা থেকে হয়ে উঠলেন—


পাড়ার মা।


পাড়ার মা থেকে শহরের শিল্প


সর্বজনীন পূজা যত বিস্তৃত হল, ততই বাড়ল প্রতিমার চাহিদা। আর সেই চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল মৃৎশিল্পীর কাজের পরিসরও।


কলকাতার কুমোরটুলি এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাটি, খড়, বাঁশ আর শিল্পীর হাত—এই কয়েকটি সাধারণ উপাদান দিয়েই সেখানে তৈরি হতে লাগল অসংখ্য দেবীমূর্তি। কিন্তু প্রতিমা নির্মাণ ধীরে ধীরে শুধুই ধর্মীয় প্রয়োজন মেটানোর কাজ থাকল না; তার সঙ্গে যুক্ত হল নান্দনিকতা, দর্শকের প্রত্যাশা এবং শিল্পীর নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা।


আগে মানুষ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করত।


এখন মানুষ দাঁড়িয়ে প্রতিমাকে দেখতেও শুরু করল।


দেবীর মুখ কেমন? চোখ কেমন? সাজ কেমন? শরীরের ভঙ্গি কেমন? অলংকার কেমন?—এই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।


এই জায়গাতেই দুর্গাপ্রতিমা ধীরে ধীরে ধর্মীয় প্রতীক থেকে জনসমক্ষে উপস্থিত একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপের দিকে এগিয়ে গেল।


গোপেশ্বর পাল : ঐতিহ্যের ভিতর আধুনিকতার দরজা


কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পের বিবর্তনে গোপেশ্বর পালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৫ সালে কুমোরটুলি সর্বজনীন দুর্গাপূজার জন্য তাঁর নির্মিত প্রতিমাকে গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রচলিত প্রতিমার রীতিকে নতুনভাবে ভাবার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল বলে শিল্প-ইতিহাসের আলোচনায় উঠে আসে।


এই ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু একটি প্রতিমার নির্মাণে নয়।


এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য মানে স্থির হয়ে থাকা নয়।


ঐতিহ্যের ভিতরেই পরিবর্তনের বীজ থাকে।


পুরনোকে অস্বীকার না করেও তাকে নতুনভাবে দেখা যায়। পুরনো কাঠামোর ভিতর থেকেই জন্ম নিতে পারে নতুন শিল্পভাষা।


মুখ বদলাল, চোখ বদলাল


দুর্গাপ্রতিমার বিবর্তনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম জায়গাগুলির একটি হল দেবীর মুখ।


কখনও গোল মুখ, কখনও দীর্ঘায়ত। কখনও বড় টানা চোখ, কখনও চোখে এসেছে আধুনিক রেখার ছাপ। কখনও দেবীর মুখে মাতৃত্বের কোমলতা, কখনও সেখানে যুদ্ধজয়ের দৃঢ়তা। কখনও তিনি যেন বাংলার ঘরের মেয়ে, কখনও রাজকীয়, কখনও লোকশিল্পের চরিত্র, আবার কখনও সমকালীন নারীর এক প্রতীকী মুখ।


শিল্পী তখন আর শুধু মাটি দিয়ে দেবী তৈরি করছেন না। তিনি নিজের সময়কেও দেবীর মুখে এঁকে দিচ্ছেন।


সমাজে নারীর যে অবস্থান, মানুষের যে সৌন্দর্যবোধ, শিল্পীর যে কল্পনা—সবকিছুই কোনও না কোনওভাবে এসে পড়ছে প্রতিমার শরীরে।


তাই প্রতিমার মুখ বদলানো মানে শুধু শিল্পীর হাত বদলানো নয়; কখনও কখনও তা একটি সময়ের মানসিকতারও পরিবর্তন।


একচালা ভাঙল, কিন্তু সংসার ভাঙল না


আধুনিকতার পথে আরও একটি বড় পরিবর্তন হল একচালা কাঠামো থেকে পৃথক প্রতিমার দিকে যাত্রা।


দুর্গা আলাদা। লক্ষ্মী আলাদা। সরস্বতী আলাদা। কার্তিক আলাদা। গণেশ আলাদা।


একই চালের নিচে থাকা সংসার যেন ছড়িয়ে গেল মণ্ডপের বৃহত্তর পরিসরে।


কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—সংসারটি ভাঙল না।


সম্পর্ক রয়ে গেল। দেবী রইলেন কেন্দ্রবিন্দুতে, সন্তানরা রইলেন তাঁর চারপাশে।


শুধু শিল্পীর হাতে তৈরি হল নতুন স্বাধীনতা। প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা করে নির্মাণ করা গেল, আলাদা ভঙ্গি দেওয়া গেল, আলাদা আলোয় দেখা গেল। মণ্ডপও হয়ে উঠল আরও গতিশীল।


একচালা ভেঙেছে, কিন্তু সম্পর্ক ভাঙেনি।

রূপ বদলেছে, সংসার বদলায়নি।


প্রতিমা যখন ‘থিম’


তারপর এল আর-এক বিপ্লব—থিম।


মণ্ডপ আর শুধু দেবীর আশ্রয় হয়ে রইল না। মণ্ডপ নিজেই হয়ে উঠল একটি শিল্পকর্ম। বাঁশ, কাপড়, কাঠ, মাটি, কাগজ, ধাতু, আলো, শব্দ, লোকশিল্প, স্থাপত্য—সব মিলিয়ে তৈরি হতে লাগল অস্থায়ী শিল্পের একেকটি পৃথিবী।


দুর্গাপূজা তখন আর শুধু প্রতিমা দেখার উৎসব নয়।


এটি হয়ে উঠল দেখার, ভাবার এবং অনুভব করার উৎসব।


কোনও মণ্ডপ গ্রামবাংলার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, কোনওটি হারিয়ে যাওয়া কারুশিল্পকে সামনে আনছে, কোনওটি পরিবেশের কথা বলছে, কোনওটি সামাজিক প্রশ্ন তুলছে। শিল্পী ও কারিগরের কাজ এক জায়গায় এসে মিশছে।


২০২১ সালে UNESCO কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের Representative List-এ অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে কলকাতার দুর্গাপূজার যে শিল্প, কারুশিল্প, জনঅংশগ্রহণ এবং অস্থায়ী মণ্ডপ-সংস্কৃতি—তার আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক গুরুত্বও স্বীকৃতি পায়।


আর এখানেই ‘হাফ ফ্যাশনের দুর্গা’


‘হাফ ফ্যাশনের দুর্গা’ কোনও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শিল্পরীতির নাম নয়। এটি বরং আমাদের সময়ের একটি কথ্য অভিব্যক্তি—যার মধ্য দিয়ে বোঝানো যায় সেই দুর্গাকে, যাঁর সাজ, পোশাক, অলংকার, চুলের বিন্যাস, মুখের রেখা কিংবা শরীরী ভঙ্গিতে আধুনিক নকশা ও সমকালীন ফ্যাশনের প্রভাব এসে পড়েছে।


দেবীর শাড়ির ধরন বদলেছে।


অলংকারে এসেছে নতুন নকশা।


চুলের বিন্যাসে এসেছে নতুন ভাবনা।


মুখে এসেছে নতুন রেখা।


কখনও দেবীর পোশাক প্রায় সমকালীন নারীর পোশাকের ভাষা ধার করেছে।


এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ কি ঐতিহ্যের ক্ষয়?


নাকি ঐতিহ্যেরই নতুন রূপ?


সম্ভবত উত্তরটি এত সরল নয়।


কারণ বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসই আমাদের শেখায়—দুর্গার রূপ কখনও স্থির ছিল না। সময়ের সঙ্গে তিনি বদলেছেন। শিল্পীর হাত বদলেছে, সমাজের রুচি বদলেছে, দর্শকের চোখ বদলেছে।


তাই আজকের দুর্গার আধুনিক পোশাকও সেই দীর্ঘ পরিবর্তনেরই আর-এক অধ্যায়।


মাটি কিন্তু একই


এত পরিবর্তনের পরেও একটি জায়গায় এসে সব দুর্গা যেন এক।


মাটি।


খড়ের কাঠামো। বাঁশের ভিত। মাটির স্তর। শিল্পীর হাত। শুকিয়ে ওঠা মুখ। তারপর রং, সাজ, অলংকার এবং চোখের সেই শেষ আঁচড়।


গঙ্গার মাটি দিয়ে তৈরি প্রতিমা শেষ পর্যন্ত আবার জলের কাছে ফিরে যায়। মহালয়ার সময় চোখ আঁকার মধ্য দিয়ে যে দেবীমূর্তি পূর্ণতার দিকে এগোয়, দশমীর বিসর্জনে সেই মূর্তিই আবার মাটির সঙ্গে মিশে যায়।


এই চক্রের মধ্যে যেন বাংলার দুর্গাপূজার গভীরতম দর্শনটি লুকিয়ে আছে।


যেখান থেকে এসেছেন, শেষ পর্যন্ত সেখানেই ফিরে যাওয়া।


তাই দুর্গা যতই আধুনিক পোশাকে আসুন, যতই তাঁর অলংকার বদলাক, যতই তাঁর শরীরী ভাষা সমকালীন হোক—শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীর মাটিরই।


দুর্গা বদলেছেন, নাকি আমরা?


এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো আমাদের নিজেদের দিকেই তাকাতে হবে।


একচালা দুর্গার মধ্যে যে সৌন্দর্য আমাদের পূর্বপুরুষ দেখেছিলেন, সেটি ছিল তাঁদের সময়ের সৌন্দর্যবোধ।


আজকের থিমের দুর্গায় আমরা যে সৌন্দর্য খুঁজে পাই, সেটি আমাদের সময়ের।


আর আগামী প্রজন্ম যে দুর্গা তৈরি করবে, তার রূপ হয়তো আজ আমাদের কল্পনারও বাইরে।


তাহলে বদলটা কি দুর্গার?


নাকি আমাদের?


আসলে দুটিই।


কারণ বাঙালি তার সময়কে বারবার দেবীর শরীরে এঁকে দিয়েছে।


কখনও তাঁকে দিয়েছে কন্যার মুখ।

কখনও জননীর।

কখনও শক্তির।

কখনও শিল্পীর কল্পনার নারীর।

কখনও সমকালীন সমাজের প্রশ্নের ভাষা।


দুর্গা যেন প্রতি বছর ফিরে এসে আমাদের সময়টাকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন।


শেষ কথা : দুর্গা আসলে বাংলার আয়না


একচালা থেকে একক প্রতিমা।


রাজবাড়ি থেকে বারোয়ারি।


বারোয়ারি থেকে সর্বজনীন।


সর্বজনীন থেকে থিম।


থিম থেকে সমকালীন শিল্প।


আর সেই সমকালীন শিল্পের পথ ধরে আধুনিক পোশাক, আধুনিক নন্দনতত্ত্ব, আধুনিক শরীরী ভাষা—‘হাফ ফ্যাশনের দুর্গা’।


এই দীর্ঘ যাত্রাকে যদি শুধু ‘পুরনো ভালো, নতুন খারাপ’ কিংবা ‘নতুনই শ্রেষ্ঠ’—এই দুই ভাগে ভাগ করি, তাহলে বাংলার দুর্গাপূজার প্রকৃত ইতিহাসকে আমরা খুব ছোট করে ফেলব।


কারণ বাংলা কখনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনি।


বাঙালি গ্রহণ করেছে, বদলেছে, কখনও পুরনোকে আঁকড়ে থেকেছে, কখনও পুরনোকে নতুন করে আবিষ্কার করেছে। সেই পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁকে দুর্গাও পেয়েছেন নতুন রূপ।


তবু শরৎ এলে আজও কাশফুল দোলে।

শিউলির গন্ধ ভেসে আসে।

ঢাকের শব্দ দূর থেকে কাছে আসে।

মণ্ডপে আলো জ্বলে ওঠে।


আর বাঙালি অপেক্ষা করে তাঁর জন্য।


তিনি আসেন—কখনও একচালার নিচে, কখনও মাটির সরল সৌন্দর্যে, কখনও শিল্পীর কল্পনায়, কখনও আধুনিকতার পোশাকে।


কিন্তু তাঁর চোখের দিকে তাকালে বাঙালি এখনও সেই উমাকেই খুঁজে নেয়—যে উমা শরৎকালে বাবার বাড়ি আসেন, কয়েকটা দিন ঘর ভরিয়ে রাখেন, তারপর দশমীর বিকেলে আবার চলে যান।


মাটি থেকে উঠে আসেন।

মানুষের ঘরে থাকেন।

মানুষের চোখে নতুন রূপ নেন।

তারপর আবার মাটিতে ফিরে যান।


এই আসা আর ফিরে যাওয়ার মধ্যেই বাংলার দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় ইতিহাস।


দুর্গার রূপ যতবার বদলেছে,

বাঙালিও ততবার নিজের নতুন মুখ আবিষ্কার করেছে।


আর সেই কারণেই দুর্গা শুধু বাংলার পূজিত দেবী নন—

দুর্গা বাংলার সময়ের আয়না।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register