- 44
- 0
সাহিত্যে নোবেল বেড়াভাঙা কবি অ্যান কার্সন পেলেন, কিন্তু কেন পেলেন?
সাহিত্যের নবধারাজলে এসোঃ
"It is not a human being who is loved,
it is a project.
Eros is an issue of boundaries.
He exists because boundary exists." - Eros the Bittersweet (১৯৮৬)
ভাবানুবাদ:
‘কখনই কোন মানুষের সাথে ভালবাসা হয়না।
প্রেম একটা প্রকল্পমাত্র
প্রেম আসলে সীমা স্থির করার খেলা
তবু সীমানা আছে বলেই সম্পর্ক টিঁকে আছে।‘
কী ভয়ংকর কথাগুলি কবিতায় উচ্চারণ! প্রেমের শুরু হয় যে স্বপ্ন দিয়ে তা জোলো হয়ে ভবিষ্যত সম্পর্কের বন্ধনে বাঁধা পড়ে। তখন অন্য কোন নারী বা পুরুষকে ভাল লাগলেও এগোতে বাধে, কারণ সীমানা। এই তীব্র বাস্তব কবিতায় তুলে এনেছেন যেই কবি তিনি এবার পেলেন ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। কানাডার লেখিকা অ্যান কার্সন। স্টকহোলমের সুইডিশ অ্যাকাডেমি জানিয়েছে যে, তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবক রচনাসম্ভার ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ আদানপ্রদান করে আধুনিক সাহিত্যের নব ধারা তৈরি করেছে। তার জন্যই অ্যানকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
ব্যক্তি অ্যান নিয়ে সামান্য তথ্যঃ
অ্যানের এখন বয়েস ৭৬। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম বই ‘ইরস দ্য বিটারসুইট’। সে সময় থেকেই প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থেকেছে তাঁর লেখালেখিতে। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকাজের মধ্যে পড়ে কাব্যে লেখা উপন্যাস, ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’। ২০০১ সালে তাঁর বই ‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজ়ব্যান্ড’-এর জন্য পান টি এস এলিয়ট পুরস্কার। একই বছর গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ় পায় তাঁর ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘ডিক্রিয়েশন’। ২০১০ সালের ‘নক্স’ একই রকম বেড়াভাঙার কাব্যসাহিত্য। অ্যানের লেখা ২০টির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে কানাডা, ব্রিটেন ও আমেরিকা থেকে। তার অধিকাংশের মধ্যে রয়েছে একটা মিল। তা হল, গল্প বলার ধারাকে কোনও না কোনও ভাবে ভাঙে সে সব সৃষ্টি। অর্থাৎ প্রথাগত অবস্থান বা ট্র্যাডিশনাল স্ট্যাটাসকো’কে তিনি ভেঙেছেন বারেবারে।
কেন এই নোবেলজয়? তার রচনাসম্ভার কেন ‘সাহসী ও উদ্ভাবক’?
প্রথমেই উল্লেখ করেছি অ্যাানের Eros the Bittersweet (১৯৮৬) এর একটি স্তবক যেখানে তিনি গবেষণাধর্মী সমালোচনা গ্রন্থ এবং কাব্যিক দর্শনের মধ্যবর্তী সীমারেখা গুঁড়িয়ে দিয়ে ভালোবাসার জ্যামিতিক ব্যবচ্ছেদ করেন। তিনি রোমান্টিক আবেগের প্রচলিত মায়াজাল ভেঙে প্রেমকে একটি ‘সীমানা ও দূরত্বের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এবার আসি দ্বিতীয় উদাহরনে।
তার Plain water: Essays and Poetry (১৯৯৫) বইটি ভ্রমণকাহিনী, ডায়েরি এবং কবিতার মিশ্র রচনা। তিনি ‘The Anthropology of Water’-এর এই স্তবকে ইতিহাস ও স্মৃতির প্রথাগত ধারণাকে আঘাত করেছেন। কীভাবে?
"We are late. We are always late.
The world has already spoken,
and we are still gathering
the dust of what was said."
ভাবানুবাদ:
দেরি হয়ে গেছে, চিরকাল দেরি করে ফেলি,
পৃথিবী এর মাঝে সব কথা বলে দিল
আর আমরা আজও ভিড় করি যেন
আমরা সে’কথার ফেলে যাওয়া ধুলোবালি।
স্মৃতিচারণমূলক কবিতাকে ব্যক্তিগত শোক থেকে মুক্ত করে সময়ের অমোঘ শূন্যতার দার্শনিক রূপ দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা এখানে করা হয়েছে।
তাঁর বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা The Glass Essay-তে তিনি ধ্রুপদী সাহিত্যতত্ত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত বাস্তবতাকে এক সুতোয় বেঁধে প্রচলিত এলিজিতে রূপান্তর করেন।
"She is not easy to love.
She is an island of wild thorns.
She is a dark forest.
If you touch her you will bleed."
ভাবানুবাদ:
তাকে ভালোবাসা সহজ নয়
সে বুনো কাঁটায় ঘেরা এক দ্বীপ।
সে এক আঁধার অরণ্য।
ছুঁতে গেলেই রক্ত ঝরবে তোমার।
নারীর আত্মপরিচয় ও বিচ্ছেদবেদনাকে প্রচলিত নমনীয়তার বাইরে নিয়ে ভালবাসার সহজিয়া ধারাকে আক্রমন করেছেন।
তার Autobiography of Red (১৯৯৮) একটি কাব্য উপন্যাস। গ্রিক পৌরাণিক দানব গেরিয়নের আত্মানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে মহাকাব্যের চিরচেনা বীরত্ব ও দানবীয়তার ধারণাকে ধূলিসাৎ করে তিনি লিখছেন –
"He had Herakles inside him.
It was not like a photograph.
It was like an animal.
Moving around, clawing."
ভাবানুবাদ:
তার অন্তরে ছিলেন হেরাক্লিস।
কোনো স্থির ছবির মতো নয় ,
ঠিক যেন এক বন্য শ্বাপদ,
ঘুরছে আর আঁচড়ে দিচ্ছে ভেতরটা।
একই ঘটনার অবতারনা করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ তার কর্ণকুন্তী সংবাদ বা কচ দেবযানীতে। তারপরে? কাব্যউপন্যাস কি আর কেউ লেখেন নি? চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রচলিত অবস্থানকে আঘাত করতে ভুলে গেছেন। বুদ্ধদেব গুহ পারতেন। কিন্তু তিনি সেই এক্সপেরিমেন্টে যাননি।
Men in the Off Hours (২০০০) বইয়ে অ্যানা লিখছেন –
"Time passes. Memory fails.
The world goes on forgetting,
while we stand holding fragments,
pretending they form a whole."
ভাবানুবাদ:
সময় বয়ে চলে, স্মৃতি হারিয়ে যায়,
পৃথিবীও সবকিছু ভুলে যেতে থাকে,
আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়াই হাতে হাত
ভান করি যেন এই বিচ্ছিন্নতাই একতা।
এই কথাগুলি আজও অমোঘ সত্য। আধুনিক মানুষের ভাঙাচোরা অসম্পূর্ণ মুহূর্তের কোলাজ এই কথাগুলি। আমরা ওপরে যতই একতা দেখাই বাস্তবে আমরা বিচ্ছিন্ন, মননে ও চরিত্রে। কার্সনের এই পাঁচটি পর্বেই স্পষ্ট—তিনি অলঙ্কারবহুল পঙ্ক্তির চেয়ে নির্মোহ সত্য, শূন্যস্থান ও চিন্তার অপ্রত্যাশিত সংঘাতকে কবিতার মূল ভাষা বানিয়ে আধুনিক সাহিত্যের গতিপথ বদলে দিয়েছেন।
প্রচলিত প্রকরণ ও সংজ্ঞাকে কোথায় ভেঙেছেন অ্যান কার্সন?
এবারে স্পষ্ট বলি যে অ্যান কার্সন সাহিত্য রচনার প্রচলিত প্রকরণ ও সংজ্ঞাকে ভেঙেছেন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং কাঠামোগত উপায়ে। তিনি কেবল বিষয়বস্তুতে বিদ্রোহ করেননি, বরং সাহিত্য পাঠের শারীরিক ও ধারণাগত অভিজ্ঞতাকেই আমূল বদলে দিয়েছেন। কীভাবে?
১) পাশ্চাত্য সাহিত্যে কবিতা, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের যে সুস্পষ্ট বিভাজন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে ছিল, কার্সন প্রথম কুঠারাঘাত করেন সেখানে। তাঁর রচনাকে একক কোনো লেবেলে চিহ্নিত করা অসম্ভব। তিনি প্রবন্ধের ভেতর প্রবেশ করান ব্যক্তিগত শোকগাথা, কবিতার মধ্যে জুড়ে দেন অ্যাকাডেমিক ফুটনোট ও রেফারেন্স, আবার উপন্যাসের চরিত্রদের দিয়ে লিখিয়ে নেন মুক্তছন্দের স্তবক। The Beauty of the Husband একটি কাব্যগ্রন্থ। পড়ে বলুন তো এটা কী? উপন্যাস, দার্শনিক প্রবন্ধ নাকি কোনো নাচের চিত্রনাট্য?
২) প্রথাগত ধারায় বই মানেই বাঁধানো কিছু পৃষ্ঠা উল্টে পড়া। কার্সন ২০১০ সালে প্রকাশিত তাঁর Nox বইটিতে এই শারীরিক ধারণাকেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন। এটি কোনো সাধারণ বাঁধানো বই নয়; বরং একটি ধূসর কার্ডবোর্ড বাক্সে ভরা অ্যাকর্ডিয়ন স্টাইলে ভাঁজ করা দীর্ঘ একখণ্ড স্ক্রোল। পাঠক এখানে কেবল পাঠ করেন না; পাতা না উল্টে স্ক্রোল খুলে একটি ব্যক্তিগত শোকের প্রদর্শনী ছুঁয়ে দেখেন। সাহিত্য এখানে টেক্সট থেকে রূপান্তরিত হয় একটি ‘শিল্পবস্তু’তে।
৩) অ্যাকাডেমিক সাহিত্যচর্চা সাধারণত নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণ দাবি করে। The Glass Essay-তে তিনি একদিকে বিশ্লেষণ করছেন ঊনবিংশ শতকের লেখিকা এমিলি ব্রন্টের কবিতা, আর সমান্তরালে বর্ণনা করছেন তাঁর সদ্য ভেঙে যাওয়া প্রেম, তীব্র রক্তক্ষরণ এবং মায়ের কাছে ফিরে আসার একাকিত্ব।
৪) প্রথাগত সাহিত্যে বাক্য বা শব্দ দিয়েই সব ভাব প্রকাশ করতে হয়। কার্সন নীরবতা বা না-বলা কথাকেও সাহিত্যের অন্যতম উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লেখায় হঠাৎ থেমে যাওয়া অসমাপ্ত বাক্য, আকস্মিক স্তবক বিভাজন এবং দীর্ঘ শূন্যস্থান পাঠকের মস্তিষ্ককে সেই শূন্যতা পূরণের কাজে যুক্ত করে।
বাংলা কবিতার প্রথাগত অবস্থান ভাঙা এখন জরুরীঃ
আচ্ছা বলুন তো এবার পুজো সংখ্যা সাহিত্য পত্রিকা ক’টা বেরোচ্ছে? কমপক্ষে সাড়ে তিন’শ। কবিতা কত প্রকাশিত হচ্ছে? কমপক্ষে পঁচিশ হাজার। ক’টা কবিতা বাংলা কবিতার প্রচলিত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ক’জন লেখক কাব্যোপন্যাস লিখেছেন? লিখলেও তার পাঠকপ্রিয়তা এল কি? বাংলা ভাষার সমকালীন নামী কবি বলতে বড়জোর গোটা কুড়ি নাম ঘুরেফিরে দেখা যায় পত্রিকার বিজ্ঞাপণে বা উদ্বোধনের ভাষণে। কিন্তু একজন দু’জন তরুণ কবি প্রচলিত ফর্মের বাইরে লিখে দেখুন নতুন কিছু হচ্ছে কিনা। প্রথাগত অবস্থানকে আঘাত করতে হবে, নাহলে কবিতার আন্তর্জাতিক উঠোনে আমাদের জায়গা নেই।
0 Comments.