- 60
- 0
দুর্গা ঠাকুর
আজকের দিনে দুর্গা পুজো করা যেন অসম্ভব মনে হয়।
রূপকথা ছোটবেলায় জমিদার বাড়ি, রাজবাড়ি দুর্গা পুজোর গল্পের বইতে পড়েছিল। তারমধ্যে এখনও কিছু কিছু রাজবাড়িতে আজও দুর্গা পুজো হলেও তার আড়ম্বর আর আগের মত নেই। তবে তাদের পাড়াতে প্রথম দুর্গা মায়ের জন্য জমি দিয়ে তার ঠাকুদা সুরেশচন্দ্র রায় প্রথম পুজো শুরু করেন। 1947 সালে বাংলাদেশের থেকে যে সমস্ত শরণার্থী ভারতে এসেছিলেন তাদের মধ্যে কিছু শরণার্থী মিলে হুগলী জেলার জনাইয়ের তাদের বসতি স্থাপন করেন। সেখানে প্রথম ১৩টি বাড়ি নিয়ে এই দুর্গা পুজো হয়। ক্লাব এবং দুর্গা মঞ্চ নিয়ে তার ঠাকুরদা বেশ অনেক কাঠা জমি দান করেন। একদিন রূপকথা তার ঠাকুদাক জিজ্ঞাসা করেন, "কেন তুমি এত জমি দিয়েছ?" তার ঠাকুরদা বেনারসের সিদ্ধযোগাশ্রম মঠের দীক্ষিত। তাই তার চিন্তা ভাবনায় ঈশ্বর এবং সমাজের কল্যাণে মহৎ সেবামূলক কাজের সাথে জড়িত ছিল।তিনি হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ছিলেন। গরীবদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ দিতেন। গানবাজনা খুব ভালোবাসতেন ; তাই পাড়াতে কোন অনুষ্ঠান হলে তিনি তার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। রূপকথা একদিন ঠাকুরদাকে বলেন, "সবাই এত টাকা দেয় না তুমি কেন দেও?" ঠাকুরদা উত্তরে বলেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূলক কাজে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে হয়। পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে আমার নাতি, নাতনীদের সাথে আমিও তাদের উৎসাহ দেবার জন্য হারমোনিয়াম নিয়ে গান করব ;এটি কত আনন্দের তাই না! রবীন্দ্র, নজরুল, ভক্তিমূলক গান ও অনুষ্ঠান মানুষের মনকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে; এই গড়ে তোলার জন্য আমার এত আয়োজনের প্রচেষ্টা। তোমরা সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হলে তোমাদের মন পবিত্র হবে। এই পবিত্র মন দেশের উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেদিন রূপকথা সব গভীরভাবে শুনেছিল। তার ঠাকুরদা সেই শিক্ষা আজও তাকে উৎসাহ দেয়। উৎসব মানে আনন্দ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তার সাথে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মিলন বার্তা। তার এখনো মনে পড়ে ছোটবেলায় নতুন জামাকাপড়ের সাথে ক্যাপ ও বন্দুক ঠাকুরদা কিনে নিয়ে আসতেন। তারা সবাই মিলে ক্যাপ ও বন্দুক নিয়ে কখনো চোর ও পুলিশ খেলা আবার কখনো অশুভ শক্তিদের বিনাশে জন্য বন্দুক চালাত।
রূপকথা এখন গৃহবধূ তার একটি ছোট মেয়ে আছে। পঞ্চমীতে যখন মায়ের চশমা আনতে বাপের বাড়ি যায় তখন তার কাকীমা বলে পাড়াতে ঠাকুর এসে গেছে। তুই দেখে যেতে পারবি। তারও খুব আনন্দ হয়। পড়ার ঠাকুর কি যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাই এই অল্প সময়ের মধ্যে তাড়াতাড়ি করে পাড়ার ঠাকুর দেখতে যায়। রাস্তায় যেতে গিয়ে দেখে একদল বাচ্চা বন্দুক ও ক্যাপ নিয়ে খেলছে। তাদের দেখে যেন মনে হচ্ছে তারা অশুভ শক্তির বিনাশ করছে। এই উৎসবের আনন্দের আয়োজনে কিছু কিশোর ও কিশোরী মন্ডপ সজ্জায় ব্যস্ত। মা দুর্গা যেন তাদের এই কর্মসূচির কর্মযজ্ঞের আয়োজন আনন্দের সাথে গ্রহণ করছে। এইভাবে সবাই মিলে মায়ের আরাধনা করে মায়ের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করছে।তবুও এত কিছুর মধ্যে মায়ের কৈলাসে যাবার সময় হয়ে এসেছে। মা এখন মর্ত্যলোক ছেড়ে নিজের গৃহে ফিরে যাবেন। এখন আবার একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাই বাচ্চা থেকে বড়দের সবার মলিন মুখ হয়ে গেছে। তবুও এই কটা দিন একসাথে আনন্দ যেন সারা বছরের উৎসাহ ও উদ্দিপনার প্রেরণা দিয়ে যায়। তাই রূপকথার ছোট্ট মেয়ে মলিন মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মা যে আবার আসবে আমাদের সাথে আনন্দ করতে। এই বলে সে মা দুর্গাকে প্রণাম করে আসে।
0 Comments.