Fri 23 October 2026
Cluster Coding Blog

T3 - বিজয়া সংখ্যায় নীলম সামন্ত

maro news
T3 - বিজয়া সংখ্যায় নীলম সামন্ত

আশ্বিনের ক্যামোফ্লাজ

ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী কাটিয়ে আজ বিজয়া দশমী। বহুবছর গ্রামবাংলা থেকে দূরে৷ শুনেছি এবছর রূপনারায়নের গা ঘেঁষে ঝাঁকে ঝাঁকে কাশফুল ফুটেছে। প্রতি বছরই ফোটে আর দুরপাল্লার ট্রেন চলে যাবার সময় গমকে দুলে ওঠে সারা শরীর৷ কতকাল এসব দেখিনি... এখানে শরত নেই৷ রাতের দিকে রাস্তায় বেরলে হেমন্তের বাতাস, ঘন ছাতিমের গন্ধ, হাৎস্নুহানাও পথ ছাড়ে না৷ একদিন শিখেছিলাম হাৎস্নুহানাকে বর্গীরা রাত কি রানী বলে৷ এমন দিনে রানী তো কেবল আমার মা দুর্গা৷ দু'একদিন রোজকার নিয়ম ভঙ্গ করে তাঁরই সাথে আটপৌরে দেখা করা, ভিড়, বাংলা ভাষা, চন্ডীপাঠ সব মিলে হরিণাক্ষ দিন - দেখতে দেখতে অবশ্য সে সব কেটেই যায়৷  


সবই আছে তবু মাঝে মধ্যে এই উৎসবের দিনে বড় মায়ের অভাব হয়৷ এতো মা চারপাশে সন্তান হাতে করে মণ্ডপে যাচ্ছে, হাতে সবুজ কাঁচের চুড়ি, গলায় মঙ্গলসুত্র - দেখি না নরম আলতা পরা দু'টো পা, লাল পেড়ে শাড়ি, লম্বা একখানা হার ঝুলে আছে দীর্ঘ সময়। এখানে শুধু ভিড়- ছবি, শব্দ, বাংলা ছায়াছবি। সন্ধেতে মন্ডপে গিয়ে এই সবই দেখি৷ 


চারপাশ হলুদ ঘাসে মোড়া পাহাড় বেয়ে মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি নামছে। কালো জামদানীর আঁচল ঠিক করতে করতে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি তুলে আনি৷ রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাতারানীর মঞ্চ। দস্তাবেজের মতো কাপড় দিয়ে ঘেরা তার সাধারণ ছাউনি। ন' দিনে নয় রঙের আভরণে এক এক রূপে বসেন, দেখলে মনে হয় জমিদার বাড়ির বড় গিন্নি। পূজারি ভাবেন বাংলার পুজোতে ত্যাগ নেই৷ তর্ক জুড়ে দেন - কোন মতে বোঝাই মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছেন তাঁকে কি ত্যাগ করতে বলবেন না মহাড়ম্বরে ভরিয়ে দেবেন! মুখের মধ্যে স্পষ্ট জলছাপ৷ শিল্প আর ধর্ম কেমন যেন পাক খেতে থাকে৷ 

ইচ্ছে হয় চোরবাগানের দশভুজাকে দেখাই৷ হাতে অস্ত্র নেই, বসে আছেন বাবুয়ানি চালে- চোখের দিকে তাকালে দেখা যায় সমস্ত অস্ত্রসাজ ব্রহ্মান্ডের নিঃশ্বাসে অমলতাস ফুটিয়ে চলেছে। বলতে গিয়েও থেমে যাই৷ মরা মানুষের মুখ দাঁড়ায় লাইন ধরে৷ তাদের দাম ঘোষণা করা হয়েছে পঁচিশ লক্ষ৷ বিবর্ণ লাগে৷ ঠোঁট শুকিয়ে যায়৷ বোঝার চেষ্টা করি বাতাসে আদ্রতা কম নাকি শিল্পসংকটের ভ্রম। 


ভুলের মধ্যে পা মোচড় খেয়েছিল। সেই থেকে ক্যামোফ্লাজ নিয়ে নৌকা গড়ি। নদীর নাম লিখি। আর নবমীর রাতে গগনেন্দ্র নাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ছবিটা দেখি৷ কৈলাশগামী শক্তি সব কিছু আলো করে দিচ্ছে। অজস্র মানুষের ভিড়ে তিনি ভেসে যাচ্ছেন - অল্প অল্প করে সিঁদুর ধুয়ে যাচ্ছে, মায়ের এমন জলমুখের ছবি তুলতে আসেন অনেক মানুষ৷ ভিড়ের মধ্যে প্রকারভেদ তৈরি হয়৷ প্রেম নয়৷ কারণ যারা প্রেমের ভেতর চুমু খায় তাদের মুণ্ডপাত করছেন নগরপতি। আমরা শান্ত - বিসন্ন মনে একগাল হাসি নিয়ে কোনরকম বাজারে যাই৷ বাড়ি ফিরি। সাবান ঘষে ঘষে স্নান করি। পুজো দিতে দিতে দেখি ধুপের ধোয়া ঢুকে পড়ছে ঘর্মগ্রন্থিতে, প্রদীপের শিরদাঁড়ায় বড় হচ্ছে প্রকাশ। 


একে অপরকে দেখে সরু সরু স্রোত এসে ধাক্কা দেয়। আমার নদীর নাম হয় কোন এক কবিতার নামে৷ শোক, দুঃখ নিঙড়ে সে বয়ে চলেছে। সঙ্গে যাচ্ছে শোক। জ্বরা। যন্ত্রণা৷ দুর্গা রাগের মতো গমক ধরা দিলেই নিজেকে জড়িয়ে স্বীকার করি আপাত ঘুর্ণনে শোক ও শব জমজ সওদা। যেখানে আমরা দলে দলে পা দিই আর জ্বলে ওঠে রামায়ণের তপস্যাকারী ব্রাহ্মণ। সমাজ একেই দশেরা বলে ভুলে যেতে চায় মাটির গন্ধ মেশানো বাংলার ঐতিহ্য৷ ভুলে যায় শক্তির অপরনাম নারী - স্রেফ পুজোতে নয়, জীবন সংগ্রামে হেরে যাওয়া, জিতে যাওয়া মাংসপিণ্ড। যার ভোগে দলে দলে পাহাড় কেনে কুকুর, শুকোর ও স্ট্যান্ডয়াপ কমিডিয়ান৷

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register